প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশ। এ দেশের আলো-বাতাসে, মাছে-ভাতে, ফলে-মূলে আমরা বেড়ে উঠেছি। মহান স্রষ্টার এক বড় নেয়ামত আমাদের বাংলাদেশ। শৈশবে চোখ মেলে দেখেছি চারদিকে ফসলের সবুজ মাঠ। নদীতে পানির কলতান, বনবাদাড়ে পাখির কুহুতান। এমন শৈশবে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছি, লড়েছি ঢেউয়ের সাথে। চারদিকেই তখন ছিল আনন্দ-বিনোদন, কৃত্রিম বিনোদনের প্রয়োজন হতো না আমাদের। গাঁয়ের মানুষগুলো দরিদ্র ছিল, তবে সারল্য ছিল তাদের বড় সম্পদ। ফলে অতিথি আপ্যায়নে তারা কৃপণ ছিল না। সীমিত সামর্থ্য আন্তরিকতার গুণে অনেক বড় হয়ে উঠতো। গাঁয়ে স্কুল ও বাজার সাধারণত একটু দূরেই থাকতো। এর বিকল্প ছিল মোড়ের টঙ দোকান ও পাড়ার মক্তব। মক্তবে আলিফ, বা, তা, ছা’র পাশাপাশি নীতিকথা শেখানো হতো। একজন সুর ধরে বলতো, ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ, তারপর মক্তবে সবাই কোরাসকন্ঠে বলতো ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’। সেই দৃশ্য দেখতে যেমন সুন্দর ছিল, শুনতেও ছিল চমৎকার। এখনো কানে বাজে। অন্তরে তার প্রভাব এখনো আছে।

আজ এত কথা কেন বলছি? সেই গ্রাম এখন আর তেমন নেই। অনেক গ্রামেই এখন উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, শহরের ছায়াও পড়েছে। বাঁশির বদলে হাতে মোবাইল ফোন। উঠানের জারি-সারি-পুঁথির জায়গা দখল করেছে ঘরের টেলিভিশন। আপ্যায়নে গাছের ডাবের বদলে এখন পরিবশেন করা হচ্ছে দোকানের ফান্টা বা কোকাকোলা। এগুলোও এক ধরনের উন্নয়ন বটে, তবে কেমন উন্নয়ন? ইতিমধ্যে পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় অনেক পানি বয়ে গেছে, ক্যালে-ারে বছর বদলেছে। রাজনীতিতেও ঘটেছে নানা পালাবাদল। আমরা এখন স্বাধীন বাংলাদেশর নাগরিক। স্বাধীন দেশের রাজনীতিতেও উত্থান-পতনের ঘটনা কম ঘটেনি। এত ঘটনার পরও আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারিনি। দেশের রাজনীতিতে বাহাস প্রচুর হয়। ভূরাজনীতি এবং আঞ্চলিক আগ্রাসন নিয়েও কথা হয়। তবে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা ও গভীর গবেষণার বেশি প্রয়োজন ছিল, তা কিন্তু তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। আমি দেশের নৃতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বের কথা বলছি। এ বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলে কিংবা চাতুর্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে ছলনা করলে দেশের রাজনীতি কখনো স্থিতিশীল হবে না, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে না, উন্নয়ন ঘটবে না অর্থনীতিরও।

মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি, স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর ধরে আমরা কিসের রাজনীতি করলাম? পরস্পরকে আমরা ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া ও আমেরিকার দালাল হিসেবে অভিহিত করলাম। প্রশ্ন জাগে, তাহলে দেশের জন্য কি কেউ-ই নেই? এটা কেমন করে হয়? দালাল তত্ত্বের সরূপটা আসলে কেমন? এই তত্ত্বের সবটাই কি ভুল, নাকি সেখানে অর্ধসত্য আছে, নাকি এখানে আছে বিভ্রান্তির চোরাবালি? রাজনীতিবিদরা বিষয়টি ভেবে দেখলে ভালো করবেন।

জুলাই অভ্যুত্থান। ৪৭, ৫২, ৭১-এর পর ২০২৪-এর এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা। জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের ছাত্র-জনতা, শ্রমিক-কৃষক, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, সবাই রাজপথের দ্রোহে শামিল হয়েছিল এক কাতারে। তখন কেউ কাউকে দালাল বলেনি। সবার লক্ষ্য ছিল এক ও অভিন্ন-ফ্যাসিস্ট হাসিনার উৎখাত। ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অপমান করেছে, মানুষের নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ করেছে। লুটপাট, দুর্নীতি ও ব্যাংক ডাকাতির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে। আইন-আদালত, পুলিশ প্রশাসনের অপব্যবহার ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মাধ্যমে বিরোধী দলের রাজনীতি উৎখাতের চেষ্টা করেছে। সরকারি দলের লোকদের জন্য স্বর্গ ও জনগণের জন্য নরকে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশ। জুলুম ও চরম বৈষম্যমূলক এমন শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল ন্যায়সঙ্গত। জুলাইয়ের ন্যায়সঙ্গত সেই দ্রোহে জয় হয়েছে ছাত্র-জনতার।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান হলো, হাসিনা পালালো। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার লক্ষ্য করা গেল পুরানো চিত্র। সবাই আপন রূপ দেখাতে লাগলো। রূপতো দেখালো, তবে দেশের ছাত্র-জনতা আর আগের মতো গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসালো না। তার প্রশ্ন করছে, বিবেচনা করছে। ফলে রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতিটা বেশ কঠিন হয়ে উঠলো। বাধ্য হয়ে তারা গণতান্ত্রিক হওয়ার চেষ্টা করলো। ১২ ফেব্রুয়ারি এবার যে নির্বাচনটা হলো, তা কিন্তু আগের মত হলো না। নির্বাচনে জনগণ অংশ গ্রহণ করেছে, দিনের ভোট রাতে হয়নি। নির্বাচনের পরিবেশটা উৎসবমুখর ছিল। তবে নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগও উঠেছে। সেটা অবশ্য ভোট গ্রহণের পরের গল্প। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। আর নিজেদের নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়ে বলিষ্ঠ বিরোধীদল হিসেবে এবার আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী । এর পরের চিত্রটা এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশের জনগণের জন্য।

