দেশে প্রায় চল্লিশ হাজার চিকিৎসক আছেন। নার্স রয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার। বলা হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবার মান বেড়েছে। হাসপাতালের বেড ৪০-৫০ হাজার থেকে বেড়ে ৭৫ হাজারের বেশি হয়েছে। এরপরও দেশের মানুষ বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাওয়ায় বছরে ৬০ হাজার কোটির বেশি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। নানা উদ্যোগ গ্রহণ করার পরও দেশী চিকিৎসায় মানুষের এক ধরণের অনিহা। এজন্য নানা জন নানা জনকে দায়ী করে থাকে। কিন্তু প্রকৃত স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার পরিবেশ স্বাধীনতার ৫৪ বছরের সৃষ্টি হলো না। মানুষের আস্থা ফিরাতে যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন তা নেওয়া হয়নি আজও।

আজ ৭ এপ্রিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। দিবসটি উদযাপনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসমূহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত প্রতিপাদ্যের আলোকে বাংলাদেশও এ বছর দিবসটি উদযাপন করবে। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছেÑ ‘স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’।

এমন এক সময় বাংলাদেশ স্বাস্থ্য দিবস পালন করছে; যখন সারাদেশে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে চিকিৎসার অভাবে। স্বাধীনতার এতো বছর পরও দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার খাতকে আস্থার জায়গায় আনতে পারেনি কোন সরকার। বরং স্বাস্থ্য খাতে হয়েছে চুরি আর হরিলুটের মহোৎসব। কেনাকাটার নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা শোনা গেছে বার বার। সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে এই খাত ধ্বংস হয়েছে বলে বলা হয়েছে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে। চিকিৎসকদের নৈতিক অধপতনের কারণে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু খবর পাওয়া যায় অহরহ। দেশের অলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে মানহীন স্বাস্থ্যসেবার কারখানা। এতে প্রতিনিয়ত রোগীরা প্রতারিত হয়ে বিদেশে চিকিৎসার পথ ধরছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বাণী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ শুরু করেছে। সেই লক্ষ্যে শহর ও গ্রামে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।

দেশব্যাপী ধাপে ধাপে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী বা হেলথ কেয়ারার নিয়োগ করা হবে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ হবেন নারী। এছাড়া প্রতিটি নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড, দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের দ্রুত ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ব্যবস্থা চালু করা, স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান উন্নয়ন ও চিকিৎসা ব্যয় সহনীয় রাখতে প্রয়োজনীয় সংস্কার, স্বাস্থ্যবিমা চালু ও ধীরে ধীরে বিস্তার, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণা জোরদার এবং সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার জন্য ন্যায়সঙ্গত আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হবে।

দিবসটি উপলক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আজ সকাল সাড়ে ১০টায় শাহবাগস্থ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জমান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ সপ্তাহব্যাপী (৭ থেকে ১৩ এপ্রিল) সেবা সপ্তাহ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ফাউন্ডেশন কর্তৃক ‘খেলাধুলা বাড়ায় প্রাণ, হৃদয় থাকে শক্তিমান’Ñ বিষয়ক একটি গণমুখী সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। সেমিনারটি আগামীকাল সকাল ৯টায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, মিরপুর এর অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। গণমুখী সেমিনারে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

দেশের চিকিৎসক, হাসপাতাল তথা চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কম থাকার পেছনে কিছু কারণের কথা প্রায়ই উচ্চারিত হয়। চিকিৎসকদের ব্যবহার, রোগীকে চিকিৎসকদের কম সময় দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা–-নিরীক্ষা, কমিশনÑএসব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ। এই পরিস্থিতির উত্তরণে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল, পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য মানসিকতার পরিবর্তন খুবই দরকার। চিকিৎসকদের উচিত হবে রোগীদের আরও আন্তরিকতার সঙ্গে দেখা, আরও বেশি সময় দেওয়া। হাসপাতালের কাউন্সেলিং পার্ট বাড়ানো।