বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা আবারও ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি কেবল নিয়োগপ্রক্রিয়ার একটি প্রশাসনিক পরিবর্তনের বিষয় নয়, এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে শিক্ষার মান, শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ। গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণী প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে। সেখানে বলা হয়েছে, এনটিআরসিএ ভবিষ্যতে কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে এবং ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না। প্রত্যয়নপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও সভায় মতামত দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও প্রতিবাদ শুরু হলে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার এখনো এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এ কথা সত্য যে, এনটিআরসিএর বর্তমান ব্যবস্থায় নানা সমস্যা রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, শূন্য পদের তথ্যের অসামঞ্জস্য, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থায় সমস্যা থাকলেই তার মূল কাঠামো বাতিল করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া সমাধান হতে পারে না। বরং প্রয়োজন বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা সংস্কার করা। এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে অন্তত নীতিগতভাবে মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে স্থানীয় প্রভাব, ব্যক্তিগত সুপারিশ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব কমানোর একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিকে আরও শক্তিশালী করা উচিত।

অন্যদিকে, অতীতে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, স্থানীয় প্রভাব এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল। নিয়োগের ক্ষমতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হলে সেই পুরোনো চক্র আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে যেখানে একটি পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থীর মেধার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কাজ করার সুযোগ থাকে, সেখানে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির কোনো ভূমিকা থাকবে না। একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রয়োজন, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা বিবেচনায় তাদের মতামতের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সে ভূমিকা এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত মেধাক্রম বা যোগ্যতার মানদণ্ড পাশ কাটিয়ে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। শিক্ষক বাছাই ও মেধাক্রম নির্ধারণের মূল দায়িত্ব থাকবে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে। আর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন ও প্রশাসনিক দিক থেকে মতামত দিতে পারবে। এতে একদিকে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদাও বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব হবে।

প্রয়োজনে এনটিআরসিএকে আরও স্বাধীন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যেতে পারে। নিয়োগের সময়সীমা নির্ধারণ, শূন্য পদের নির্ভুল ডাটাবেস তৈরি, অনলাইন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। এনটিআরসিএর বর্তমান কাঠামো যথেষ্ট কার্যকর না হলে সরকারি কর্ম কমিশনের মতো একটি আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়োগ কাঠামো নিয়েও আলোচনা হতে পারে। মূল কথা হলো, শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা আর্থিক প্রভাবের সুযোগ থাকা উচিত নয়। যোগ্য শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে একজন প্রার্থীর সাফল্য নির্ধারিত হবে তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও পেশাগত সক্ষমতার ভিত্তিতে, কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে বা কতটা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ রয়েছে তার ভিত্তিতে নয়। সরকার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে বিতর্কের এ পর্যায়ে সরকারের সামনে সবচেয়ে ভালো পথ হলো, বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা। এনটিআরসিএর দুর্বলতা থাকলে তা দূর করতে হবে, নিয়োগপ্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। কিন্তু অতীতের অনিয়মের যে বাস্তবতা থেকে মেধাভিত্তিক কেন্দ্রীয় নিয়োগব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল, সে বাস্তবতা ভুলে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হবে নিঃসন্দেহে পেছনের দিকে যাত্রা ।