গ্রীষ্মকাল শুরু না হতেই দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকেই না বলা চলে। শহরেও হচ্ছে লোডশেডিং। ফলে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বিদ্যুতের ঘাটতি ১ হাজার মেগাওয়াট হলে সারা দেশে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়। রাজধানী বা শহর এলাকার তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং বেশি দেওয়া হয়। বর্তমানে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের ব্যবহার কমায় দোকানপাট ও শপিং মল সন্ধ্যা ৭টায় বন্ধ হলেও লোডশেডিং কমানো যাচ্ছে না। জানা যায়, জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেশে বর্তমানে ৩৩টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হলেও বিতরণ কোম্পানিগুলোকে লোডশেডিংয়ের পথে হাঁটতে হচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) সারা দেশে লোডশেডিং ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আমদানিসহ) রয়েছে। এগুলোর সর্বমোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। আর প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক ৬ হাজার ২৭৩ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েলের ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট এবং সৌরবিদ্যুৎ ৮৩৯ মেগাওয়াট।

পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বলছে, দেশে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ১২ এপ্রিল সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ হাজার ৯২৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, মোট সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাকি অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বিদ্যুতের লোডশেডিং ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গরম যত বাড়ছে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং বিদ্যুতের চাহিদা। সূত্রমতে, আগে বিকল্প জ্বালানি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও এবার বেশ কিছু কারণে গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে লোডশেডিং পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আর বিদ্যুৎ বিভাগ এরই মধ্যে জ্বালানি সংকটে লোডশেডিং হওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেছে। এ অবস্থায় শহরে তুলনামূলক কম লোডশেডিং হলেও গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। গ্যাস ও কয়লা সংকটে সক্ষমতার পুরো বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সম্ভব হচ্ছে না। গ্রীষ্মের আগেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎখাত। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও উঠছে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমায় লোডশেডিং ছাড়িয়েছে ১ হাজার মেগাওয়াট।

জানা গেছে, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে। জ্বালানির অভাবে অলস পড়ে আছে অনেক কেন্দ্র। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে কাতার ও ওমান থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ নেমেছে ৯০ কোটি ঘনফুটের ঘরে। গত বছর যা ছিল ১১০ কোটি ঘনফুট। সেইসঙ্গে তরল জ্বালানির মজুতও কমেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি সচিবালয়ে সাংবাদিদের বলেন, ‘যুদ্ধ যতদিন থাকবে ততদিন এ ক্রাইসিস থাকবে। তারপরও আমরা অন্য যে সকল গ্যাস আমদানির সোর্স রয়েছে সেগুলো থেকে আমদানির ব্যবস্থা করছি। তবে অবস্থা অসহনীয় হবে না, সহনীয়ই থাকবে। জ্বালানি না থাকলে তো বিদ্যুৎ প্রডিউস সম্ভব নয়।’

আমরা মনে করি অবস্থা অসহনীয় হবে না বলে মন্ত্রী আশ্বস্ত করলেও জনমনে স্বস্তি আসবে না। তারা লোড শেডিং এর ভোগান্তি থেকে মুক্তি চায়। আমরা লোড শেডিং কমানোর বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাই।