সরদার ফরিদ আহমদ

সাবেক সাধারণ সম্পাদক

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। একটি দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সমাজে নতুন বাস্তবতার জন্ম হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো গণঅভ্যুত্থানের লড়াই শুধু রাজপথে শেষ হয় না। ক্ষমতার পালাবদলের পর শুরু হয় আরেকটি লড়াই। সেটি বয়ানের লড়াই। স্মৃতির লড়াই। বৈধতার লড়াই। বাংলাদেশেও এখন সেই লড়াই চলছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সরাসরি বিরোধিতা করার মতো রাজনৈতিক বা নৈতিক অবস্থান আজ খুব কম মানুষের আছে। কারণ এই আন্দোলনের পক্ষে ছিল সাধারণ মানুষ। এর পেছনে ছিল অসংখ্য প্রাণের আত্মত্যাগ। ছিল গুম, খুন, নির্যাতন ও ভোটাধিকারহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘ ক্ষোভ। ফলে এই গণঅভ্যুত্থানকে সরাসরি অস্বীকার করা সহজ নয়।

কিন্তু তাকে বিতর্কিত করা অসম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেই চেষ্টাই দৃশ্যমান বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ধারণা। বিশেষ করে লন্ডনে তারেক রহমান ও প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকের পর এই বিতর্ক নতুন গতি পায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তা আরও তীব্র হয়েছে বলেও অনেকের পর্যবেক্ষণ। এই সমালোচনার প্রধান লক্ষ্য কারা?

প্রধানত তিনটি শক্তি। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। প্রশ্ন হলো, কারা এই সমালোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছেন? কেন এনেছেন? তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কী? তাদের অতীত কী বলে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠীকে আলাদাভাবে দেখতে হয়।

প্রথম গোষ্ঠীটি সেই সব ব্যক্তি, যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন শেখ হাসিনার শাসনামলে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির পক্ষে মতামত গঠনের অভিযোগ ছিল। তারা কখনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান নেননি। বিতর্কিত নির্বাচন নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেননি। বরং ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার নানা সুবিধা ভোগ করেছেন। আজ তারাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

এখানেই রাজনৈতিক প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যারা অতীতে রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নীরব ছিলেন, তারা আজ হঠাৎ গণতন্ত্র, নৈতিকতা কিংবা রাজনৈতিক শুদ্ধতার প্রশ্ন তুলছেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য একরৈখিক নয়। তবে রাজনীতিতে অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বয়ান পরিবর্তনের ঘটনাও নতুন নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্নাহ আরেন্ট লিখেছিলেন, ক্ষমতা শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টিকে থাকে না; ক্ষমতা টিকে থাকে মানুষের সম্মতি এবং সেই সম্মতিকে বৈধতা দেওয়া বয়ানের ওপর। যখন সেই বয়ান ভেঙে পড়ে, তখন পুরোনো ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো নতুন ভাষা ও নতুন যুক্তি খুঁজতে শুরু করে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্ককে অনেকেই সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখেন।

দ্বিতীয় গোষ্ঠীটি আরও জটিল। এরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এর আগে অনেকেই বিদ্যমান ব্যবস্থার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অংশ ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের প্রত্যাশা ছিল, নতুন বাস্তবতায় তারাও আগের মতো প্রভাব ও সুযোগ ধরে রাখতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। সমালোচকদের মতে, সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় তাদের একাংশের ক্ষোভের লক্ষ্য হয়ে ওঠে এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী এবং প্রফেসর ইউনূস। ৫ আগস্টের পর এই গোষ্ঠীর কিছু সদস্যকে বিভিন্ন সময় বিএনপির কর্মসূচি বা আলোচনা সভাতেও দেখা গেছে। তবে তাদের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক সামনে আসার পর বিএনপির অনেক স্তরেই তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে-এমন পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

তবে এখানেই আরেকটি প্রশ্ন ওঠে। তারা কি বিএনপির হয়ে কথা বলছেন, নাকি বিএনপিকেই একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছেন? অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তাদের বক্তব্যের ধারাবাহিকতায়। কারণ দেখা যায়, তারা সরকারের সমালোচনা না করলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর উত্থান হওয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধেই সরব। এটি নিছক কাকতালীয়, নাকি একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল-তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে বিষয়টি এখন রাজনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।

