॥ আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন ॥

আল বেরুনী বলেছিলেন যে শহরের রাস্তাগুলো সংকীর্ণ সেই শহরের মানুষের মনও ছোট। আমাদের দেশে এখন এই কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য। যেখানে একটি টু শব্দ করতে পারতো না বিরোধী দলের কেউ কিংবা সাধারণ জনগণের কেউ। সেখানে এখন সবাই স্বাধীন। একেক জনকে শতাধিক মামলায় পালিয়ে বেড়াতে হতো, সেখানে এখন উন্মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে চলছে তা কারো কারো সহ্য হচ্ছে না। যে জুলাই আন্দোলন এই সুযোগ এনে দিলো সেই জুলাই অধ্যাদেশ বাতিল করতে চায়, কি অবাক করা কথা। মায়ের পেট থেকে জন্ম নিয়ে মাকে অস্বীকার কারার মতো।

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি তাদের জন্য যুদ্ধের ঐতিহাসিক নিদর্শন এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান । এতে জাতি তাদের অধিকার সম্পর্কে জানতে পেরেছে। কিভাবে বুক টান করে সকলের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা যায়, নিজের অধিকার আদায় করা যায়, কিভাবে নিজেকে শক্ত রাখা যায় তাও কেউ জানতো না। অর্ধশত বছর শুধু প্রাচীন বৃটিশ বা ঘোঁড়া স্বভাবের মানুষগুলোর নির্দেশ মেনে চলতেই শিখতে পেরেছে এই জাতি। এখন বুকের ধন দিয়ে পীঠে বোঝা নিয়ে চলতে শিখেছে। কেউ বলেনি সাধারণ লোকেরও মন খুলে কথা বলার অধিকার আছে, পুলিশ থেকেও নিজের অধিকার জানার আছে। আজ তা জনগণ উপভোগ করছে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে আমাদের স্মৃতিতে স্থায়ী করে রাখা উচিত। এই আন্দোলনে যারা জীবন উৎসর্গ করেছে, তাদের প্রতি জাতির দায় চিরদিনের। তাদের আত্মত্যাগ কোনো সাধারণ বা স্বাভাবিক আবেগ নয়; বরং এটি জাতির ও সকল মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের পথে কন্টকাকীর্ণ পথকে মুক্ত করা।

যে জাতি তার গৌরবের ইতিহাসকে মূল্যায়ন করে না করতে জানে না সে জাতি কখনো উন্নতির সোপানে চড়তে পারে না।

সাবেক উপদেষ্টা ড. খালিদ হোসেন স্যার লিখেছেন, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে ত্যাগ ও আত্মদানের ইতিহাস রচিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটি কেবল প্রতিরোধের গল্প নয়, পুনর্জাগরণের গল্প-অবদমিত কণ্ঠের মুক্তির গল্প। জুলাই যোদ্ধাদের রক্ত ও শ্রম কোনো দিন বৃথা যাবে না-এই বিশ্বাসই জাতিকে সামনে এগিয়ে নেবে। তাদের আত্মত্যাগের ফলে অনেকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, নির্বাসিতরা ফিরে এসেছেন মাতৃভূমিতে এবং অন্যায়ভাবে বন্দী থাকা মানুষ মুক্তির আলো দেখেছেন। অর্থাৎ-এই বিপ্লব ছিল এক বহুমাত্রিক পরিবর্তনের সূচনা। জুলাই আমাদেরকে অধিকার বুঝে পাওয়া যেমন শিখিয়েছে তেমনি জবাবদিহিতার রাষ্ট্রের একটি সূচনাও করে দিয়েছে। জবাবদাতাগণ যেমন এটিকে আগ্রহসহকারে গ্রহণ করে নিজেরা নিজেদের কর্মের জবাব দিচ্ছেন তেমনি জাতিও রাষ্ট্রের বহু অজানা বিষয়ে অবগত হচ্ছেন। যেহেতু রাষ্ট্র জনগণের, ইচ্ছাও পূরণ হবে জনগণের, নেতাও হতে হবে জনগণের, এটাই স্বাভাবিক। আর জুলাই চেতনা সেই অবদানই রাখছে।

এখানে কেউ নিজেকে প্রভাবশালী মনে করে না। কাউকে ক্ষমতাবান মনে করতেও দেয় না। ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজই সবার কাম্য। মানবিক রাষ্ট্র তখনই হয় যখন জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র হবে।

আমরা দেশকে মায়ের মতো সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি কিন্তু দেশে সবার জন্য কিছু করতে গেলেই বাধা। কেন এমন হয়? কেন এতো বাধা আসে? আমরা সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি না?

