আমরা এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন করছি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ছিল অনেকটাই অনিবার্য। কারণ সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনে দেশের মানুষ ছিল অতিশয় ক্ষুব্ধ। ২০০৮ সালে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার মানুষের সকল মৌলিক অধিকার হরণ করেছিল। তারা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামাজিক শুদ্ধাচার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। নিজেদের জনগণের প্রতিনিধি দাবি করলেও তাদের কাজ-কর্ম এবং আচার-আচরণে জনকল্যাণের প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করা যায়নি। স্বজনতোষি অর্থনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা দেশের সম্পদ লুটে নিয়ে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি তথা ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে খ্যাত ব্যাংকিং সেক্টরকে বিপর্যয়ের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে গিয়েছিল। ব্যাংকিং সেক্টর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে তারা প্রাইভেট সেক্টরে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ করতে পারছে না। রাজস্ব আদায় সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। ফলে সরকারে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বিদেশী ঋণের উপর অতিমাত্রায় নির্ভর করতে হচ্ছে। দৃশ্যমান উন্নয়নের নামে এমন সব অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে জাতীয় প্রয়োজনে যার তেমন কোন আবশ্যকতা ছিল না। এসব বিতর্কিত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বিদেশে ঋণ গ্রহণ করতে হয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতাসীন হয় তখন দেশের বৈদেশীক ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ক্ষমতাচ্যুত হবার সময় দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ৫ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ থেকে ১০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে গৃহীত বৈদেশিক ঋণের একটি বড় অংশই লোপাট করা হয়েছে।

বিগত সরকার আমলে দেশে দুর্নীতি এবং আর্থিক কেলেঙ্কারি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে বেড়ে যায় অর্থ পাচারের পরিমাণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য ২৮ লাখ কোটি টাকা বিেেদশে পাচার হয়েছে। বিভ্রান্তিকর নানা পরিসংখ্যান দিয়ে সরকারের সাফল্য প্রদর্শন করা হলেও তা ছিল আসলে পুরোটাই ফাঁপা।

