পৃথিবীতে সমস্যা বাড়ানো তো কোনো নেতার কাজ হতে পারে না। আর তিনি যদি হন বিশ্বনেতা, তা হলে তো সমস্যা কমানো তার দায়িত্ব হয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমান সভ্যতার ট্র্যাজেডি হলো, বিশ্বনেতারা কাক্সিক্ষত দায়িত্ব পালন করছেন না, বরং তারা সমস্যার মাত্রা বাড়িয়ে তুলছেন। ঝাণ্ডাটা লাল হোক কিংবা সাদা, তাতে তেমন তারতম্য লক্ষ্য করা যায় না। পরাশক্তিবর্গ তো একে অপরকে ধ্বংস করার সামর্থ্য রাখে। কিন্তু এতো বিদ্বেষ ও শত্রুতার পরও তারা সে পথে অগ্রসর হচ্ছে না কেন? কারণটা অস্পষ্ট কিছু নয়, এটা হলো প্রত্যাঘাতের ভয়। এই ভীতির কারণেই পরাশক্তির মধ্যে লক্ষ্য করা যায়, ‘ভীতির ভারসাম্য।’ কোল্ডওয়ারের সময় থেকে আমরা এই ভারসাম্য লক্ষ্য করে আসছি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হামলার শিকার হলেও আমেরিকা, রাশিয়া, চীনসহ পরাশক্তিবর্গ কিন্তু হামলার শিখার হচ্ছে না।
জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে নানা বিষয়ে বাহাস লক্ষ্য করা গেলেও কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে অলিখিত সমঝোতা। এর একটি হলো, তাদের মর্জির বাইরে কেউ পরমাণু শক্তির অধিকারী হতে পারবে না। এমন দৃষ্টিভঙ্গিই কাল হয়েছে ইরানের জন্য। ইরান যতই বলুক, আমাদের পরমাণু চর্চা পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য নয়, বরং শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য, তাতে কিন্তু আস্থা রাখছে না যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। তাইতো বারবার হামলা ইরানের ওপর। কি অদ্ভুত আচরণ-আমার পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে কিন্তু তোমার থাকতে পারবে না, চেষ্টা চালালে আক্রমণ করবো। এখানে যুক্তি বা ন্যায়ের কোনো বিষয় আছে কী?
পৃথিবীতে স্থিতি ও ন্যায় প্রয়োজন। কিন্তু পরাশক্তিবর্গ এ পথে হাঁটছে না। ইউরোপীয় রেনেসাঁর পর শিল্পবিপ্লবের অভিযাত্রায় বিশ্ববাসী পরাশক্তিবর্গের ‘শক্তিরূপ’ দেখেছে, ‘শান্তিরূপ’ দেখাতে তারা সমর্থ হয়নি। সেই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববাসী এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যে জীবনযাপন করছে। এবারের ইরানযুদ্ধ সেই আতঙ্কের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে তো লাল ও সাদা ব্লকের মধ্যে একটা ‘ভীতির ভারসাম্য’ ছিল, এখন কি সেখানে চিড় ধরতে শুরু করেছে? ইউরোপ ও আমেরিকা মিলে যে ‘পাশ্চাত্য’, সেখানে ফাটল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আটলান্টিকের এপার এবং ওপার এখন আর এক সুরে নেই। ফিলিস্তিন ও ইরান ইস্যুতে আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে এখন চিন্তার পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখানে আরো ইস্যু আছে। সামরিক জোট ‘ন্যাটো’ এখন সংকটের মধ্যে পড়ে গেছে।
ওয়াশিংটন থেকে রয়টার্স জানায়, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ন্যাটো মিত্রদের ব্যর্থতা এবং গ্রীনল্যান্ড কেনার পরিকল্পনায় অগ্রগতি না হওয়ায় বেশ ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই ইউরোপ থেকে কিছু মার্কিন সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনা করেছেন। হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, প্রতিরক্ষা ব্যয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর অনীহার অভিযোগে ট্রাম্পের সঙ্গে ন্যাটোর সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে টালমাটাল থাকলেও গত তিন মাসে তা বেশ দ্বন্দ্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জানুয়ারিতে ডেনমার্কের শাসনাধীন অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের দীর্ঘদিনের হুমকি পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাম্প এক সংকটের জন্ম দেন। এদিকে দ্য ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল বুধবার এক প্রতিবেদনে জানায়, যেসব দেশের নেতারা ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন, সেখান থেকে সেনা সদস্যদের সরিয়ে মিত্র দেশগুলোতে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। উপলব্ধি করা যায় ডোনান্ড ট্রাম্প বেশ অস্থির অবস্থায় আছেন। তার আগ্রাসী ও অযৌক্তিক তৎপরতায় বিশ্বের সংকট বাড়ছে। আর এমন বাস্তবতায় নেতানিয়াহু চাচ্ছেন তার গ্রেটার ইসরাইল পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে। উভয়ের অযৌক্তিক ও অনৈতিক তৎপরতায় শুধু যে সংকটের মাত্রা বাড়ছে তা নয়; পরাশক্তিমণ্ডলীর মধ্যে যে একটা ‘ভীতির ভারসাম্য’ ছিল, সেখানেও দেখা দিয়েছে ফাটল। এর পরিণতি সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভাবলে ভালো করবেন।