॥ মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী ॥

যে দেশে শিক্ষক সমাজ অবহেলিত, অসম্মানিত এবং পদে পদে অপদস্ত ও নির্যাতিত হয়ে থাকে সে দেশের শিক্ষার মান ও শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনা দুস্কর। এই সেদিন চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে শাসন করার জেরে ছাত্রীর অভিভাবক কর্তৃক সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এটা কত নিন্দনীয় কাজ। শিক্ষকরাই হচ্ছেন জাতির গুরুজন এবং শ্রদ্ধার পাত্র। আর এই বাংলাদেশে শিক্ষার্থীকে শাসন করার জন্য শিক্ষক সমাজের উপর এ ধরনের হামলা নির্যাতন যা কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শিক্ষক হচ্ছেন ্ওমন একজন ব্যক্তি যিনি কোন প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ বা অন্য কোন উপায়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ অর্জনে সহায়তা করে থাকেন। শিক্ষকরা হচ্ছেন পরম শ্রদ্ধেয় গুরুজন।

একটি সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠে শ্রেণি কক্ষে। আর সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান কারিগর হলেন শিক্ষক। রাজনীতি, নেতৃত্ব, আন্দোলন সবকিছুর মূল্য আছে কিন্তু যে মানুষটি একজন শিশুকে মানুষ হতে শেখান বা সমাজে মানুষ তৈরী করে থাকেন তার মর্যদার উর্দ্ধে অন্য কোন পরিচয় থাকতে পারে না। আজকাল উদ্ধেগজনকভাবে দেখা যায় যে, কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ও স্থানীয় প্রভাবের দাপটে স্কুল-কলেজে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করছে, হুমকি দেন, অপমান-অপদস্ত করেন বা প্রশাসনিক কাজে অযচিত হস্তক্ষেপ বা বাধাগ্রস্ত করা হয় ইহা শুধু শিক্ষক সমাজের জন্য অসম্মান শুধু নয়, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত। অর্ন্তবর্তী সরকারের আমল থেকে বিভিন্ন বিদ্যালয় বা কলেজে শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার প্রবণতা শুরু হয়েছে যা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। মূলত: ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি, বৈষম, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, এবং শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি ইত্যাদিকে সাধারণত: দায়ী করা হয়। এ ধরনের ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক মান ও শিক্ষকদের মর্যাদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে থাকে।

মব ভায়োলেন্স করে ক্ষমতার প্রদর্শন করা ঠিক নয়। প্রকৃত নেতা বা নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব, সংযম শালীনতা এবং অন্যকে সম্মান করার মন-মানসিকতা। ভদ্র লোকেরা সাধারণত: শ্ক্ষিকদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেন না বা করার মন মানসিকতাও তাদের থাকে না। কারণ তিনি জানেন বা উপলব্দি করেন যে, তার নিজের শিক্ষাজীবন কোন না কোন শিক্ষকের হাত ধরেই শুরু হয়েছে। অসুস্থ ও নোংরা রাজনীতি এদেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার লাঘাম টেনে ধরছে। স্কুল ও কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কোন রাজনেতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ নয়। এগুলো জ্ঞান চর্চা, যুক্তিবোধ, মানবিকতা ও চরিত্র গঠনের স্থান। সেখানে যদি শিক্ষকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন বা অপমান-অপদস্ত হন তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব পরবে শিক্ষার্থীদের মনোজগৎ, শিক্ষার পরিবেশ এবং সমাজের ভবিষ্যতের ওপর। যারা শিক্ষক সমাজকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে শেখেননি তারা পরিবার, সমাজ ও দেশকে কিভাবে ভাল আচরণ এবং গুরুজনদের সম্মান করার পরিবেশ তৈরী করতে সচেষ্ট হবেন। ইতিহাস মনে রাখে তাঁদেরই, যারা জ্ঞানের আলো বহনকারীদের মর্যাদা দিয়েছেন আর যারা সেই আলো নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাদের নয়।

তাই আজ প্রশ্ন, শিক্ষক বা শিক্ষক সমাজকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে না পারলে কিসের মানুষ আমরা? রাজনীতি বা যে কোন নেতা বা নেতৃত্বের প্রথম শর্তই হচ্ছে সম্মান দিতে শেখা। যা আজ আমাদের সমাজে দেখা খুবই বিরল। শিক্ষককে সম্মান করা মানে কেবল একজন আলোকিত মানুষকে সম্মান করা নয়, জ্ঞান, শিক্ষা এবং সভ্যতার ভিত্তিকেই সম্মান করা। সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তৈরী করে থাকেন শিক্ষক সমাজ। তাই মনে করা হয় শিক্ষকরাই জাতির মেরুদন্ড গঠন করে থাকেন। ইচ্ছে করলে অনেক শিক্ষক শিক্ষা বিস্তারে সততা, দক্ষতা, জ্ঞানের ভান্ডার, আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অনেক স্কুলকে স্বর্ণ শিখরে নিয়ে যেতে পারেন।

একজন ছাত্র-ছাত্রী বা শিক্ষার্থীর জীবনে যোগ্য শিক্ষকের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ শিক্ষকই পারেন তার শিক্ষার্থীদের নিশ্চিতরুপে আদর্শগত ভাবে রুপান্তর করতে। একজন যথার্থ শিক্ষকই পারেন তার ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে যথাযথ মনন-মেধা বৃদ্ধি-চিন্তাকে বাস্তবরূপে প্রতিফলিত করতে এবং আগামী জীবন যাত্রায় প্রতিটি উপযুক্ত জীবিকা ও সৎনাগরিক তথা মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলাম লেখক।