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সংসদের প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী শুরুতে সহযোগিতামূলক মনোভাব ব্যক্ত করলেও ক্রমান্বয়ে তা ভিন্নরূপ ধারণ করছে। মতবিরোধের মাত্রা দিন দিন চলেছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর স্বীকৃতি দেওয়া, না দেওয়া প্রশ্নে সরকার ও বিরোধীদলের বিরোধ এখন শুধু জাতীয় সংসদে সীমাবদ্ধ নেই, সেই উত্তাপ ছড়িয়ে গেছে রাজপথেও। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী অবস্থায় নতুন গণতান্ত্রিক বন্দোবস্তের যে আবহ তৈরি হয়েছিল তাতে যেন চিড় ধরেছে। নীতিগত ও কৌশলগত কারণে বিরোধের একটি বিষয় আছে। আবার সংবিধানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে চাতুর্যের চিত্রও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কখনো সংবিধানকে এড়িয়ে যাওযা হচ্ছে, আবার কখনো সংবিধানকে শক্তভাবে ধারণ করা হচ্ছে। চাতুর্য ও দ্বিচারিতা কোনো ভালো বিষয় নয়। দেশের মানুষ বিষয়গুলো বোঝে এবং সময়মতো তার জবাবও দেয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনা তো ভালো জবাবই পেয়েছে। ক্ষমতাসীনরা বিষয়টি উপলব্ধি করলে মঙ্গল হয়। কারণ সংবিধানের ব্যবহার-অপব্যবহার, আইন-আদালতের ব্যবহার-অপব্যবহারের সুযোগটা সরকার ও সরকারি দলের হাতেই বেশি থাকে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার, গণভোটের রায় কোনো অস্পষ্ট বিষয় নয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এ নিয়ে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কথা বলেছেন, অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন। গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়েছে, বিষয়গুলো সংরক্ষিত হয়ে আছে। স্পষ্ট সেই বিষয়গুলো জাতীয় সংসদে এতো কঠিন হয়ে উঠছে কেন? ছাত্র-জনতার কাছে বিষয়গুলো সহজবোধ্য হলেও, সরকারদলীয় এমপি ও মন্ত্রীদের কাছে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ও অঙ্গীকারগুলো এতো দুর্বোধ্য ঠেকছে কেন? বর্তমান জাতীয় সংসদের মাননীয় সদস্য ও মন্ত্রীরা তো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফসল। তাই বলতে হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার সাথে সবারই সঙ্গত আচরণ করা কর্তব্য। জনগণ সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে, সরকারের আচরণও লক্ষ্য করছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শেখ হাসিনার সরকারই প্রথম ভুল সরকার নয়, আগেও ভুল সরকার ছিল, ভবিষ্যতেও ভুল সরকারের প্রতাপ লক্ষ্য করা যেতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করে সরকারের জ্ঞান-গরিমা ও আচরণের ওপর। লেখার শুরুতে রাজনীতি প্রসংগে নৃতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলেছিলাম। অনেক বিষয়ে কথা হয়, বাহাস হয়; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ওই বিষয়গুলো নিয়ে কথা তেমন হয় না। এ কারণে আমাদের রাজনীতিতে সংহতি ও স্থিতি আসে না। তবে কথা বলার চাইতেও যথাবিষয়ে যথা গবেষণা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা নামক এই জনপদের মানুষের উৎপত্তি ও বিকাশ, পেশা, খাদ্যাভ্যাস, বিয়েশাদি, সমাজ ও সামাজিক মূল্যবোধ আশা-আকাক্সক্ষা এবং ধর্মবিশ্বাসকে অবজ্ঞা করে কি রাজনীতির গতিপথ নির্ণয় করা যায়? ইতোমধ্যে রাজনীতির তাত্ত্বিকরা অনেক ভুল করেছেন, রাজনীতিবিদদের ভুলের কারণেই তো আজ দেশের এই দুর্দশা। বিশেষ মহল বা গোষ্ঠীর দিকে না তাকিয়ে ছাত্র-জনতার স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়ে শিকড়সন্ধানী হলে সরকার সফল হতে পারেন। সরকার গণবান্ধব হলে, সময়ের বার্তা উপলব্ধি করলে ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও সম্ভব।