রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় এখনও ক্ষুব্ধ ও শোকাহত স্থানীয়রা। বিচারের দাবিতে উত্তাল পুরো এলাকা। এদিকে সন্তান হারানোর শোক নিয়েই রামিসার বাবা-মা গতকাল শুক্রবার দুপুরে মেয়ের কুলখানিতে অংশ নিতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন। এ সময় সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নৃশংস এ ঘটনার পতিবাদে গতকাল রাজধানীসহ বিক্ষোভে উত্ত ছিল সারাদেশ। সকাল থেকেই পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকায় রামিসাদের বাসার সামনে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে সেখানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়।

বেলা ১১টার পর থেকে রামিসাদের বাসার সামনের গলিতে দলে দলে নারী-পুরুষসহ সব বয়সি মানুষ এসে জড়ো হন। এ সময় পুরো এলাকায় এক থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল।এ সময় তাদের হাতে ‘রামিসার হত্যাকারীর ফাঁসি চাই’, ‘শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচার চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া লামিয়া খানম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, আমরা এখন নিজেদের সন্তানদের নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। একটা নিষ্পাপ শিশুকে এভাবে হত্যা করা কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা কখনো নিশ্চিত হবে না। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, স্থানীয় জনতা মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। শিশু রামিসা হত্যার প্রতিবাদ ও আসামিদের বিচারের দাবিতে তারা দুপুর ১২টার দিকে সড়কের একপাশে অবস্থান নেন। আমরা একটি লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। এখন যান চলাচল আংশিক স্বাভাবিক রয়েছে।

ছাত্রীসংস্থার মানববন্ধন

শিশু রামিসার ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং নারী-শিশুর প্রতি চলমান সহিংসতার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে ইসলামী ছাত্রীসংস্থা। গতকাল শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সংগঠনটির ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা এ কর্মসূচি পালন করে। মানববন্ধনে সংগঠনটির নেত্রীরা রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। কর্মসূচি থেকে বক্তারা বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। এসব ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান তারা। মানববন্ধন থেকে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো-রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার করে ধর্ষক ও খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা, নারী ও শিশু নির্যাতনের সব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা এবং এ ধরনের মামলায় প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া নারী ও শিশু সহিংসতা প্রতিরোধে কয়েকটি প্রস্তাবও তুলে ধরে সংগঠনটি। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে-মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ ও অশ্লীল ওয়েবসাইট বন্ধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রে নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা। মানববন্ধনে বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভানেত্রী সুখীমন খাতুন, ডা. খাদিজা বিনতে ইসলাম, সালসাবিলা সায়মা, রাইসা রিফাত জুইন, ইকরা কবীর নূর ও মহানগরী দক্ষিণের সভানেত্রী মারুফা তাবাসসুম।

গুলশান সোসাইটি

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার এবং নারী-শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় এ মানববন্ধনের আয়োজন করে গুলশান সোসাইটির সদস্যরা। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গত ১৯ মে ঘটে যাওয়া রামিসা হত্যাকাণ্ড একটি নৃশংস, হৃদয়বিদারক ও মানবতাবিরোধী ঘটনা। মাত্র আট বছরের একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন এভাবে শেষ হয়ে যাওয়া পুরো সমাজের জন্য কলঙ্কজনক। তারা বলেন, এমন ঘটনায় দেশের মানুষ গভীরভাবে শোকাহত এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তারা যেন নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারে এবং তাদের জীবন ও মর্যাদার নিরাপত্তা থাকে— এটাই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু সাম্প্রতিক এ ঘটনা সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিচার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যায়। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ রোধে রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। বক্তারা বলেন, একটি নাবালক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া প্রয়োজন। আমরা দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া চাই না। দ্রুত সুষ্ঠু বিচার এবং অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

খুলনায় শিবিরের বিক্ষোভ

শিশু রামিসা হত্যার বিচার, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের খুলনা মহানগর শাখা। গতকাল শুক্রবার মিছিলটি বাদ জুমা খুলনা মহানগরীর নিউমার্কেট বায়তুন নূর মসজিদ চত্বর থেকে শুরু হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ময়লাপোতা মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ছাত্রশিবিরের মহানগর সভাপতি রাকিব হাসানের সভাপতিত্বে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম বিষয়ক সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী। মহানগর সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেনের পরিচালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাবেক মহানগর সভাপতি জাহিদুর রহমান নাঈম। বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্রশিবির নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নগর শাখার দফতর সম্পাদক আহমেদ সালেহীন, বায়তুলমাল সম্পাদক কামরুল হাসান, প্রচার ও এইচআরডি সম্পাদক এস এম বেলাল হোসেন, প্রকাশনা ও মিডিয়া সম্পাদক ফারহান তূর্য প্রমুখ। সমাবেশে নেতারা প্রশাসনকে হুঁশিয়ার করে বলেন, সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে পড়েছে। একের পর এক এধরনের ঘটনা ঘটছে, কিন্তু প্রশাসন উদাসীন হয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। অনতিবিলম্বে জনজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগসহ সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাতে সিরাজদিখানে পারিবারিক কবরস্থানে রামিসার দাফন সম্পন্ন হয়। মা এখনো মেয়ের জামাকাপড় বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন, আর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বারবার ভেঙে পড়ছেন মেয়ের শেষ আবদারের কথা মনে করে দুই দিন আগে মেয়ের জন্য একটি বোরকা কিনে এনেছিলেন তিনি, যা রামিসার আর পরা হলো না।