দেশে হাম সংক্রমণ আবারও এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা নিছক একটি মৌসুমি জনস্বাস্থ্য সমস্যার সীমা অতিক্রম করেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু-এর মধ্যে ২ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত এবং বাকি ৫ জন উপসর্গ নিয়ে-আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক কঠোর সতর্কসংকেত। একই সময়ে ৭২৯ শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ৮২ জনের মধ্যে রোগ শনাক্ত হওয়া পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এ ধরনের ধারাবাহিক প্রবণতা দেখায় যে, সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি; বরং নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোতে তা নতুন করে বিস্তার লাভ করছে।

গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। নিশ্চিতভাবে ৩০ শিশুর মৃত্যু এবং উপসর্গ নিয়ে ১৫৬ শিশুর মৃত্যু-এ দু’টি সংখ্যা মিলিয়ে যে চিত্র দাঁড়ায়, তা নিঃসন্দেহে একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। কারণ, উপসর্গভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যা অনেক সময় প্রকৃত সংক্রমণের পরিধি সম্পর্কে একটি বৃহত্তর ধারণা দেয়। এর অর্থ, হয়তো আরও অনেক ক্ষেত্র শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে অথবা সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না।

হাম একটি উচ্চমাত্রায় সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাপী বহু আগেই এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, কার্যকর টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এই রোগকে প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অনেক দেশ ইতোমধ্যে তা করে দেখিয়েছে। সে বিবেচনায় বাংলাদেশে এ ধরনের মৃত্যুহার কেবল দুঃখজনক নয়, বরং প্রশ্নবিদ্ধও। কারণ, আমাদের দেশে বহু বছর ধরে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি চালু রয়েছে, যা অতীতে সফলতার নজিরও স্থাপন করেছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? প্রথমত, টিকাদান কাভারেজে ফাঁকফোকর তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শহরের বস্তি, দুর্গম গ্রামাঞ্চল এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো অনেক শিশু টিকার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার প্রবাহে যে ব্যাঘাত ঘটেছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তৃতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা ও অনীহাও একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ শনাক্ত রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা এটাই প্রমাণ করে যে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একদিকে জনসংখ্যার ঘনত্ব, অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সীমাবদ্ধতাÑএই দুইয়ের সমন্বয়ে এমন পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে একটি সংক্রামক রোগ দ্রুত মহামারির রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেখায় যে, এটি কোনো একক অঞ্চলের সমস্যা নয়; বরং ধীরে ধীরে তা বিস্তৃত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলোÑএ অবস্থায় করণীয় কী? প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে জরুরি ভিত্তিতে পুনরুজ্জীবিত করা। শুধুমাত্র রুটিন টিকাদান যথেষ্ট নয়; দরকার বিশেষ ক্যাম্পেইন, যেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয় উপস্থিতি বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন কৌশল নিতে হবে। প্রচলিত প্রচারণার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অনেক অভিভাবক এখনো বুঝতে পারেন না যে, হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো অবহেলা করলে তা কত দ্রুত মারাত্মক জটিলতায় রূপ নিতে পারেÑযেমন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা অপুষ্টিজনিত জটিলতা।

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে যেভাবে বিপুলসংখ্যক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তা সামাল দিতে অনেক হাসপাতালেই চাপ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, অক্সিজেন সরবরাহ এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং আইসোলেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে, যাতে সংক্রমণের চেইন ভাঙা যায়। চতুর্থত, তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক তথ্যের অভাবে নীতিনির্ধারণে বিলম্ব ঘটে। প্রতিদিনের আপডেট তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণামূলক কাজের মাধ্যমে কোন অঞ্চল বা জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তা চিহ্নিত করতে হবে।