ম্যাকাই টেস্টে প্রথম দিন রাজত্ব করেছে বোলাররা। সবমিলিয়ে প্রথম দিনেই ১৮ উইকেটের পতন হয়েছে। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে স্টার্কের আগুন বোলিংয়ে মাত্র ৬৪ রানে অল আউট হয় বাংলাদেশ। ১২ রানে ৬ উইকেট নেন স্টার্ক। জবাবে শরিফুলের তোপে ১৬৫ রান তুলতেই ৮ উইকেট হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ৩৫ রানে ৬ উইকেট শিকার করেন শরিফুল। প্রথম দিন শেষে ১০১ রানে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। পেসার মিচেল স্টার্কের ছয় উইকেট এবং ক্যামেরন গ্রিনের লড়াকু অর্ধশতকের সুবাদে দিনটি অস্ট্রেলিয়ার পক্ষেই গেছে।
ম্যাকাইর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় টস জিতে প্রথমে বাংলাদেশকে ব্যাট করতে পাঠায় অস্ট্রেলিয়া। ইনিংসের প্রথম বলে বাংলাদেশ ওপেনার সাদমান ইসলামকে গালিতে গ্রিনের ক্যাচে পরিণত করেন স্টার্ক। নিজের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম দুই বলে জোড়া উইকেট শিকার করেন স্টার্ক। রানের খাতা খোলার আগে স্লিপে বো ওয়েবস্টারকে ক্যাচ দেন বাংলাদেশের আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন তানজিদ। তানজিদের বিদায়ে ক্রিজে আসেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। প্রথম বলেই এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরের পথ ধরেন শান্ত। রিভিউ নিলেও আম্পায়ারস কলে আউট হন শান্ত। পরপর দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগান স্টার্ক। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিম সেটি হতে দেননি। নিজের তৃতীয় ওভারে চতুর্থ উইকেটের দেখা পান স্টার্ক। গালিতে গ্রিনকে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন মোমিনুল। ৯ রান করেন তিনি। এরপর চতুর্থ ওভারে ইনিংসে পঞ্চম উইকেট পূর্ণ করেন স্টার্ক। ছয় নম্বরে নামা লিটন দাসকে লেগ বিফোর ফাঁদে ফেলেন তিনি। এতে ১২ রানে ৫ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। মাত্র ২২ ডেলিভারিতে ৫ উইকেট নিয়েও নিজের রেকর্ড ভাঙতে পারেননি স্টার্ক। তার আগের রেকর্ডটি ১৫ বলে ৫ উইকেট। গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্রুত ফাইফার নিয়েছিলেন তিনি। স্টার্ক ঝড় সামাল দিয়ে উইকেট পতন ঠেকাতে সাবধানে খেলতে শুরু করেন মুশফিক ও মেহেদি হাসার মিরাজ। ৫০’র বেশি বল খেলে উইকেটে সেট হয়ে যান তারা। তবে ৫৪তম বলে এসে বিচ্ছিন্ন হন মুশফিক ও মিরাজ। ৪২ বলে ৫ রান করা মুশফিককে বোল্ড করেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। ২১ রানে ষষ্ঠ উইকেট পতনে টেস্ট সর্বনিম্ন ২৬ রানের লজ্জার বিশ্ব রেকর্ড গড়ার মুখে পড়ে বাংলাদেশ। সপ্তম উইকেটে ৫৫ বলে ১৫ রানের জুটিতে বাংলাদেশকে লজ্জার হাত থেকে রক্ষা করেন মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। দলীয় ৩৬ রানে মিরাজকে বোল্ড করে জুটি ভাঙ্গেন কামিন্স। ৫১ বলে ১১ রান করেন মিরাজ। এরপর হাসানকে ১০ রানে জশ হ্যাজেলউড এবং তাসকিন আহমেদকে ১ রানে আউট করেন কামিন্স। ৩৯ রানে নবম উইকেট হারিয়ে টেস্টে নিজেদের সর্বনিম্ন রানে গুটিয়ে যাবার শঙ্কায় পড়ে বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪৩ রানে অলআউট হয়েছিল টাইগাররা। দশম ও শেষ উইকেটে ৩৫ বলে ২৫ রানের জুটিতে বাংলাদেশকে লজ্জার হাত থেকে রক্ষা করেন তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলাম। ৩টি চারে ১৯ বলে ইনিংসে সর্বোচ্চ ১৪ রান করা শরিফুলকে শিকার করে বাংলাদেশকে ৬৪ রানে গুটিয়ে দেন স্টার্ক। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে এটিই সর্বনিম্ন রান বাংলাদেশের। ২ চারে ১১ রানে অপরাজিত থাকেন তাইজুল। ১০ ওভার বল করে ১২ রানে ৬ উইকেট নেন স্টার্ক। ১০৭ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে এই নিয়ে ১৯বার ইনিংসে ৫ বা ততোধিক উইকেট নিলেন স্টার্ক। এছাড়া কামিন্স ২৫ রানে ৩ উইকেট শিকার করেন। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করা ৪৩ রান। এরপর ২০২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৫৩ এবং ২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬২ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে উদ্বোধনী জুটিতে ২২ রানে প্রথম উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। ৮ রান করা ম্যাট রেনশকে শিকার করেন বাংলাদেশ পেসার তাসকিন। ৪টি চারে অস্ট্রেলিয়ার রানের চাকা সচল রেখেছিলেন আরেক ওপেনার ট্রাভিস হেড। ইনিংসের অষ্টম ওভারে প্রথমবারের মত আক্রমণে এসে জোড়া উইকেট শিকার করেন শরিফুল। ব্যক্তিগত ২২ রানে হেডকে বোল্ড করেন শরিফুল। একই ওভারে মার্নাস লাবুশেনকে ৪ রানে বোল্ড করেন শরিফুল। ৪১ রানে ৩ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। চতুর্থ উইকেটে ১১২ বলে ৭৭ রানের জুটিতে অস্ট্রেলিয়ার লিড ও দলীয় স্কোর ১শ পার করেন স্টিভেন স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন। এই জুটি ভাঙ্গতে পাঁচ বোলারকে ব্যবহারের পাশাপাশি আক্রমণাত্মক ফিল্ডিং সাজিয়েও উইকেটের দেখা পাননি বাংলাদেশ অধিনায়ক শান্ত। অবশেষে টাইগার দলনেতার মুখে হাসি ফোটান শরিফুল। ৬টি চারে ৪২ রান করা স্মিথকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন শরিফুল। দলের রান ১১৮তে রেখে সাজঘরে ফিরেন স্মিথ। এরপর ১৪৫ থেকে ১৪৮ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। ক্যারিকে ৫ রানে মিরাজ বিদায় দেওয়ার পর বিধ্বংসী রূপ দেখান শরিফুল। নিজের নবম ওভারে ২টি ও দশম ওভারে ১ উইকেট শিকার করেন তিনি। শরিফুলের বলে ওয়েবস্টার গোল্ডেন ডাক ও কামিন্স খালি হাতে আউট হন। ১ রান করে শরিফুলের বলে বোল্ড হন স্টার্ক। ১৪৮ রানে অষ্টম উইকেট পতনের পর দিনের বাকী ৪২ বল বিপদ ছাড়া পার করেন গ্রিন ও নাথান লায়ন। নবম উইকেটে ১৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দিন শেষ করেন তারা। গ্রিন ৮ চারে ৫১ এবং লায়ান ১০ রানে অপরাজিত থাকেন। শরিফুল ৩৫ রানে ৬ উইকেট শিকার করেন। ১৪ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে এটিই সেরা বোলিং শরিফুলের। এছাড়া তাসকিন ও মিরাজ ১টি করে উইকেট নেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৬৪/১০ (৩৪ ওভার)
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ৪০ ওভারে ১৬৫/৮ (হেড ২২, রেনশ ৮, লাবুশেন ৪, স্মিথ ৪২, গ্রিন ৫১*, কেয়ারি ৫, ওয়েবস্টার ০, কামিন্স ০, স্টার্ক ১, লায়ন ১০*; তাসকিন ১১-১-৪১-১, হাসান ১২-৩-৫৬-০, শরিফুল ১১-২-৩৫-৬, তাইজুল ৫-০-১৩-০, মিরাজ ১-০-৪-১)।