ইতিহাস বলে, প্রতিটি বিপ্লবের পর পুরোনো ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত এবং নতুন ক্ষমতায় প্রত্যাশিত অবস্থান না পাওয়া গোষ্ঠীর একটি অংশ নতুন বাস্তবতার বিরুদ্ধে মতামত গঠনের চেষ্টা করে। বিখ্যাত মার্কিন ঐতিহাসিক, ফরাসি বিপ্লব এবং সামাজিক ইতিহাসের গবেষক ক্রেন ব্রিনটন তার বিপ্লববিষয়ক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে তীব্র সংঘাত অনেক সময় বিপ্লবের ঘোষিত শত্রুর সঙ্গে নয়; বরং নতুন ক্ষমতা বিন্যাসে নিজেদের অবস্থান হারানো গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তৈরি হয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও অনেকে সেই তুলনা টানছেন।

তৃতীয় গোষ্ঠীটি বাম ঘরানার একাংশ। এই গোষ্ঠীকে এক কাতারে ফেলা যাবে না। কারণ তাদের অবস্থানও এক নয়। এদের একটি অংশ প্রকৃত অর্থেই শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমালোচক ছিল। ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়েও তাদের আপত্তি ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাঠেও তাদের অনেককে সক্রিয় দেখা গেছে। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী এই ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায়। জুলাই বিপ্লবের পর বড় উত্থান ঘটে ইসলামপন্থী রাজনীতির। সংসদে জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্ররাজনীতিতেও ইসলাম পন্থীদের প্রভাব দৃশ্যমানভাবে বাড়ে।

এখানেই শুরু হয় বামদের নতুন অস্বস্তি।

সমালোচকদের মতে, এই গোষ্ঠীর অনেকের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মিল রেখেছে। তারা ভারতীয় রাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করলেও ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রভাবকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানকে তারা সব সময় সন্দেহের চোখে দেখেছেন। ফলে জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় তাদের সামনে একটি নতুন প্রশ্ন দাঁড়ায়।

যে পরিবর্তনের জন্য তারা আন্দোলন করেছিলেন, সেই পরিবর্তনের প্রধান রাজনৈতিক সুবিধাভোগী যদি তাদের প্রত্যাশিত শক্তি না হয়ে অন্য কেউ হয়, তাহলে তারা সেই বাস্তবতাকে কীভাবে গ্রহণ করবেন? অনেক বিশ্লেষকের মতে, এনসিপিকে ঘিরে তাদেরও একটি প্রত্যাশা ছিল। তারা ভেবেছিলেন, দলটি মধ্যপন্থী বা বামঘেঁষা একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এনসিপি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটে, তখন তাদের একাংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।

এই সমালোচনার রাজনৈতিক অধিকার অবশ্যই তাদের আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা অতীতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বহু বছর ছিল। তারা একসঙ্গে সরকারও পরিচালনা করেছে। সেই ইতিহাস নিয়ে এই সমালোচকদের অনেকেই আজ খুব বেশি কথা বলেন না। ফলে সমালোচনার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বাম রাজনীতির আরেকটি অংশের ইতিহাস আবার ভিন্ন। এরা ছাত্র ইউনিয়ন এবং সিপিবির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল বা আছে। তারা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিসরের ভেতর থেকেই রাজনীতি করেছেন। সংসদে সীমিত প্রতিনিধিত্ব পেয়েছেন। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি একেবারেই দুর্বল হয়েছে। ফলে তাদের সামনে এখন অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই বাস্তবতায় তাদের কেউ কেউ বিএনপির প্রতি ইতিবাচক অবস্থান নিচ্ছেন। বিএনপিকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। আবার একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও নিচ্ছেন। এরা সারাজীবনই পরজীবী রাজনীতি করেছে। এখন বিএনপির ওপর ভর করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশল নিয়েছে। রাজনীতিতে অবস্থান পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অবস্থান পরিবর্তনের ব্যাখ্যাও রাজনীতিরই অংশ। একসময় যারা তারেক রহমানের কঠোর সমালোচক ছিলেন, তাদের কারও কারও বক্তব্যে আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর শোনা যায়। এটিও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির একটি লক্ষণীয় বাস্তবতা।

