যুদ্ধ পৃথিবীতে নতুন কোনো বিষয় নয়। যুদ্ধ অতীতে হয়েছে, বর্তমানে চলছে, ভবিষ্যতেও হয়তো পৃথিবী যুদ্ধমুক্ত থাকবে না। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলোÑ যুদ্ধে শুধু অস্ত্রের ব্যবহার হয়না, ধর্মের ব্যবহারও হয়। তবে ধর্মের ব্যবহারে রকমফের লক্ষ্য করা যায়। নবী-রাসূলরা মানবমুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছেন, সংগ্রাম করেছেন। ধর্ম-দর্শনের আলোকে তারা কাজ করেছেন, ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তারা কাজ করেছেন। ফলে তাদের সংগ্রামে, যুদ্ধে ধর্ম যুক্ত ছিল। নবী-রাসূলরা ধর্মের সদ্ব্যবহার করেছেন। তবে যুদ্ধে ধর্মের অপব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। জালেম ও আগ্রাসী শাসকরা এ কাজটি করে থাকেন। যেমন এখন করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। নিজেকে খৃস্টান হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন ট্রাম্প। দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে একাধিকবার নিজের কর্মকাণ্ডের পক্ষে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। গত সোমবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ঈশ্বর ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তার ভাষায় ‘ঈশ্বর মঙ্গলময়’ এবং তিনি ‘মানুষের কল্যাণ দেখতে চান’। আর ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরান যুদ্ধকে ‘ঐশ্বরিক অনুমোদনপ্রাপ্ত’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, ঈশ্বর মার্কিন বাহিনীর পক্ষে রয়েছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর পেন্টাগণের একটি গীর্জায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে হেগসেথ তার প্রার্থনায় সামরিক শত্রুদের বিরুদ্ধে সহিসংতার আহ্বান জানান এবং বলেন, প্রতিটি গোলা যেন শত্রুদের গায়ে আঘাত হানে।

ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে আমরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বয়ান জানলাম। তারা তো বললেন, ঈশ্বর ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করেন এবং ঈশ্বর মার্কিন বাহিনীর পক্ষে রয়েছেন। এর বিপরীতে আমরা পোপ লিও চতুর্দশ-এর প্রতি মনোযোগ দিতে পারি। তিনি বলেছেন, সামরিক শক্তি কখনোই প্রকৃত শান্তি ও স্বাধীনতা এনে দিতে পারে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন যখন ইরান-ইসরাইল সংঘাতে ধর্মকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন, তখন পোপ স্পষ্টভাবেই সেই অবস্থান নাকচ করেছেন। তিনি বলেছেন, ঈশ্বর কোনো সংঘাতকে আশীর্বাদ করেন না। যারা এক সময় তলোয়ার চালিয়েছে এবং আজ বোমা ফেলছে, যিশুখৃস্টের কোনো অনুসারী কখনোই তাদের পক্ষে থাকতে পারে না। পোপ আরো বলেন, শান্তি আসে মানুষের মধ্যে ধৈর্যশীল সহাবস্থান ও সংলাপের মাধ্যমে। পোপ অবশ্য তার পোস্টে সরাসরি ট্রাম্প বা অন্য কোনো নেতার নাম উল্লেখ করেননি।

ইরানের সভ্যতা ধ্বংসের যে হুমকি দিয়ে ছিলেন ট্রাম্প, তার সমালোচনা করেন পোপ লিও। তিনি একে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল ঘৃণাকে উসকে দিচ্ছে। এছাড়া সাম্প্রতিক এক গণপ্রার্থনায় পোপ জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধের পক্ষে সাফাই গাইতে ঈশ্বরকে ব্যবহার করা যায় না। হাজারো মানুষের সামনে পোপ বলেন, ‘ঈশ্বর যুদ্ধবাজদের প্রার্থনা শোনেন না, বরং তা প্রত্যাখ্যান করেন।’ পোপের বক্তব্যের পর উপলব্ধি করা যায়, ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী যে বয়ান দিয়েছেন, তার কোনো ভিত্তি নেই। বরং তারা ধর্মের অপব্যবহার করেছেন এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। যুদ্ধ নয়, বিশ্বের মানুষ শান্তি চায়, শান্তি চায় যুক্তরাষ্ট্রের মানুষও। তাই তো যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তাদের কণ্ঠে ছিল ‘নো কিং’ স্লোগান। তারা ট্রাম্পের মতো কোনো স্বৈরাচারী রাজাকে চান না। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ফাঁদে যে প্রেসিডেন্ট পা দেয়, তাকে কিভাবে সমর্থন করবে দেশের নাগরিকরা। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের আগের কয়েকজন প্রেসিডেন্টকেও ইরানে হামলা চালানোর প্ররোচনা দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তারা সেই ফাঁদে পা দেননি, কিন্তু ফাঁদে পা দিলেন ট্রাম্প। এখন কর্মফলতো ভুগতেই হবে।