চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর আজ দু’বছর কেটে গেল। কিন্তু জুলাইয়ের রক্তমাখা দগদগে স্মৃতি এখনও মানসপটে জীবন্ত হয়ে আছে। জুলাইয়ের স্মৃতির কথা বলতে গেলে প্রথমে মনে পড়ে রংপুরের শহিদ আবু সাঈদেও বুক পেতে দেয়া প্রসারিত দুটি বাহুর অভূতপূর্ব দৃশ্য। উদ্যত পুলিশের তাক করা মরণঘাতি বুলেটের সামনে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদ অর্ধ শতক ধরে চলা অন্যায় ও বৈষম্যেও বিপক্ষে মুক্তির লড়াইয়ের জানান দিয়েছিল। সে ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করেনি এদেশেরই পুলিশ তার প্রতিবাদের ভাষাকে বুলেটের আঘাতে ঝাঝরা করে দেবে। কিন্তু পুলিশ সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক এই বীর সেনানীর সাথে নরঘাতকের মতো আচরণ করল। সাঈদের বুকে নির্দ্বিধায় হানল বুলেটের পর বুলেটের আঘাত। সাহসী বীর আবু সাঈদ তৎক্ষণাৎ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। কয়েকজন দুঃসাহসী সংবাদকর্মী তাকে নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দ্রুত ছুটে গেল। কিন্তু ততক্ষণে নিথর হয়ে পড়ল আবু সাঈদের দেহ। এই অকুতভয় সৈনিক শাহাদতের অমীয় পেয়ালা পান করে পাড়ি জমাল জান্নাতের পথে। এদিন শুধু আবু সাঈদই শহিদ হলো না, চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরামসহ শহিদ হলো মোট ছয় জন। তাছাড়া সারাদেশে পুলিশ ও সরকারের গুণ্ডা বাহিনীর আক্রমণে আহত হলো আরো দুই শতাধিক ছাত্র-জনতা। আবু সাঈদের শাহাদাতের রক্তলাল ঘটনার খবর মুহূর্তেই সারা দেশে ছড়িয়ে দিল ইস্পাত কঠিন বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ।
ফলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা, মসজিদ ও দোকানপাট ও কল-কারখানা ও অফিসের কাজ ফেলে ছাত্র-জনতা, শ্রমিক, মজুর দুর্নিবার হুংকার ও সেøাগান দিয়ে নেমে পড়ল রাজপথে। কেঁপে উঠল বাংলাদেশ। পুলিশ, বিজিবি ও সামরিক বাহিনীর যৌথ প্রতিরোধ ভেঙে স্বৈরশাসনের জাঁতাকল থেকে মুক্তির জন্য পাগলপারা মানুষের স্রোত ছড়িয়ে পড়ল পাড়া-মহল্লা, গ্রাম, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহরের অলিতে-গলিতে। তাই জুলুমবাজ সরকার ও তার দলীয় গুণ্ডা বাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কট্টর দালালরা বেপরোয়া হয়ে উঠল। এর ফলে পরের দিনগুলো হয়ে উঠল অগ্নিগর্ভ। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সরকার দলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরস্ত্র মানুষের ওপর। জালিম সরকার, দলীয় গুন্ডা-পাণ্ডা ও নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের এ বর্বরোচিত দৃশ্য একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ও এ দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেনি। বিদেশী ষড়যন্ত্র এবং ক্ষমতার সীমাহীন লালসায় উম্মত্ত স্বৈরসরকার অকাতরে গুলি ও গুমের তাণ্ডব চালিয়ে ছাত্র-জনতার উত্তাল জনস্রোতকে ধাবিয়ে রাখার শত চেষ্টা করল। ফলে বাসা-বাড়ি, মাঠ-ঘাট ও রাজপথসহ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র লাশের পর লাশ পড়তে লাগল। তারপরও থামল না সেই দ্রোহ, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আগুন।
সরকার যতটা কঠিন হওয়ার চেষ্টা করল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ ততটাই তীব্র থেকে তীব্রতর হলো। সকল প্রকার নিপীড়ন, জুলুম, অপহরণ ও খুনের তাণ্ডবের মুখে দাঁড়িয়েও মানুষ সামনের দিকে এগিয়ে গেল। লাশের পর লাশ পড়ল। রাজপথ রঞ্জিত হলো। এসব লাশের সারি পেছনে ফেলে ভয়হীন ছাত্র-জনতা দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলল। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার কারফিউ জারি করল। পুলিশ, বিজিবি ও সেনা সদস্যরা ঘরে ঘরে ও ছাত্রাবাসে তল্লাশি চালিয়ে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও নিরীহ ছাত্রদের বন্দী করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করল। কিন্তু মানুষের বাধভাঙা জোয়ার তারা কিছুতেই ঠেকাতে পারল না। ইতোমেধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গতিপথ দ্রুত পাল্টে গেল এবং সরকার পতনের এক দফা দাবি ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠল। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কাচের ঘরে বসে স্বৈরাচারী প্রধানম›ন্ত্রী ও তার দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীরা রাজপথের উত্তাপের সঠিক চিত্র বুঝে ওঠার আগেই সরকারের সকল দমন-পীড়ন ও হত্যা-খুনের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল।
১৬ জুলাইয়ের পর থেকে প্রতিদিন দেশের সর্বত্র নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের তাণ্ডবে নিহত ও আহত হতে থাকল শত শত মানুষ। পরিস্থিতি আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল জুলাইয়ের শেষের দিকে। দেশের এই অগ্নিগর্ভ অবস্থার মধ্যে জুলাই যোদ্ধাদের শীর্ষ নেতাদের আটক করা হলো এবং ডিবি অফিসে নিয়ে তাদের ওপর পৈচাশিক নির্যাতনও সমঝোতার নাটক সাজানো হলো। এ দৃশ্য দেখে দেশের মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও দ্রোহের আগুন আরেকবার স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমসহ ছয় জন সমন্বয়ককে অবশেষে ১ আগস্ট ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এ ঘটনার পর সরকার বিরোধী ক্ষোভ ও বিক্ষোভ আরো তীব্রতা লাভ করে। সাথে সাথে সরকারের দমন পীড়নও ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। স্বৈরাচারের প্রধান শেখ হাসিনা অল আউট যুদ্ধ ঘোষণা করল প্রতিবাদী জনগণের বিরুদ্ধে।
তখন সাবেক সামরিক বাহিনীর সিনিয়র ব্যক্তিবর্গ, সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করীম ভুইয়াসহ অনেকে চলমান আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। ওদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর বড় একটি অংশ এবং সামরিক বাহিনীর অনেক সদস্য নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর সরকারের অমানবিক আচরণ, হত্যা ও খুনের তাণ্ডবকে সায় না দিতে অনীহা প্রকাশ করতে শুরু করে। এমনকি কোথাও কোথাও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছাত্রদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে তাদেরকে সাহস জোগায়। তখন ছাত্রদের অনেকেই সামরিক বাহিনীর ট্যাঙ্কের ওপর ওঠে আনন্দ উল্লাস করতেও দেখা যায়। এভাবে সার্বিক পরিস্থিতি আন্দোলনকারীদের পক্ষে এবং সরকারের বিপক্ষে চলে যেতে থাকে।
এদিকে চব্বিশের ৩ আগস্ট আসল এক কঠিন ঘোষণা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারীগণ সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে। ফলে সরকারের শীর্ষমহল দিশেহারা হয়ে পড়ে। এ সময় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাতে লাগল সরকার। কিন্তু ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ এতটাই তীব্র ও সর্বব্যাপী ছিল যে, তা সামাল দেয়ার সক্ষমতা সরকারের হাতছাড়া হয়ে গেল। এদিকে সরকার পতনের এক দফা দাবির পক্ষে প্রথমে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতির তীব্রতা ও গভীরতা বুঝতে পেরে সেটি এগিয়ে ৫ তারিখ করা হয়। গোটা দেশজুড়ে চলতে থাকে থমথমে অবস্থা। আন্দোলন দমনের লক্ষে সরকার আরো আগ্রাসী রূপ ধারন করে। এরই মধ্যে কয়েক শ মানুষের লাশের ভারে বাংলার জমিন রক্তলাল হয়ে উঠে।
৫ আগস্ট ছিল আসন্ন বিপ্লবের এক ক্রান্তিকাল। সরকারের অন্দর মহলে তখন ভীতিকর পরিবেশ। মিটিংয়ের পর মিটিং চলছে গণভবনে। সেনাসদরও পুলিশ সদরের বড় কর্তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে গলদঘর্ম ব্যস্ততায় ডুবে আছে। কারো চোখে ঘুম নেই। ঢাকার অলিতে-গলিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। বাংলাদেশ আসন্ন এক ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায়। ঢাকা ঘেরাও করার ব্যপক আয়েজন চলছে চারদিকে। সকাল দশটার আগে দেশজুড়ে চরম নিস্তদ্ধ পরিবেশ বিরাজমান লক্ষ করা গেল। সর্বত্র একই আলোচনা-কোথায় যাচ্ছে দেশ।
