তামান্না ইসলাম

শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

২০২৬ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলো। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আন্দোলন রূপ নেয় বৈষম্য, দমন-পীড়ন, অন্যায় ও জবাবদিহিহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সর্বজনীন গণ-আন্দোলনে। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায় অভিভাবক, শ্রমিক, রিকশাচালক, শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ীসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট সারা দেশ থেকে মানুষের ঢাকামুখী যাত্রা- ”লংমার্চ টু ঢাকা” একটি নতুন ইতিহাসের জন্ম দেয়।

এই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ। সরকারি গেজেটে এখন পর্যন্ত ৮৩৪ জনকে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে হাজারো মানুষ এখনও চিকিৎসা নিচ্ছেন, এবং সরকারিভাবে হাজার হাজার আহত ব্যক্তির তালিকা ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২৪ সালের সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করেছিল। বিভিন্ন সংস্থার হিসাব ভিন্ন হলেও একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই- এই পরিবর্তনের জন্য অসংখ্য মানুষ জীবন, চোখ, হাত কিংবা পা হারিয়েছেন।

জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয় সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। শুরুতে এটি ছিল শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ, হামলা, গ্রেপ্তার, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট একসময় এগুলো যেন প্রতিদিনের সংবাদ হয়ে দাঁড়ায়। ১৬ জুলাই রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা সারা দেশে গভীর নাড়া দেয়। একজন নিরস্ত্র শিক্ষার্থীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক ছিল না; সেটি হাজারো তরুণের ক্ষোভকে আরও বিস্ফোরিত করে তোলে। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা বাড়তে থাকে। অনেক মানুষ প্রাণ হারান, অসংখ্য মানুষ আহত হন। হাসপাতালগুলোতে রক্তের প্রয়োজন হয়, আর সেই রক্ত দিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন সাধারণ মানুষই।

সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কারফিউ জারি করে। কয়েক দফায় মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তথ্যপ্রবাহ সীমিত হয়ে পড়ে। মানুষ একে অপরের খবর জানতে ছুটে বেড়ায়। অনেক অভিভাবক জানতেন না তাঁদের সন্তান কোথায়। কেউ ফোনে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খবর পাচ্ছিলেন না। অনিশ্চয়তা তখন পুরো দেশকে ঘিরে ফেলেছিল।

এরপর আসে ৫ আগস্ট। সেদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ঢাকার দিকে রওনা হয়। কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ আবার দীর্ঘ পথ হেঁটে। অনেকের হাতে ছিল শুধু জাতীয় পতাকা। কারও চোখে ছিল ভয়, কিন্তু সেই ভয়ের চেয়ে বড় ছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

“লংমার্চ টু ঢাকা” শুধু একটি কর্মসূচি ছিল না, এটি মানুষের সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে। লাখো মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং পরিবর্তনের দাবির মুখে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন ঘটে। সেই দিনের দৃশ্য এখনো অনেকের স্মৃতিতে স্পষ্টমানুষ একে অপরকে পানি খাইয়ে দিচ্ছে, আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছে, অপরিচিত মানুষও একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছে। যেন পুরো দেশ একটি পরিবারের মতো হয়ে উঠেছিল।

দুই বছর পর দাঁড়িয়ে সেই স্মৃতিগুলো অনেকের কাছে এখনো জীবন্ত। একজন রিকশাচালক বলেছিলেন, “আমি রাজনীতি বুঝি না। কিন্তু আমার ছেলে যেন ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে, সেই আশাতেই সেদিন রাস্তায় নেমেছিলাম।” একজন মায়ের চোখে আজও জল আসে ছেলের কথা বলতে গিয়ে। তিনি বলেন, “ছেলেকে আর ফিরে পাইনি, কিন্তু চাই না আর কোনো মা এভাবে সন্তান হারাক।”

এই স্মৃতিগুলো শুধু আবেগ নয়, এগুলো জাতির ইতিহাসের অংশ।

বিপ্লবের পর মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রের সংস্কার। গত দুই বছরে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং বেশ কিছু সুপারিশও প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর করার আলোচনা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শক্তিশালী করার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের জবাবদিহি বাড়ানো এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার কথাও বারবার উঠে এসেছে।

তবে বাস্তবতা হলো, কমিশন গঠন করা সহজ হলেও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। অনেক সুপারিশ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে মানুষের প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে একটি দূরত্ব এখনো রয়ে গেছে।

মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের অনেকটা চোখে পড়ে। আগের তুলনায় সমালোচনা প্রকাশের সুযোগ কিছুটা বেড়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মনে করেন। গণমাধ্যমের পরিবেশ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, ডিজিটাল পরিসরে মত প্রকাশ এবং আইনের প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগও পুরোপুরি দূর হয়নি। অর্থাৎ পরিবর্তনের পথ শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই পথ এখনো শেষ হয়নি।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, অর্থ পাচার রোধ, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি এখনো দৈনন্দিন জীবন।

বাজারে গিয়ে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়, তাহলে বড় বড় অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি তাদের কাছে খুব বেশি অর্থ বহন করে না।

গত দুই বছরে অর্থনীতি নিয়ে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেলেও দ্রব্যমূল্যের চাপ পুরোপুরি কমেনি। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি কিংবা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে। সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে প্রতিদিনই আয়-ব্যয়ের নতুন হিসাব করতে হয়। তাই অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রকৃত সাফল্য তখনই দৃশ্যমান হবে, যখন সাধারণ মানুষ স্বস্তির সঙ্গে সংসার চালাতে পারবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় তাদের নাগালের মধ্যে আসবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিচারবহির্ভূত সহিংসতা বন্ধ করা, অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে আরও জনবান্ধব করে তোলার প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে। মানুষের আস্থা ফিরে পেতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

এই আন্দোলনে তরুণদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। তারা প্রমাণ করেছে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের ভাবনা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়, প্রয়োজন হলে তারা মাঠেও নামতে পারে। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিল, যেখানে পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতার মূল্য বেশি হবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়বিচার বড় হবে এবং যেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে ভয় দেখাবে না, বরং সেবা দেবে।

সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিতেও এই গণ-অভ্যুত্থানের প্রভাব স্পষ্ট। মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি প্রশ্ন করতে শিখেছে। তরুণদের মধ্যে নাগরিক অধিকার নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে।

স্বৈরাচার একদিনে জন্ম নেয় নি। মানুষের নীরবতা, প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাব ধীরে ধীরে তার পথ তৈরি হয়েছিল । তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখতে হলে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, শক্তিশালী নির্বাচন ব্যবস্থা, পেশাদার প্রশাসন, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক সমাজ সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

“লংমার্চ টু ফ্রিডম” এটি একটি চলমান অঙ্গীকার ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার অঙ্গীকার এবং এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার, যেখানে কোনো নাগরিককে নিজের অধিকার চাওয়ার জন্য জীবন দিতে না হয়।

বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আহতদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতি একটি আহ্বান- মতভেদ থাকুক, কিন্তু গণতন্ত্রের পথ থেকে যেন কেউ সরে না যায়।

কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাস অটুট থাকলেই “লংমার্চ টু ফ্রিডম”-এর চেতনা একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।