আসিফ আরসালান
গত ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের নানা গণমাধ্যম জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসাবে পালন করেছে। সরকার এ উপলক্ষে একটি ক্রোড়পত্র বা সাপ্লিমেন্ট বের করেছে। সেখানে ১৬ জুলাইকে, ‘জুলাই শহীদ দিবস ২০২৬’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি একটি সরকারী ক্রোড়পত্র। তবে ক্রোড়পত্রটি শুধুমাত্র দৈনিক প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে (অন্তত ১৬ জুলাই)। দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক নয়া দিগন্ত, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক আমার দেশ প্রভৃতি অন্য কোনো পত্রিকায় সে ক্রোড়পত্র দেখা যায়নি। সে ক্রোড়পত্রে দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদকের একটি লেখা দেখলাম। লেখারও শিরোনাম ‘জুলাই শহীদ দিবস’। ক্রোড়পত্রে রয়েছে প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আশরাফুল ইসলামের বাণী।
জুলাই অভ্যুত্থানকে নানা জন নানা নামে আখ্যায়িত করে। তবে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই বলেন জুলাই বিপ্লব। অন্যেরা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান। কেউ কেউ বলেন ‘বর্ষা বিপ্লব’। তরুণরা বলেন, ‘জেন-জি’র বিপ্লব। আবার অনেকে বলেন, ‘৩৬ জুলাই বিপ্লব’। কিন্তু কেউ এটিকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ বলেন না। কেনো সরকার এটিকে জুলাই শহীদ দিবস বললেন সেটি আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। শহীদ দিবস বললে তো একটিমাত্র দিনকে বোঝায়। যেমন ২১ শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। এটি শুধুমাত্র ঐ দিনটিকে বোঝায় যেদিন ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিলো এবং বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার প্রমুখ শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের একটি দিবসকে, অর্থাৎ ১৬ জুলাইকে শহীদ দিবস বলাটা কি ঠিক হবে? ১৬ জুলাই রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। পুলিশ নিরস্ত্র আবু সাঈদের ওপর একবার নয়, অন্তত তিনবার গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এজন্য ১৬ জুলাই দিনটি ৩৬ জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসে অবশ্যই শুধুমাত্র একটি স্মরণীয় দিন নয়, বরং বাংলাদেশের সমস্ত মানুষকে সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে জাগ্রত হওয়ার দিন। আবু সাঈদের শাহাদৎকে কেন্দ্র করেই স্লোগান উঠেছিলো, “বুকের ভেতর উঠছে ঝড়/ বুক পেতেছি গুলি কর”।
কিন্তু সাথে সাথে সরকারকে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে, এ বিপ্লবকে ‘৩৬ জুলাই বিপ্লব’ বলা হয়েছে। কারণ জুলাই মাসের ৩১ দিন এবং অগাস্ট মাসের ৫ দিন- মোট ৩৬ দিন। এই ৩৬ দিনে ওয়াসিম আকরাম, আনাস, মুগ্ধসহ জাতিসংঘের হিসাব মোতাবেক ১৪ শত ছাত্রজনতা শেখ হাসিনার জালিম বাহিনীর গুলিতে শাহাদৎবরণ করেছেন। তাই স্লোগান উঠেছে, “আবু সাঈদ মুগ্ধ/শেষ হয়নি যুদ্ধ”। ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে ৩৬তম দিবসে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট দুপুরে শেখ হাসিনা তার বোন শেখ রেহানাসহ ভারতে পালিয়ে যান।
শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া নিয়েও অনেক কথা রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, ৪ অগাস্ট রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ্জামানের নিকট থেকে একটি টেলিফোন পান। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, তিনি এখন আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা নন। তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এ. কে. এম শামসুল ইসলাম।