এ দেশের এ জাতির ভাগ্য সবসময় দুঃখজনক। একটি রাজনৈতিক দল একবার ক্ষমতায় বসতে পারলে নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তি মনে করে নেয়। প্রশাসনকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয় ফলে নিজে যা বলে তাই হয়। সর্বত্র একটি চেইনে কাজ করে। তারপর তারা ভুলে যায় তারা জনগণের সেবার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং জনগণের সন্তুষ্টির জন্যই কাজ করতে এসেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিপ্লবে দেখা গেছে প্রতি ৫০ বছরে যারা দেশ চালায় তারা জনগণের আকাঙ্খাকে ভুলে যায় তাই পঞ্চাশ বছর পরেই একটি বড় বিপ্লব সংগঠিত হয়। এই পঞ্চাশ বছরে দেশের ঘরে ঘরে নির্যাতনে নির্যাতনে কান্না ঝরে, আর রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। সরকারের উদাসীনতা প্রকাশ পায় এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরিবার তান্ত্রিক সমাজ আর জনগণ চায় না। বর্তমান সরকারের উচিত নবম দশম শ্রেণীর পাঠ্যসূচির সাথে রাষ্ট্র সংরক্ষণ ও দেশাত্মবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে ছেলে মেয়ে সবাইকে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা।

তাহলে যেমনি কোন ব্যক্তি গাদ্দারী করে দেশ চালাতে পারবে না, তেমনি দেশের প্রশাসনও সকল নাগরিকের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে। বিদেশের কোন শয়তানের চোখ এ দেশের একটি পাখির দিকেও নজর দিতে পারবে না। প্রত্যেক নাগরিক হবে সচেতন ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সৈনিক। সরকার যদি এর বিপরীত কিছু চিন্তা করে তাহলে তা হবে সরকারের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আরো সহজ করে বলতে পারি যে নেতারা প্রবাসে লুকানো ছিলেন, দেশে ফেরার কোনো সম্ভাবনাই ছিলো না তারা এসে জুলাই চেতনায় সরকার গঠন করতে পারলেন। বা বলতে পারি প্রবাস থেকে এসে সরাসরি প্রধান দায়িত্ব পালন করতে পারছেন কেউ কেউ মন্তব্য করছেন কারো সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এসেছেন তাদের জন্য কাজ করবেন একবার সেই চুক্তিবদ্ধের ব্যাপারে চিন্তাটা দূরে রেখে সামনে এগিয়ে যান দেখুন জনগণ আপনাকে কিভাবে গ্রহণ করে ও দেশের মাটির ঘ্রাণ নিয়ে দেখুন আপনি হবেন সেরা। আরো বলতে পারি তাদের সাথেই গাদ্দারি করুন যারা যুগযুগ ধরে এদেশের সাথে দেশের জনগণের সাথে, সার্বভৌমত্বের সাথে গাদ্দারি করে আসছে, তারা প্রকৃত রাজনীতি বুঝে নিতে পারবে। দেশপ্রেমিকরা বেশিদিন বাঁচে না, তারা বাঘের মতো হুঙ্কার দিয়ে কথা বলে। অল্প দিনে অনেক কিছু দিতে পারে জাতির জন্য। দেশের জন্য প্রকৃত নাগরিক তৈরি করুন, দেশ বাঁচান আপনিও বেঁচে যাবেন। মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ব্যতিত আর সবাই দেশের নাগরিককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে আপনি হয়ে ওঠতে পারেন ইমাম খোমেনির মতো, হতে পারে এরদোয়ানের মতো কিংবা মাহাথিরের মতো।

সম্প্রতি শহরে চাঁদা কিছুটা কমেছে। কিন্তু সম্পূর্ণ কমেনি। ইচ্ছা করলে আইনের শাসন বাস্তবায়ন করা যায় তার প্রমাণ মিলছে। আইনের ভয়ে সিঙ্গাপুরের লোকজন রাস্তায় পানের পিক পর্যন্ত ফেলতে পারে না। ধূমপানের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হয় এমনটা এদেশে কেন সম্ভব নয়?

এ দেশের কৃষিজাত দ্রব্য সামগ্রী দিয়ে দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু দেশে কোনো চাষই হচ্ছে না। সবাই নেতা হতে চায়, নেতা হয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে চায়। একজন ভিসি কি করে বলতে পারেন আমাকে একটি পদ দিলে আমি ভিসি বাদ দিয়ে সেটাকে গ্রহণ করবো। বহু ছাত্রকে বলতে শুনেছি সরকারি চাকুরীর দরকার নেই একটি পদ দিয়ে দেওয়া হোক তাতেই যথেষ্ট। বুঝতে পারছেন অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমি দেখেছি ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র স্কুল বাদ দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে নেতার অনুষ্ঠানে গেছে, মুরুব্বীদেরকে তুই শব্দ করে শাসন করেছে। সেই সব পরিস্থিতিকে জনগণ অপছন্দ করেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান করেছে। এ দেশে ভদ্র লোকগুলো সাধারণ চাহিদা মেটাতে পারলেই শান্ত থাকে। দুদ- শান্তি চায়। আপনি জনগণকে একবার ভালোবেসে দেখুন, তাদের আকাক্সক্ষার গুরুত্ব দিয়ে দেখুন তারা দেশে ইনসাফ ও নীতি নৈতিকতা রক্ষার জন্য সব করতে পারে। ডানে বামে থাকা ফ্যাসিস্টগুলোকে সরিয়ে বাংলার মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিয়ে দেখুন বাংলার মাটি কত শুদ্ধ, কত খাঁটি ও নীতি নৈতিকতার জন্য প্রস্তুত। এখানে এই জমিনে যেমনি ধান পাট থেকে সোনা ফলানো যায় তেমনি মূর্খ স্বল্প শিক্ষিত লোকগুলোকে দিয়েও শান্তির চাষ করা যায়।

