মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, চাঁদাবাজি বিষয়টা আসলে কী? এটা কি কোনো অভ্যাস, প্রশ্রয়, নাকি নষ্ট রাজনীতির বিকৃতি? কোরবানির পবিত্র উৎসবের সাথে চাঁদাবাজি কিভাবে যুক্ত হয়? ওদের ধর্মবোধে কি কোনো প্রশ্ন জাগে না? চাঁদাবাজি এবারও হয়েছে, তবে দিয়াবাড়ি পশুর হাটে অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজি হয়েছে বলে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ি কোরবানির পশুর হাটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খামারি ও ব্যাপারীরা অভিনব সব চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। ব্যাপারীদের পছন্দমতো জায়গা পেতে গরুপ্রতি চাঁদা তোলা হয়েছে। ইজারাদারের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিকুল আবহাওয়ায় কাদা থেকে বাঁচতে খামারিদের চড়া দামে বালু কিনতেও বাধ্য করা হয়েছে। এছাড়া হাট থেকে ক্রেতাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা প্রতিটি ট্রাক ও পিকআপ থেকেও চাঁদা নেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অব্যবস্থাপনা ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
বালু বিক্রি করা শাওন ও ট্রাকে স্টিকার দিয়ে চাঁদা আদায়কারী উত্তরা পশ্চিম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব হানিফ দাবি করেন, ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এসএফ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী ও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শেখ ফরিদ হোসেনের কাছ থেকে তিনি টেন্ডার নিয়েছেন। তবে ইজারাদার ফরিদের দাবি, তিনি হাসিল ওঠানো ব্যতীত অন্য কোনো কিছুরই টেন্ডার দেননি। এসব দাবি যারা করছেন, তিনি তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান। তিনি বলেন, আমার এই হাটই একমাত্র হাট, যেখানে কোনো চাঁদাবাজি হয়নি। অথচ সরেজমিনে জানা যায়, প্রথমে হাটে নেমেই চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন খামারি ও ব্যাপারীরা। তারা বলেন, পছন্দমতো জায়গায় গরু রাখতে তাদের টাকা গুণতে হয়েছে। কুষ্টিয়ার নাসির উদ্দীন বলেন, পাঁচটি গরু রাখার একটু জায়গার জন্য তাকে এক হাজার টাকা দিতে হয়েছে। একই অভিযোগ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক ফার্ম পরিচালকও। এছাড়া রাজধানীর সবেচেয়ে বড় কোরবানির এই পশুর হাটে মঙ্গলবার গভীর রাতে মাইকিং করে জাননো হয়, হাটে থাকা প্রতিটি গরুর জন্য এক হাজার টাকা করে দিতে হবে। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন পশুচিকিৎসক আজিজুল হক, কুষ্টিয়ার মাসুদ রানা ও চুয়াডাঙ্গার হাবিবসহ কয়েকজন ব্যাপারী। খামারি ও ব্যাপারীরা বলছেন, হাটে প্রায় আড়ই লাখ গরু এসেছে। সে হিসেবে এই চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা। ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এসএফ করপোরেশনের ভলেন্টিয়াররা কখনো এটাকে ‘শেড খরচ’, আবার কখনো ‘বকশিশ’ দাবি করে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করেছেন টাকা দিতে।
পাবনার পশু চিকিৎসক আজিজুল হক জানান, হাটে পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনা, কাদা-পানি আর টয়লেট সংকটসহ নানা কারণে এমনিতেই পশুর দাম কম ছিল, যার ফলে তার ১৩টি গরুতে প্রায় পৌণে দুই লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এর ওপর রাসেল, তুষার ও মনসুরসহ বেশ ক’জন এসে তার কাছে টাকা দাবি করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আজিজুল বলেন, এখনো যদি আমাদের এ ধরনের চাঁদাবাজির মধ্যে পড়তে হয়, তাহলে আমরা মুক্তি পাবো কবে? দিয়াবাড়িতে অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজির যে চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তা খুবই দুঃখজনক। এখানে ইজরাদার ও প্রশাসনের কাংখিত ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি। বরং লক্ষ্য করা গেছে সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাদের দাপট ও চাঁদাবাজির চিত্র। এমন চিত্র ফ্যাসিবাদী আমলকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাহলে নতুন বাংলাদেশ কিভাবে গঠিত হবে? সরকার কি সময়ের চ্যালেঞ্জ উপলব্ধি করতে পারছে? সময় যে বয়ে যায়।