প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়, পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি এখন অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি দুর্যোগ সে বাস্তবতাই সামনে নিয়ে এসেছে। কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যু, হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানলে বিস্তীর্ণ বনভূমি পুড়ে যাওয়া ও বায়ুদূষণের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে এসব ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে ১২৬ জন নিহত এবং প্রায় দেড় হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। প্রায় পাঁচ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সেন্টার ক্ষতির মুখে পড়েছে। ২৪টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। অর্থাৎ একটি বড় ভূমিকম্প কীভাবে একটি দেশের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থাকে একসঙ্গে বহু দিক থেকে বিপর্যস্ত করতে পারে, কলম্বিয়ার অভিজ্ঞতা তারই বাস্তব উদাহরণ।
বাংলাদেশের জন্য এ অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসছি। এসব ক্ষেত্রে আমাদের পূর্বপ্রস্তুতি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট অগ্রগতিও হয়েছে। কিন্তু ভূমিকম্পের মতো আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটা পর্যাপ্ত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ঢাকার মতো শহরে ঝুঁকির অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। অনেক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা হয়নি। কোথাও ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, কোথাও ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন করা হয়েছে অনুমোদন ছাড়াই। আবার অনেক এলাকায় সরু রাস্তা ও অতিরিক্ত ঘনবসতির কারণে দুর্যোগের সময় ফায়ার সার্ভিস বা উদ্ধারকারী যান দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। বড় ভূমিকম্পের পর শুধু ভবন ধসই নয়, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও যোগাযোগব্যবস্থা একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তাই ভূমিকম্পের প্রস্তুতি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো বিষয় নয়। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে কাঠামোগত পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোনো ভবন শক্তিশালী করতে হবে এবং নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। কারণ দুর্যোগের মুহূর্তে একটি অনিয়মই বহু মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কলম্বিয়ার মতো কোনো দেশে ভূমিকম্পের পর হাসপাতালই যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আহত মানুষের চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বাংলাদেশে বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহব্যবস্থা এবং জরুরি যোগাযোগকেন্দ্রগুলোকে সচল রাখার জন্য আলাদা দুর্যোগ পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। হাসপাতালের বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা, জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং দ্রুত রোগী স্থানান্তরের পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখতে হবে।
ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ঘটনাও বাংলাদেশের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুম ও তীব্র দাবানলের কারণে বিপুল বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে বিভিন্ন এলাকার বায়ুর মান এতটাই খারাপ হয়েছে যে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। এ ঘটনা আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাবের কথাও মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশে জলাধার ভরাট, খোলা জায়গা কমে যাওয়া, বৃক্ষনিধন এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ একটি শহরকে শুধু বসবাসের জন্য অস্বস্তিকর করে না, দুর্যোগের সময় আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ভূমিকম্প, অগ্নিকা- বা অতিবৃষ্টির পর মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
জনসচেতনতাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগের সময় মানুষ কী করবে, কোথায় আশ্রয় নেবে, কীভাবে আহতদের সহায়তা করবে এবং কীভাবে জরুরি সেবা পাবে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, কারখানা ও আবাসিক এলাকায় নিয়মিত মহড়া আয়োজন করা যেতে পারে। শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নয়, নাগরিকদেরও দুর্যোগ মোকাবিলার অংশীদার হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় যে অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা অর্জন করেছে, তা অন্যান্য দুর্যোগের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যেতে পারে। আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রমের ফলে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য দেখিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই অভিজ্ঞতাকে ভূমিকম্প, অগ্নিকা-, তাপপ্রবাহ ও নগর দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা।