দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের। সকাল, দুপুর কিংবা রাত নেই, সবসময়ই বিদ্যুৎ যাচ্ছে- এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের দেড় ঘণ্টা থাকে না। তীব্র গরমে ধারাবাহিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা।
বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। একসময় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল উন্নয়নের বড় বাধা। এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দেশে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা এবং আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা যায়নি। বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে গ্যাসের ঘাটতি। পাশাপাশি কয়লা ও তেল সংগ্রহেও অর্থ ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট রয়েছে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, জ্বালানিসংকটে দেশে রেকর্ড লোডশেডিং হচ্ছে। এতে বলা হয়, দেশে আমদানিসহ স্থাপিত বিদ্যকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সক্ষমতার অর্ধেক চাহিদা উঠলেই সামাল দিতে পারছে না বিদ্যুৎ খাত। মূলত গ্যাস ঘাটতি, পায়রা ও আদানির কেন্দ্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র পর্যাপ্ত পরিমাণে চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতার অভাব থাকায় বিদ্যুতের উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে সারা দেশেই লোডশেডিং চলছে। সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) তথ্যমতে, সোমবার দিবাগত রাত ১টায় দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। ঐ সময় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়েছিল। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়নি। আর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, সোমবার ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৪০৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে লোডশেডিং হয় ২৭২২ মেগাওয়াট। সবচেয়ে বেশি পরিমাণে (৫৪৭ মেগাওয়াট) লোডশেড হয় ঢাকা অঞ্চলে। আর চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোনো লোডশেডিং হয়নি। তবে ঘণ্টার বিচারে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলে। অথচ দেশে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি।
খবরে বলা হয়, ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ আগস্টের শুরু থেকেই পরিস্থিতি ক্রমে খারাপ হচ্ছে। গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। তিন সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি এতটা নাজুক ছিল না। বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে জ্বালানি এবং টাকা ও ডলারের ঘাটতি। উৎপাদনকেন্দ্র আছে, কিন্তু সেগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তেল নেই। আবার ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র বেশি সময় চালালে পিডিবির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকি আরো বাড়বে। দীর্ঘদিনের পুরোনো বকেয়ার কারণে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি কেনার সক্ষমতাও চাপে পড়েছে। এর মধ্যেই গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তারপরও বিদ্যৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি।
আমরা মনে করি, এ পরিস্থিতিতে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সংকটের প্রকৃত কারণ জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির অভাবে বন্ধ, কোনটি অর্থের অভাবে উৎপাদন কমাচ্ছে, কোথায় গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি এবং কোন কেন্দ্র চালাতে কত ব্যয় হচ্ছে এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো, জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি দক্ষতার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুৎ খাতকে শুধু নতুন কেন্দ্র নির্মাণের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কত, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রয়োজনের সময়ে কতটা বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা যাচ্ছে। বর্তমান সংকট আমাদের সেই মৌলিক শিক্ষা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে। অতিরিক্ত সক্ষমতা গর্ব নয়, বাস্তব উৎপাদন ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত বিদ্যুৎ নীতির প্রধান লক্ষ্য। আজকের লোডশেডিং তাই সাময়িক সংকট হিসেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; এটি বিদ্যুৎ খাতের নীতি ও ব্যবস্থাপনা নতুন করে পর্যালোচনার একটি জরুরি সংকেত। আমরা সরকারের কাছে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার অনুরোধ জানাই। লোড শেডিং সমস্যার সমাধান জরুরী হয়ে পড়েছে।