ইরানে মার্কিন হামলার কারণে বিশ^ অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে জ¦ালানির দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানিতে দ্বিগুণ অর্থ খরচ করতে হয়েছে। তাতে এ খাতে মোট আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। জ্বালানির এ বড় অঙ্কের খরচের ধাক্কায় দেশের মোট আমদানি ব্যয় বেড়েছে সাত বিলিয়ন ডলারের বেশি।
তবে জ্বালানির দাম দ্বিগুণের বেশি পরিশোধ করার পরও দেশের ডলারের বাজার সিংহভাগ সময় স্থিতিশীল ছিল। মূলত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের মন্দাভাব, ভোগ্যপণ্য আমদানি, শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাড়তি চাপ তৈরি হয় নি। ফলে ডলারের বাজার স্থিতিশীল ছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। আয়-ব্যয়ের সমন্বয়ের কারণে অর্থনীতিতে তেমন কোন বাড়তি চাপ পড়েনি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট আমদানি খরচ হয়েছে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খরচ ছিল ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আমদানি খরচ বেড়েছে ৬ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার বা ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। মোট আমদানি খরচের মধ্যে বিদায়ী অর্থবছরে অপরিশোধিত জ্বালানি, পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতে খরচ হয় ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার, আগের অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের ১২ মাসের মধ্যে আগস্ট, অক্টোবর ও নভেম্বর এ ৩ মাস আমদানি কমলেও বাকি ৯ মাস আমদানিতে খরচ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জ্বালানি আমদানিতে খরচ হয়েছিল ৫২ কোটি ডলার, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩ কোটি ডলারে। গত জানুয়ারিতে জ্বালানি খাতে আমদানি খরচ ছিল ৭০ কোটি ডলার, গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ডলার। গত এপ্রিলে জ্বালানি আমদানিতে খরচ হয় ১৩৪ কোটি ডলার, গত বছরের একই সময়ে এই খরচ ছিল ৩৫ কোটি ডলার। গত জুনে এই খাতে খরচ হয় ১৬০ কোটি ডলার, গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২৬ কোটি ডলার।
জ্বালানি আমদানিতে খরচের চাপ বাড়লেও প্রবাসী আয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং বিদেশি ঋণ ছাড়ের কারণে রিজার্ভ ও ডলারের দামে বাড়তি খরচের তেমন প্রভাব পড়ে নি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে। সর্বশেষ ২০ আগস্ট রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম হিসাবের বাইরে সাধারণ হিসাবে মোট রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা বেশি, ৩৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে গত অর্থবছরে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছিল ৮৩২ কোটি ডলারের। আর অর্থবছরে ঋণছাড় হয়েছে ৮০৭ কোটি ডলার। ঋণ ছাড়ের শীর্ষে ছিল বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি দিয়েছে ২০৭ কোটি ডলার। এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ১৯১ কোটি ডলার ছাড় করে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। তৃতীয় স্থানে থাকা রাশিয়া দিয়েছে ১০৫ কোটি ডলার। পাশাপাশি বিদায়ী অর্থবছরের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার, যা এ যাবৎকালের রেকর্ড।
মূলত, ইরান-মার্কিন সংঘাতের কারণেই বৈশি^ক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বেড়েছে জ¦ালানির দাম। এমতাবস্থায় বৈশি^ক জীবনযাত্রায় পড়েছে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব। সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে জ¦ালানি আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে আশার কথা হলো বিদায়ী অর্থবছরে আমদানি খরচের চেয়ে প্রবাসী আয় এবং রপ্তানির বিপরীতে বেশি ডলার দেশে এসেছে। সঙ্গত কারণেই জ¦ালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে খুব একটা চাপ সৃষ্টি হয়নি।
তবে মার্কিন-ইরান যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিতে এ স্থিতাবস্থা অব্যাহত রাখা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। তাই আগামী দিনের কথা বিবেচনায় সরকারকে রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয় সমন্বয়পূর্বক দীর্ঘ মেয়াদি ও যুৎসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আনতে হবে বৈদেশিক বাণিজ্যে গতিশীলতা। এক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। তাহলেই আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সহজ হবে; স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে অর্থনীতিতে।