রুগ্ন ও অকার্যকর বা বন্ধ হয়ে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যায়ক্রমে উৎপাদন কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইনভেস্ট বাংলাদেশ একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালার ওপর অংশীজনদের মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত প্রপ্তির পর তার ভিত্তিতে চূড়ান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রুগ্ন, বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে পুনরায় চালু করা হবে? এগুলো কী রাষ্ট্রের মালিকানাধীন রেখে অথবা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনাশীপের (পিপিপি) মাধ্যমে সচল করার উদ্যোগ নেয়া হবে; নাকি সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে চালু করার উদ্যোগ নেয়া হবে? রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেখে অথবা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রািতষ্ঠানগুলো সচল করার উদ্যোগ নেয়া হলে তা সফল হবার সম্ভাবনা খুবই কম। মুক্তবাজার অর্থনীতির সূত্র মোতাবেক, সরকারের সরাসরি কোন উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত ছিলেন তাদের মধ্যে একটি বড় অংশই দুর্নীতিগ্রস্ত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন লোকসান দেয়া অথবা প্রত্যাশিত মাত্রায় মুনাফা অর্জন করতে না পারার পেছেনে এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরাট দায় রয়েছে। কাজেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যারা কর্মরত ছিলেন অথব আছেন যাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সচল করার উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বাধ্য।

সরকার যদি সত্যি সত্যিই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রুগ্ন, বন্ধ অথবা পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না এমন শিল্প-কারখানাগুলো লাভজনকভাবে পরিচালনা করতে চায় তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে সরাসরি নিলামের মাধ্যমে প্রাইভেট সেক্টরের উদ্যোক্তাদের নিকট হস্তান্তর করতে পারেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৫ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১ হাজার ৭৬টি শিল্প-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৮১টি বড় শিল্প-কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ৮১টি প্রকল্প ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৩ হাজার কোটি টাকার মতো অর্থ জমা হয়েছে। অনেক সময় আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় সমর্থকদের নিকট নামমাত্র এসব প্রতিষ্ঠান বিক্রি করা হয়েছে।

বর্তমানে যেসব রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বন্ধ, রুগ্ন অথবা উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না এমন প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করতে হলে সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি নিলামের মাধ্যমে ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেয়া। এজন্য সরকারের তেমন বিশেষ কোন নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন নেই। শুধুু স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার এসব প্রকল্প বিক্রি কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় সমর্থক, অথবা আত্মীয়-স্বজনদের নিকট যাতে নামমাত্র মূল্যে এসব প্রতিষ্ঠান বিক্রি করা না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। ইতিপূর্বে যেসব প্রতিষ্ঠান নিলামের মাধ্যমে ব্যক্তিখাতে হস্তান্তর করা হয়েছে তার বেশির ভাগই লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে যে ৪৪টি শিল্প-কারখানাকে উৎপাদনক্ষম করে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাদের আওতাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার একর। এসব শিল্প-কারখানা ব্যক্তি খাতে হস্তান্তর করা হলে নতুন উদ্যোক্তা শিল্প স্থাপনের উপযোগী জমি পাবেন। একই সঙ্গে কারখানা শেড এবং ভবন পাবেন। যেসব মেশিনারিজ এসব কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে তার বেশিরভাগই সেকেলে ধরনের এবং বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম নয়। উদ্যোক্তাদের এসব মেশিনারিজ পরিবর্তন অথবা আধুনিকায়ন করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তা কারখানা চালুর জন্য যে ধরনের লোকবল প্রয়োজন তা তারা নিজস্ব উদ্যোগে সংগ্রহ করবেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকা অবস্থায় যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন তাদের মধ্য থেকে সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের নতুন উদ্যোক্তা নিয়োগ দিতে পারেন। পুরনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি অব্যাহত রাখতে হবে এমন কোন শর্ত দেয়া কোনভাবেই সঙ্গত হবে না।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রুগ্ন, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা গ্রহণের আগে ভাবতে হবে কিভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক করতে পারে। রাষ্ট্র এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোকসান দিচ্ছে তা বন্ধ করা যায়। তাই দেশের রুগ্ন শিল্প চালু করতে হলে নিতে হবে জরুরি ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।