আরেকটি গোষ্ঠীর কথা না বললেই নয়। এদের কারও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় আছে, আবার অনেকের নেই। কেউ একসময় জামায়াতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কেউ নিজেদের এনসিপির শুভানুধ্যায়ী বা পরামর্শক বলতেন। কিন্তু ক্ষমতার বাস্তবতা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থানও বদলে যায়। অনেকের ধারণা, নতুন ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ হলো নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্রমণ করা। এদের আদর্শ এখন রাশেদ খান। সেই কারণেই তারা এনসিপি, জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কঠোর ভাষায় অবস্থান নিচ্ছেন। এ ধরনের ব্যাখ্যা সঠিক কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনোই অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, নীতি নয়, সুযোগই অনেকের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করেছে। বিএনপির ভেতরেও একটি প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা জাতীয় প্রশ্নে সংযত ভাষায় কথা বললেও মধ্যম সারির বা নতুন কিছু নেতার বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। তাদের কেউ কেউ এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী এবং প্রফেসর ইউনূসের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করছেন। সমালোচকদের মতে, এদের অনেকেই প্রবলভাবে চাঁদাবাজ এবং দখলবাজির সঙ্গে জড়িত। এরা মনে করে তাদের অপকর্মের পথে প্রধান বাধা এনসিপি এবং জামায়াত ইসলামী। এরা জিয়াউর রহমানের রাজনীতি, খালেদা জিয়ার রাজনীতির ধারে কাছেও নেই। এরা দেশ কিংবা দলের রাজনীতি নিয়ে ভাবেওনা। এদের ধান্দা একটিই টাকা কামানো । তাদের এই পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাদেরকে তারা তীব্রভাবে আক্রমণ করবে এটাই স্বাভাবিক।

এবং তারা তাই করছে। এবং এটা করতে গিয়ে তারা রাজনীতির ভাষা বদলে দিচ্ছে। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ভুলে গেছো। মুখে যা আসছে তাই বলে যাচ্ছে।

একটি বিষয়িএখন স্পষ্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা ক্রমেই শালীনতা হারাচ্ছে। যুক্তির জায়গায় ব্যক্তিগত আক্রমণ আসছে। তথ্যের জায়গায় আসছে অনুমান। মতবিরোধের জায়গায় আসছে বিদ্বেষ। এটি কোনো গণতন্ত্রের জন্যই শুভ লক্ষণ নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীস্যামুয়েল পি হান্টিংটন লিখেছিলেন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে প্রতিযোগিতা প্রায়ই সংঘাতে রূপ নেয়। তখন মতাদর্শের চেয়ে ক্ষমতার প্রশ্নই বড় হয়ে দাঁড়ায়।

থিডা স্কচপোল একজন বিখ্যাত আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, বিপ্লব এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর গবেষণার জন্য পরিচিত। তিনি দেখিয়েছেন, কোনো বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; নতুন রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা। পুরোনো স্বার্থগোষ্ঠী এবং নতুন শক্তির দ্বন্দ্ব তখন দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। বাংলাদেশও সম্ভবত সেই পর্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তবে এই পুরো বিতর্কের মধ্যে একটি বিষয় যেন হারিয়ে না যায়। সেটি হলো জুলাইয়ের শহীদরা। যারা বুকের রক্ত দিয়ে এই পরিবর্তনের পথ খুলে দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগই এই নতুন বাস্তবতার ভিত্তি। বিপ্লবের ইতিহাস বলে, যে জাতি তার শহীদদের ভুলে যায়, সে জাতি ধীরে ধীরে তার বিপ্লবের নৈতিক শক্তিও হারিয়ে ফেলে।

শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যদি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, পদ-পদবীর প্রতিযোগিতা কিংবা ক্ষুদ্র রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই প্রধান হয়ে ওঠে, তাহলে বিপ্লবের চেতনাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষমতার পালাবদল তখন আর ইতিহাস সৃষ্টি করে না। শুধু নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দেয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়। এটি হাজারো মানুষের ত্যাগের ফসল। এ কারণেই এই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে মতবিরোধ থাকতে পারে। সমালোচনাও হতে পারে। হওয়া উচিত। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি সত্য অনুসন্ধানের বদলে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, ব্যক্তিগত হতাশা বা নতুন অবস্থান তৈরির কৌশলে পরিণত হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি। কারণ ইতিহাস একটি বিষয় কখনো ক্ষমা করে না।

যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে একটি জাতির বড় অর্জনকে খাটো করতে চায়, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের নয়, সেই অর্জনকেই টিকিয়ে রাখে।