যাহোক, সেনা প্রধান ওয়াকার উজ্জামান ফজলে এলাহী আকবরকে পরদিন অর্থাৎ ৫ অগাস্ট ঠিক সকাল ১০টায় তার অফিসে দেখা করতে বলেন। ঘড়ির কাঁটা ধরে ফজলে এলাহী আকবর সেনাপ্রধানের অফিসে যান। দেখেন যে, সেনাপ্রধান পূর্ণ সামরিক পোশাকে তাকে রিসিভ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। তিনি তাকে বলেন যে, আজ অর্থাৎ ৫ অগাস্ট বেলা ২টার মধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে ক্যান্টনমেন্টে হাজির হওয়ার জন্য যেনো তিনি পলিটিশিয়ানদের অনুরোধ করেন। জেনারেল (অব.) আকবর বলেন যে, পলিটিশিয়ানদেরকে তার ফোন করা উচিত হবে না। এটি সেনাপ্রধানকেই করতে হবে। জেনারেল আকবরের কাছে ৩ জন নেতার টেলিফোন নাম্বার ছিলো। এই ৩ জন হলেন আমীরে জামায়াত ড. শফিকুর রহমান, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। সেনাপ্রধান ৩ জনকেই ফোন করেন। তবে জনাব মান্নাকে ফোনে পাননি। ইত্যবসরে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারাও টেলিফোন পেয়ে যান।
সেনাপ্রধানের চেম্বারে যখন তার সাথে ফজলে এলাহী আকবর কথা বলছিলেন তখন সকাল ঠিক ১০টা ২৫ মিনিটের সময় সেনাপ্রধান বলেন যে, ঠিক ১০টা ৩০ মিনিটে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল সুন্দরজী তাকে ফোন করবেন। ভদ্রতার খাতিরে জেনারেল আকবর ১০টা ৩০মিনিটের ৩ মিনিট আগেই উঠে যান।
পরবর্তীকালে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ থেকে জানা যায় যে, শেখ হাসিনাকে দিল্লীতে আশ্রয়দান সম্পর্কে তারা আলাপ আলোচনা করেন। আরো জানা যায় যে, শেখ হাসিনার দিল্লীতে আশ্রয় গ্রহণ সম্পর্কে ৩ অগাস্ট থেকেই ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সাথে বাংলাদেশের তৎকালীন নেতৃত্বের আলাপ আলোচনা হয়। এসব আলাপ আলোচনার ভিত্তিতেই শেখ হাসিনাকে পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে ঢাকা থেকে একটি সামরিক বিমানে উঠিয়ে দেয়া হয় এবং পূর্বে নির্ধারিত ব্যবস্থা অনুযায়ী দিল্লীর হিন্দন সামরিক ঘাঁটিতে শেখ হাসিনাকে রিসিভ করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।
এসব তথ্য থেকে এখন এটি পরিষ্কার যে শেখ হাসিনার ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছিলো ৩ অগাস্ট, ৫ অগাস্ট নয়। ৩ অগাস্ট সেনাবাহিনীর সমাবেশের পরবর্তী ৪ ও ৫ তারিখ দুপুর পর্যন্ত যেসব খবর এতদিন ধরে আমরা জেনে এসেছি তার সবগুলো সম্পূর্ণ সঠিক তথ্যভিত্তিক নয়।
যাহোক, আমার কাছে জুলাই বিপ্লবের ৩৬ দিনের দিনলিপি বা টাইম লাইন রয়েছে। একটি কলামে সেটি দেয়া সম্ভব নয়। তাই সংক্ষেপে সেগুলো দিচ্ছি। যদি সঠিক চিত্র দিতে হয় তাহলে বলতে হবে যে, আন্দোলনটি শুরু হয় ২০২৪ সালের ৫ জুন বুধবার। ঐ দিন সরকারী চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে আদালত। পরদিন ঐ রায় বাতিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিক্ষোভ। সরকারী নির্লিপ্ততার ফলে ১লা জুলাই সোমবার ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের পক্ষ থেকে ৩ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। অতঃপর শুরু হয় আন্দোলন। ৭ জুলাই ২০২৪ পালিত হয় বাংলা ব্লকেড। ১০ জুলাই বুধবার সকাল-সন্ধ্যা বাংলা ব্লকেডের নামে রাজধানী থেকে সারা দেশ বিচ্ছিন্ন হয়।