এখানকার শিশুরা বৈজ্ঞানিক হতে পারে, এখানে বৃদ্ধরা জাপানের মতো কর্ম করতে পারে। আপনি দেশপ্রেমিক লোকদেরকে মূল্যায়ন করে দেখুন তারা সোনার দেশ উপহার দেবে।

জুলাই আন্দোলনকারীরা কি চায়? তারা চায় যাদের কারণে ৫০/৫৫ বছরে দেশের উন্নয়ন হয়নি, যাদের কারণে মেধাবীরা দেশে সম্মান ও চাকুরী পায়নি তাদের সম্মান করা হোক। তাদেরকে দায়িত্ব দিয়ে দেখুন। বিদেশিরা এদেশের বেতন নিয়ে নিচ্ছে। আপনি দেখবেন বহু বড়বড় পদে বিদেশি বসে আছে- কেন এমন হবে? কেন এদেশের লোকেরা যোগ্য হয় না?

এ দেশের জনগণ আর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হতে চায় না, কেউ চায় না আবার ব্যাংকগুলো লুট হোক, জুলাই আন্দোলনের ৭৭% লোক চায় না এ দেশে বিচার বহির্ভূত কোন সেক্টর থাকুক। তারা চায় একজন শ্রমজীবি মানুষের প্রাণের মূল্যও থাকুক একজন ধনকুবেরের মতো। কোন ঋণ গ্রহীতা যদি ইচ্ছাকৃত ঋণ পরিশোধ না করে থাকতে না পারে তাহলে ব্যাংকিং কোন সমস্যাও হবে না। দেশের টাকা নামে বেনামে বিদেশে যাক এটা তরুণরা ও নতুন প্রজন্মের জুলাই আন্দোলনকারীরা চায় না। এখন যারাই জুলাই আন্দোলন মানবে না তারাই হবে ফ্যাসিবাদী শক্তি।

ইতিহাস সাক্ষী ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সে সর্বস্তরের জনতা স্বৈর শাসক হটায়। ১৯৬৯ সালে আন্দোলনের ফলে আইয়ুব খানের বিদায় ঘটে। একই সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটে। ১৯৮৯ সালে ইরানে বিপ্লব ঘটে এবং সরকার হটায়। এ দেশের জনগণের স্বৈরশাসক এরশাদকেও হটানোর অভিজ্ঞতা আছে। ২০২৪ এর আন্দোলনের ফল যদি বিফাকে যায় তাহলে এ জাতি আর মাথাচাড়া উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। শহরগুলোর রাস্তাও সংকীর্ণ থাকবে জাতিও ছোট মনের হয়ে বসবাস করতে থাকবে।

যারা জুলাই আন্দোলনকে হালকা করে দেখছেন তাদেরকে বলা যায় জুলাই হালকা করে দেখলে নিজেরই ক্ষতি হবে। তা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। যুগে যুগে পৃথিবীতে যখনই যেখানে স্বৈর শাসন কায়েম হয়েছে সেখানে ঘরে ঘরে বিপ্লবের ডাক ওঠেছে শেষমেশ গদি ছাড়তে হয়েছে। ইতিহাস তাকেই মনে রাখে যে জাতির জন্য কিছু করেছে। মীরজাফরদেরকে মনে রাখে না।

ছাত্রজনতা ও জুলাই যোদ্ধাদের বক্তব্য স্পষ্ট, গণভোটের রায় না মানলে সরকারকে অবৈধ ঘোষনা করে আন্দোলন। কোনো ফ্যাসিবাদের স্থান এ বাংলায় হবে না। এ জাতি ফ্যাসিবাদের কবর দিয়েছে ৩৬ জুলাই। নতুন ফ্যাসিবাদ কেউ কামনা করে না। প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ তাঁর ‘উঁকি মারে কে রে’ কবিতায় লিখেছেন,

ফ্যাসিবাদের কবর থেকে উঁকি মারে কে রে

কত্তো বড়ো বুকের পাটা দে বুঝিয়ে দে রে।

সাজায় নতুন নাটক ফাটক সার্কাসের ঐ হাতি

দেশের মানুষ আবার জাগো হাতে তোলো লাঠি

বাত্তি জ্বালাও খুইজ্জা দেখো কে নাড়ে কলকাঠি।

আমরা চাই এ জাতি চির উন্নত মম শির করে দাঁড়াক। মানুষ মানুষের অধিকার ফিরে পাক।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক ও প্রবন্ধকার।