জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বৃদ্ধির পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সংস্থাটি ঘাটতি পূরণের যুক্তি দেখিয়ে বছরে দুইবার বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ১ জুন থেকেই নতুন দর কার্যকরের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

এদিকে বিতরণ কোম্পানিগুলোও গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এসব প্রস্তাবের ওপর বুধবার থেকে গণশুনানি করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে পিডিবি পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রায় ২১ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি বছরে দুইবার মূল্য সমন্বয়ের ক্ষমতাও চাওয়া হয়েছে। সংস্থাটি চায়, নতুন এই হার জুন মাস থেকেই কার্যকর করা হোক।

পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, ডলারের দাম বৃদ্ধি, পাশাপাশি তেল ও কয়লার মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিকল্প পথ সীমিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে বিতরণ সংস্থাগুলো তাদের প্রস্তাবে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলেছে। একই সঙ্গে পাইকারি দরের বাড়তি চাপ গ্রাহকের ওপর সমন্বয়ের আবেদনও করা হয়েছে। ডিমান্ড চার্জসহ বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত ফি বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম আগেই বেশি, আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। এমন অবস্থায় বিদ্যুতের খরচ বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও চাপ তৈরি করবে। তাদের মতে, এটি সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি মৌলিক প্রয়োজনের অংশ। তাই শুধু ভোক্তার ওপর চাপ না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতে অপচয়, সিস্টেম লস এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়, ভোক্তা কল্যাণ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সাশ্রয়ী উৎপাদনের পাশাপাশি অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সব ধরনের চাপ শুধু ভোক্তার ওপর না চাপানোর পরামর্শও তিনি দেন।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলমের মতে, বিদ্যুতের ব্যয় নির্ধারণে অযৌক্তিকতা রয়েছে। তার দাবি, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত খরচ ৮ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু বর্তমানে তা প্রায় ১২ টাকা দেখানো হচ্ছে। তিনি লুটপাটমূলক ব্যয় ও অতিরিক্ত মুনাফা কমিয়ে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের আহ্বান জানান।

বিইআরসি আগামী বুধবার ও বৃহস্পতিবার এই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি করবে। তবে নতুন করে দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আরও চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন ভোক্তারা। তাদের দাবি, দাম না বাড়িয়ে বরং বিদ্যুৎ খাতের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও অপচয় কমিয়ে ঘাটতি সমাধান করা হোক।