১৪ জুলাই ২০২৪ ছিলো এ আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট। চীন থেকে ফিরে এসে শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে কোটা সম্পর্কে বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা চাকরি পাবে?” শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে গর্জে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ছাত্র হল। সবগুলো হল থেকে রাতের স্তব্ধতা ভেদ করে আওয়াজ ওঠে, ‘তুমি কে? আমি কে?/ রাজাকার, রাজাকার।/ কে বলেছে? কে বলেছে?/ স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’।
রাতে ছাত্রদের এ স্লোগানের জবাব হিসাবে ১৫ জুলাই সোমবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন দম্ভ ভরে বলেন যে, ওদের যোগ্য জবাব দেয়ার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এ বক্তব্য দেয়ার পর তারা ছাত্রদের ওপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
শান্তির পথে না যেয়ে সরকার সহিংসতার পথ ধরে এবং পরদিন ১৬ জুলাই নির্ভিকভাবে বুক চিতিয়ে শহীদ হন আবু সাঈদ। আমি প্রথমেই বলেছি যে, আবু সাঈদের শাহাদৎ ছাত্রসমাজ তো বটেই, সাধারণ মানুষকেও জাগিয়ে দেয়। ১৭ জুলাই বুধবার হাজার হাজার সাধারণ ছাত্র একজোট হয়ে ছাত্রলীগকে পিটিয়ে হল থেকে বের করে দেয়। এর আগেই আন্দোলন দমনের জন্য পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছিলো। ১৯ জুলাই দেশে কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ১৬ জুলাই এবং তার পর থেকেই প্রতিদিন ঢাকাসহ মফস্বলেও ছাত্রজনতার আন্দোলনের ওপর পুলিশ তাজা বুলেট নিক্ষেপ করে। প্রতিদিন ছাত্রজনতা শেখ হাসিনার ঘাতক বাহিনীসমূহের বুলেটের আঘাতে শাহাদৎ বরণ করতে থাকেন। ২০ জুলাই নাহিদ ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। ২৩ জুলাই ছাত্রনেতৃবৃন্দ আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার, রিফাত রশীদ নিখোঁজ হন। ২৬ জুলাই শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনী শুরু করে ব্লক রেইড। নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া এবং আবু বাকের মজুমদারকে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে উঠিয়ে ডিবির হেফাজতে নেয়া হয়। ২৭ জুলাই হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। ২৮ জুলাই নুসরাত তাবাস্সুমকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। ২৯ জুলাই সোমবার আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ৩০ জুলাই ফেসবুক প্রোফাইল লাল রঙের প্রোফাইলে রঞ্জিত করা হয়। অর্থাৎ সারাদেশে আওয়ামী লীগ রক্তের হোলিখেলা শুরু করেছে, সেটি বোঝানো হয়।
৩ অগাস্ট শনিবার শেখ হাসিনাসহ সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। ৪ অগাস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কমর্সূচির তারিখ ৬ অগাস্টের পরিবর্তে একদিন এগিয়ে ৫ অগাস্ট করা হয়। এরপর ৫ অগাস্ট, ২০২৪। সকলেই জানেন এবং দেখেন যে, শেখ হাসিনা তার বোনসহ পালিয়ে গেছেন।
জুলাই বিপ্লবের সমাপ্তি এবং শেখ হাসিনার বিতাড়ণের পর ২ বছর পার হয়ে গেছে। ১৬ জুলাই ইংরেজি ডেইলি স্টারের রিপোর্ট মোতাবেক জুলাই গণহত্যার বিরুদ্ধে যত মামলা হয়েছে তার ৮৬ শতাংশের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ২ বছরে যেখানে মাত্র ১৪ শতাংশ মামলার তদন্ত হয়েছে সেখানে অবশিষ্ট ৮৬ শতাংশের তদন্ত কত বছর পর শেষ হবে? শহীদ আবু সাঈদের মাতা বলেছেন, “আমার মৃত্যুর আগে যেনো আবু সাঈদের হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর দেখে যেতে পারি।” এ ইচ্ছা এবং আর্তনাদ শত শত সন্তান হারা জুলাই বিপ্লবে শহীদদের মাতা-পিতার। তাদের জীবদ্দশায় কি তাদের ইচ্ছে পূরণ হবে?