আমি সেদিন আর ঘর থেকে বের হলাম না। তখন আমি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে এডিশনাল ম্যানেজিং ডাইরেক্টও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। মতিঝিলে অফিস। শহরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে ছাত্র-জনতার যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছিল, তা অতিক্রম করে অফিসে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাই এক অস্থির মন নিয়ে বাসায় অপেক্ষা করতে লাগলাম। টিভিতে চোখ রাখছি, একটু পর পর সোস্যাল মিডিয়া ঘাটছি। বাইরের আসল পরিস্থিতি আন্দাজ করা সম্ভব ছিল না। তাই আমি আমার পিএস কামালকে ফোন করলাম। সে থাকে রামপুরা বনশ্রী এলাকায়। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট রামপুরা, বনশ্রী, আফতাবনগর, ব্রাক ও ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ এই পুরো এলাকা। পুরো জুলাই মাসে অনেক মানুষের রক্ত ঝরেছে এই এলাকায়। ফোনে এই এলাকার অবস্থা জানার চেষ্টা করলাম। কামাল জানাল রাস্তায় কোনো মানুষজন নেই। তবে বনশ্রীর গলিগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়ছে। তখন খানিকটা হতাশ হলাম। তাহলে আন্দোলনের কর্মসূচি কী ফ্লপ করবে!
আধা ঘণ্টা পর প্রায় এগারোটায় আবার তাকে ফোন করি। তখন সে জানাল বনশ্রীর যে রাস্তা রামপুরা টিভির মেইন রোডে এসে মিশেছে সেখানে ১৪৪ ধারা ভেঙে জড়ো হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। তখন একটু স্বস্তিবোধ করলাম। একই সময় উত্তরায় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক শাখার গার্ডকে ফোন করি। সে উচ্চ¦সিত হয়ে জানাল সেখানেও রাস্তায় জড়ো হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। ঢাকা শহরের অন্য প্রবেশ পথ যাত্রাবাড়ি, মীরপুরের গাবতলী, আমিনবাজার এলাকার খবর নিয়েও একই অবস্থা জানতে পারলাম। সেখানেও লাখ লাখ মানুষ জমায়েত হয়েছে। সব জায়গায় পুলিশ, অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের সাথে চলছিল ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এ সময় মানুষের লাশ পড়ার খবরও জানতে পারলাম। সবার উদ্দেশ্য একটাই। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-গণভবন ঘেরাও।
ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর অন্দরে চলছিল এক অন্য আয়োজন। সেনারা আর জনগণের ওপর নিপীড়ন চালাতে রাজি নয়। সিদ্ধান্ত পাকা হলো শেখ হাসিনার পদত্যাগের। ঢাকার প্রতিটি রাজপথ কাঁপিয়ে লাখ লাখ মানুষের মিছিল এগিয়ে আসছে দ্রুত। সবার মুখে সেøাগান আর সেøাগান। ছাত্র-জনতার এই স্রোতকে দমানোর সাধ্য কারো নেই। সামনে মাত্র ঘণ্টা খানেক সময় বাকি। সরকারের বাঁচার সব পথ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতি শেখ হাসিনাকে জানানো হলো। তাই তার পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিশ্চিত করা হলো। এদিকে সেনাসদরের খবর ও সরকার পতনের বার্তা বিভিন্ন স্থানে দায়িত্বরত পুলিশ, বিজিবি ও দলীয় ক্যাডারদের কাছে জানা ছিল না। তাই ঢাকার প্রবেশ মুখগুলোতে অগ্রসরমান জনতার ওপর তারা নির্বিচার গুলি চালানো অব্যাহত রাখল। ফলে লাশের পর লাশ পড়ল সারা দেশে। এদিন পুলশি ও সরকার দলীয় বাহিনীর গুলিতে যাত্রাবাড়িতেই শহিদ হয় ৫২ জন সাধারণ নাগরিক। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকায় শহিদ হয় ৪৬ জন। উত্তরা এলাকায় শহিদ হয় ১০ জন। চানখারপুল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শাহাদাত বরণ করে ৭ জন। রামপুরা এলাকায় শহিদ হয় ৩২ জন। সেদিন সব মিলেসারা দেশে শাহাদাতবরণ করে অগণিত ছাত্র, যুবা, বৃদ্ধ, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে পলায়নের জন্য প্রথমে হেলিকপ্টারযোগে পুরাতন বিমানবন্দর পৌঁছে যায়। সেখানে প্রস্তুত বিমানযোগে পতিত প্রধানমন্ত্রী ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা করে। তখন ঘড়ির কাটায় বিকেল প্রায় আড়াইটা। খুনি ও স্বৈরাচার হাসিনার পলায়নের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সারাদেশের মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ে। এরই মধ্যে গণভবনের ফটক ভেঙে লাখ মানুষ ভেতরে ঢুকে পড়ে।
