॥ আনোয়ার আল হক ॥

চলচ্চিত্র সমাজ-সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। চলচ্চিত্র শুধু পর্দায় ভেসে ওঠা কিছু দৃশ্যের সমষ্টি নয়; এটা মানুষের অনুভূতির ভাষা, স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি, আর একটি জাতির আত্মার প্রতিধ্বনি। একটি গল্পকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে একজন পরিচালক তার সৃষ্টিশীলতা এবং নান্দনিকতা দিয়ে বাস্তবতার ক্যানভাসে মূর্ত করে তোলেন।

একটি ভালো চলচ্চিত্র আমাদের কাঁদায়, হাসায়, ভাবায়-কখনো প্রতিবাদ করতে শেখায়, আবার কখনো ভালোবাসতে শেখায়। আমরা যখন একটি গল্পের চলমান চিত্র দেখি, তখন আমরা শুধু দর্শক থাকি না; আমরা সেই গল্পের অংশ হয়ে যাই। চরিত্রগুলোর সুখে আমরা হাসি, তাদের দুঃখে আমাদের চোখ ভিজে ওঠে। এটাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি- এটি মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারে।

তা আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সৃজনশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত- “জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য”।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩রা এপ্রিল জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস পালিত হয়। এই দিনটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস, সংগ্রাম, সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতীক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল বহু প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। ১৯৫৬ সালে নির্মিত ‘মুখ ও মুখোশ’ ছিল এ দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্র শুধু একটি সিনেমা ছিল না, বরং এটি ছিল বাঙালির নিজস্ব গল্প বলার প্রথম সাহসী পদক্ষেপ।

গদএর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছিল-আমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং আবেগ দিয়েই আমরা বিশ্বকে কিছু দিতে পারি। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, যা আজ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন বা সংক্ষেপে বিএফডিসি নামে পরিচিত। এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতেই ৩ এপ্রিলকে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিএফডিসি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই ভূখ-ে চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং বাংলা চলচ্চিত্রের এক নতুন যুগের সূচনা হয়।

জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস আমাদের সেই ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার গুরুত্বকে নতুন করে উপলব্ধি করায়। চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম, যা মানুষের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে।

আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে গ্রামীণ জীবন, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক বৈষম্য, প্রেম, মানবিকতা-এসব বিষয় অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো আমাদের জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত করে এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানতে উদ্বুদ্ধ করে। জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস উদযাপনের মাধ্যমে আমরা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট শিল্পী, কলাকুশলী, পরিচালক এবং প্রযুক্তিবিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তাদের নিরলস পরিশ্রম ও সৃজনশীলতার ফলেই আজকের এই চলচ্চিত্র শিল্প দাঁড়িয়ে আছে।

একই সঙ্গে এই দিবসটি আমাদের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে-আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প কি তার যথাযথ মান ধরে রাখতে পারছে? আমরা কি আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র তৈরি করতে পারছি? নতুন প্রজন্ম কি এই শিল্পে আগ্রহী হচ্ছে?

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণ আরও সহজ হয়েছে, কিন্তু মান বজায় রাখা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে শেখায়-কিভাবে আমরা আমাদের চলচ্চিত্রকে আরও সমৃদ্ধ, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের করে তুলতে পারি।

এছাড়াও, এই দিবস তরুণ নির্মাতাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার উৎস। তারা নতুন চিন্তা, নতুন গল্প এবং নতুন প্রযুক্তি নিয়ে চলচ্চিত্রে আসতে উৎসাহিত হয়। ফলে চলচ্চিত্র শিল্পে সৃষ্টিশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এটি আমাদের সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচারে ভূমিকা রাখে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভাষা, ঐতিহ্য, পোশাক, জীবনধারা এবং সামাজিক মূল্যবোধকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারি।

বিশ্বায়নের এই যুগে যখন বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে, তখন নিজস্ব সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে চলচ্চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই দায়িত্ব পালনে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস আমাদের সচেতন করে তোলে।

চলচ্চিত্র কেবল একটি শিল্প নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। তাই জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস আমাদের কাছে কেবল একটি উদযাপনের দিন নয়, বরং এটি আমাদের আত্মসমালোচনা, অঙ্গীকার এবং নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।

চলচ্চিত্র সময়কে ধরে রাখে। যে ইতিহাস আমরা বইয়ে পড়ি, চলচ্চিত্র তা চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে। একটি প্রজন্ম চলে যায়, আরেকটি প্রজন্ম আসে; কিন্তু চলচ্চিত্র সেই সময়, সেই মানুষ, সেই অনুভূতিকে অমলিন করে রেখে দেয়। তাই একটি জাতির ইতিহাস, সংগ্রাম, ভালোবাসা- সবকিছুই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অমর হয়ে থাকে। পরিশেষে বলতে চাই-আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে হলে সরকার, নির্মাতা, শিল্পী এবং দর্শক- সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সমৃদ্ধ, মানসম্মত এবং বিশ্বমানের চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তুলতে পারবো।

লেখক : সাংবাদিক।