আওয়ামী লীগ সরকার কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে থাকে। কিন্তু বাস্তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার আমলেই। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চেতনা ছিল দু’টি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সরকার গঠন নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত, সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ। আওয়ামী লীগ আমলে অর্থনৈতিক বৈষম্য শুধু বাড়েনি তা ভয়াবহ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। সরকার সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর ব্যাপক লুটপাটের ফলে দেশের সাধারণ মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারেনি। পাকিস্তান আমলে আমরা ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতাম। আর এখন দেশে ২২ হাজার পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে যারা কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। বিতাড়িত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পলায়নের কিছুুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তার একজন পিয়ন নাকি ৪০০ কোটি টাকার মালিক। প্রধানমন্ত্রীর বাসার একজন পিয়ন যদি ৪০০ কোটি টাকার মালিক হন তাহলে অন্যদের অবস্থা কি হতে পারে তা সহজেই বোধগম্য। স্বৈরাচারী সরকারের একটি সাধারণ উন্নয়ন কৌশল হচ্ছে দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করা। কারণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে সাধারণ মানুষ তা প্রত্যক্ষ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তাদের উন্নয়নের মূল্য লক্ষ্য হচ্ছে, ‘অতি উন্নয়ন, অতি দুর্নীতি।’ পাকিস্তান আমলে আমরা আইয়ুব খানের শাসনামলে অবকঠোমোগত খাতে ব্যাপক উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছি। এরশাদ আমলেও আমরা অবকাঠামোগত খাতে ব্যাপক উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে অবকাঠামোগত খাতে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন সাধিত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষ করা গেছে, বিশ্বে যেসব দেশে অবকাঠামোগত খাতে উন্নয়ন ব্যয় সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশ তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের নামে দেশের জনগণের অর্থ আত্মসাতের মহোৎসবে লিপ্ত হয়েছিল। লুটপাটের উন্নয়ন কৌশলে অতিমাত্রায় মগ্ন হয়ে তারা একসময় শ্লোগান দিতে শুরু করেছিল, উন্নয়ন নাকি গণতন্ত্র। তারা এমনও বলেছিল যে উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র বিসর্জন দেয়া যেতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র সাংঘর্ষিক নয়। বরং পরিপূরক। গণতন্ত্রবিহীন উন্নয়ন কখনোই দেশের মানুষের কল্যাণ সাধন করতে পারে না। কোন দেশের জনগণই উন্নয়নের নামে গণতন্ত্র বিসর্জন দিতে চায় না। লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মোয়াম্মার গাদ্দাফি এবং ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন তাদের দেশের মানুষের জন্য বিনামূল্যে আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণসহ নানা ধরনের সুবিধা প্রদান করেছিলেন। ভর্তুকি মূল্যে জনগণের জন্য খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্য যোগান নিশ্চিত করেছিলেন। উভয় নেতাই তাদের তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করেছিলেন। জনগণের জন্য সর্বজনীন আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিলেন। গাদ্দাফি ঘোষণা করেছিলেন,বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার। ঘর তার যে তাতে বসবাস করেন। কর্নেল গাদ্দাফি এবং ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন তাদের দেশের তেল কোম্পানিগুলোকে জাতীয়করণ করেছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশী তেল কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের শেয়ার কিনে নেয়া হয়েছিল। এতে দেশ দু’টির রাষ্ট্রীয় আয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই অর্থ দিয়ে জনগণের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য কর মওকুফ সুবিধা দেয়া হয়েছিল। গাদ্দাফি মোট ৪২ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। আর সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় ছিলেন ২৪ বছর। গাদ্দাফি তার মেয়াদকালে একবারও লিবিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠান করেননি। গাদ্দাফি জামা হিরিয়া বা জনগণের প্রত্যক্ষ শাসন তত্ত্ব প্রচার করলেও সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল তার নিজের হাতে। আর ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের শাসনাধীনে ইরাকে কোন প্রত্যক্ষ বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৯৫ এবং ২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে ব্যালটে প্রার্থী হিসেবে শুধু সাদ্দাম হোসেনের নামই ছিল। তিনি প্রায় শতভাগ ভোট পেয়েছিলেন। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এবং লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মোয়াম্মার গাদ্দাফি নিজ দেশের জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তারা প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করেননি। জনগণ তাদের ভোটাধিকারি প্রয়োগ করতে না পাবার কারণে উভয় প্রেসিডেন্টের প্রতি ছিলেন ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফির পরিণতি এটাই প্রমান করে যে,শুধু লোক দেখানো উন্নয়ন এবং জনকল্যাণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা বিশ্বাস অর্জন করা যায় না। জনগণ কোন কিছুর বিনিময়ে তাদের বাক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার হারাতে চায় না। উভয় নেতার ব্যর্থতা ছিল একটাই তারা জনমতকে উপেক্ষা করে আজীবন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন থাকতে চেয়েছিলেন। তাই বিদেশে শক্তি যখন গাদ্দাফি অথবা সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করে তখন তার দেশের মানুষ কোন প্রতিবাদ না করে বরং খুশিই হয়েছিল। গণতন্ত্রহীনতায় কেউ বাঁচতে চায় না। বাংলাদেশের বিতাড়িত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কর্ণেল গাদ্দাফি এবং সাদ্দাম হোসেনের এক ক্ষেত্রে চমৎকার মিল খুঁেজ পাওয়া যায়। তারা তিনজনই আজীবন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন। দেশটাকে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি বলে মনে করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে এই তিন নেতা দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। আজীবন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার স্বপ্ন, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় দেয়া এবং ব্যাপক মাত্রায় রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের কারণে জনগণ তাদের প্রতি ছিল মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ। মানুষ উন্নয়ন চায় কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী ব্যয়ে। কিন্তু বিগত সরকার আমলে যে উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদিত হয়েছে তার উদ্দেশ্য জনকল্যাণ ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটে নেয়া।

পৃথিবীর ইতিহাসে দেশে দেশে নানা কারণে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান সংঘঠিত হবার নজির প্রত্যক্ষ করা যায়। ১৭৮৯ সাল থেকে ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে ছোট-বড় বিভিন্ন দেশে এ পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটে। বিশ্বে ১০০টিও বেশি দেশে কোন না কোন সময় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা বা সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশে মোট তিনবার সফর গণঅভ্যুত্থান সংঘঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটে,যার মাধ্যমে স্বৈরাচারি আইয়ুব সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হন। এর মাধ্যমে এরশাদের ৯ বছরের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে দেশে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের সরকার গঠনের সুযোগ পাচ্ছিল। কথায় বলে, কারো কারো কপালে সুখ বেশি দিন সহ্য হয় না। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব পাবার পর আওয়ামী লীগ নানা ধরনের অন্যায়-অপকর্মে নিয়োজিত হয়। ফলে দ্রুত তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে থাকে। তারা বুঝতে পারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কোনভাবেই তাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নেই। তাই ২০১১ সালে আদালতকে ব্যবহার করে বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে যে তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে তার কোন গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। স্বৈরাচারী শাসকদের মধ্যে একটি বিষয়ে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তারা দৃৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতি বেশি মনোযোগী থাকেন। তাদের উদ্দেশ্য থাকে, ‘অতি উন্নয়ন অতি দুর্নীতি।’ বিলিয়ার কর্ণেল গাদ্দাফি অথবা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের মতো শেখ হাসিনাও দৃশ্যমান উন্নয়নের প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী বা উৎসাহী ছিলেন। দেশে দেশে সংগঠিত গণঅভ্যুত্থানের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, মানুষ উন্নয়ন চাইলেই তার বিনিময়ে বাকÑস্বাধীনতা বা নিজেদের ভোটাধিকার বিসর্জন দিতে চায় না। স্বৈরাচারী শাসকগণ জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু কাজ করেন ঠিকই কিন্তু কোনভাবেই জনগণের বাক স্বাধীনতা এবং ভোটাধিকার প্রদান করতে ইচ্ছুক নন। আর সে কারণেই এক সময় মানুষ তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত করেন। অনেকেই বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে। স্মরণাতীতকালে আর কখনো বাংলাদেশে এমন উন্নয়ন সাধিত হয়নি। বিগত সরকার আমলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের পাশাপাশি যে দুর্নীতি হয়েছে অতীতে বাংলাদেশে সেটা আর কখনো হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ, যারা বুকের রক্ত দিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছে তারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আবারো প্রমাণ করেছে যে কোন কিছুর বিনিময়ে তারা বাক স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার বিসর্জন দিতে ইচ্ছুক নয়। আওয়ামী লীগ নির্যাতন-নিষ্পেষণের মাধ্যমে দেশের মানুষকে খেপিয়ে তুলেছিল। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতো। কথায় কথায়, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতেন। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এটাই যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আওয়ামী লীগের আমলেই। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করার পরও মানুষ আওয়ামী লীগের উপর ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত ছিল। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে।

গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে ৮ই আগস্ট ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় ১৮ মাস এদেশ পরিচালনা করেন। তাদের নানা ব্যর্থতা ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে তাদের সফলতাকে অস্বীকার করা যাবে না তাহলো জাতিকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়া। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি দলীয় জোট ক্ষমতাসীন হয়েছে। বিএনপি’র এই জয় ছিল প্রত্যাশিত। বিগত সরকার আমলে এই রাজনৈতিক দলটিই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। শত শত নেতা-কর্মীকে গুম করা হয়েছে। অনেককেই খুন করা হয়েছে। এই অবস্থায় দেশের মানুষ পরিবর্তন চাচ্ছিল। আর সেই পরিবর্তনের কান্ডারি হিসেবেই তারেক রহমান রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছেন। বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এমন দায়িত্বশীল বিরোধী দল অতীতে আর কখনোই প্রত্যক্ষ করা যায় নি। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে উপেক্ষা করার প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, যা মোটেও কাম্য নয়। বিরোধী দলের যৌক্তিক পরামর্শ উপেক্ষা করার পরিণতি ভালো নাও হতে পারে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে একটি বিষয় প্রত্যক্ষ করা গেছে, তারা শেখ মুজিবুর রহমানের উজ্জ্বল ইমেজ সৃষ্টির জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্রীয় খরচে ব্যক্তি ইমেজ বৃদ্ধির চেষ্টা করেছেন। যেন পৃথিবীর ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যার কোন তুলনা নেই। কিন্তু তারা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের শাসনকালের কথা একবারও উল্লেখ করেন না। কারণ তারা জানে সেই পুরনো অত্যাচার নির্যাতনের কথা স্মরণ হলে এখনো মানুষ তাদের ঘৃণা করবে। আগামীতে এমন এক দিন আসবে যখন আওয়ামী লীগ তাদের ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস আড়ালের চেষ্টা করবে।

নতুন সরকারের নিকট সাধারণ মানুষের চাওয়া অনেক বেশি। সেই গণপ্রত্যাশা পূরণের জন্য সরকারকে চেষ্টা চালাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জ্ঞানভিত্তিক আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছেন। বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দেশকে বিপর্যয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। বিরোধি রাজনৈতিক দলগুলোকে কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, দুর্নীতি-দুঃশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটে নেয়া, দলীয়করণ-আত্মীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ধ্বংস করে দেয়াসহ হেন অপকর্ম নেই যা করা হয়নি। দৃশ্যমান উন্নয়ন করা সত্ত্বেও মূলত এসব কারণেই সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের উপর ছিল ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, জনগণ বোকা বা নির্বোধ নয়, তারা সব কিছুই খেয়াল রাখে। কাজেই এমনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে যাতে অতীতের স্বৈরাচারীর প্রেতাত্মা আবারো ফিরে না আসে। জনগণ সরকারের বন্ধু নয় আবার শত্রুও নয়। জনগণকে বন্ধু বা শত্রু বানানোর জন্য সরকারের অনুসৃত কার্যক্রমই ভূমিকা পালন করে থাকে। কাজেই দলীয় নেতা-কর্মীদের অন্যায় কর্ম কোনভাবেই সমর্থন করা যাবে না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় গড়ে উঠুক আগামীর বাংলাদেশÑ এই আমাদের প্রত্যাশা।