তখন গগণবিদারী সেøাগান ও বিজয়ের উল্লাসে গণভবন এলাকা কেঁপে ওঠে। এভাবে পনোরো বছরের স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়। বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস দ্বিতীয় স্বাধীনতার উল্লাসে কম্পিত হলো।
জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে দেশে গঠিত হলো একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে এবং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সমর্থনে ৮ আগস্ট নতুন সরকার কাজ শুরু করে। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর মানুষের আশা ছিল দেশে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে শোষণ, জুলুম, নিপীড়নের লেশ থাকবে না। পুরোনো ও জরাজীর্ণ সংবিধান সংস্কার করে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠিত হবে, যাতে মানুষ ভয়হীন ও সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে, সকল ধরনের বৈষম্য দূর হবে, ঘুষ, দুর্নীতি ও শোষণের অবসান ঘটবে। সকল দল ও মতের ভিত্তিতে একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি হবে, যাতে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে মর্যাদাশীল ও স্বাবলম্বী দেশের গৌরব নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এই প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় সব দল মিলে তৈরি হয়েছিল জুলাই সনদ। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এই সনদ বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার নিয়েই ছাব্বিশের ১২ ফ্রেব্রুযারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই সংস্কার বাস্তবায়নের প্রত্যাশার ভিত্তিতে একই সময় গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ভোট প্রদান করে। ফলে জুলাই যোদ্ধা, হাজার হাজার আহত মানুষ ও শহিদ পরিবারসহ সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করতে থাকে।
পরিতাপের বিষয় হলো, নির্বাচিত সরকারের প্রায় ছয় মাস কেটে গেলেও গণভোটের বায় বাস্তবায়ন করার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে সারাদেশে ক্ষোভ ও বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। সংসদে বিরোধী দল ও এগারো দলীয় ঐক্য সংসদে এবং রাজপথে তীব্র প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের ছয় মাসের মাথায় মাঠের রাজনীতি ক্রমান্বয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পতিত আওয়ামী স্বৈরাচারী পলাতক দলের নেতা-নেত্রীর দেশকে অস্থিতিশীল করার ঘন ঘন হুঙ্কার। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় একটি বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গঠনের প্রত্যাশা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে মানুষ মনে করছেন। জুলাই-আগস্টে প্রায় চৌদ্দশ’ মানুষের প্রাণ বিসর্জন এবং প্রায় তিরিশ হাজার মানুষের অঙ্গহানির প্রত্যাশা এখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে আজ অনেকেই ধারণা করছেন, জুলাইয়ে প্রত্যাশা আবারো পুরোনো রাজনীতির অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। সরকারের বিভিন্ন নেতা ও মন্ত্রীদের কথাবার্তায় এ রকম একটা আশঙ্কা দেশের সর্বত্র মানুষের মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে। তবে সংস্কারের পক্ষে প্রদত্ত ব্যাপক মানুষের রায়কে অবজ্ঞা করে সরকার যে কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে বলে অনুমান করা হচ্ছে, তা সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন।
একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সরকার জুলাইকে দাবিয়ে রাখতে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর হতাশা।
বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে টিকে থাকার ব্যাপারে ইতোমধ্যেই প্রচণ্ড ক্ষোভ জনমনে তৈরি হয়েছে। এই ক্ষোভ ও বিক্ষোভ নিরসনে সরকার কতটা যত্নবান হবেন-তা এখন দেখার বিষয়।