• বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট নেই -ব্যারিস্টার শাহরিয়ার
  • ৭০ অনুচ্ছেদ এখনো সংশোধন হয়নি -মনজিল মোরশেদ

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়ে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে চলছে বিতর্ক। সংসদ সদস্যগণের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ সংসদে ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে ৭০ অনুচ্ছেদে। জুলাই সনদে এবং ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ইশতিহারে আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে এমপিদের ভোটাধিকারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুরু হয়েছে। এখন এ নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা কী স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন? এ নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, জুলাই সনদের আলোকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জুলাই সনদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকারের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। আর বিএনপিও তাদের ইশতিহারে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সুতরাং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকারের স্বাধীনতা দেয়া উচিত। এছাড়াও জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ অনুযায়ী পরিষদের প্রথম অধিবেশনের ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন করার কথা আইনে বলা আছে। ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছে, সেদিনই সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন বসার কথা ছিল। সে অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে এতদিনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন হতো। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সবাই স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতেন।

আবার আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, যেহেতু এখনো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন হয়নি, বরং পূর্বের বিধানই বহাল রয়েছে সুতরাং তা মানতে হবে। সংসদ সদস্যরা নিজ দলের প্রার্থীর বাইরে অন্য কাউকে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ হারাতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ : রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া। “কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,

তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।”

জুলাই সনদের আলোকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হল শুধুমাত্র অর্থ বিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য সকল ভোট সংসদ সদস্যরা নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছা অনুযায়ী প্রয়োগ করতে পারবেন।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, বিএনপির ইশতিহারের ১১ নাম্বার ধারায় ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের কথা। সেখানে অর্থ বিল ও আস্থা ভোট ছাড়া রাষ্ট্রপতির ভোটসহ অন্যান্য সকল বিষয়ে সংসদ সদস্যরা মতামত দেয়ার বিধান রেখেছে। আর জুলাই সনদের ৭০ অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বিএনপির কোন নোট অব ডিসেন্ট নেই। সুতরাং সংসদ সদস্যরা তাদের ইচ্ছেমতো ভোট দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

সংবিধানে বিদ্যমান ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে রাষ্ট্রপতিকে ভোট দিতে পারবেন কী না? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চীফ হুইপ যে বক্তব্য দিয়েছেন “দলের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ থাকবে না” এটি সঠিক নয়। তারা বলেছেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় এসে বলছেন আগের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভোট করবেন। এটি বিএনপির দ্বিচারিতা।

তিনি আরো বলেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে। আর সেই নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। যদি জুলাই সনদ না মানা হয় তাহলে ক্ষমতায় থাকা নিয়েই প্রশ্ন উঠে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ এডভোকেট মনজিল মোরশেদ। তিনি দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এখনো সংশোধন হয়নি। এ অনুচ্ছেদ সংশোধন হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি পদে দলের বাইরে কাউকে ভোট দেয়া হলে সংসদ সদস্যপদ থাকবে না।

সরকারী দল যদি এ বিষয়ে সম্মত হয় তাতে আইনী কোন বাধা আছে কি না? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী দল সম্মত হলেও কেউ যদি মামলা করে তাহলে সংসদ সদস্য পদ চলে যেতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত এ অনুচ্ছেদ সংশোধন না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানতে হবে।

সরকার চাইলে অধ্যাদেশ জারি করতে পারে

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী জেনারেল ও এগারো দলীয় ঐক্যজোটের সমন্বয়ক ড এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আমরা ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা করেছি। সংসদ সদস্যরা যেন স্বাধীনভাবে জাতির স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এবং দেশের স্বার্থে মতামত দিতে পারেন, সেই জায়গাটা উন্মুক্ত করার বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। সেখানে বিএনপিসহ যারা ঐকমত্য কমিশনে ছিলেন, আমরা প্রায় তিন দিন আলোচনা করার পর সবাই মিলে একমত হয়েছিলাম যে অনাস্থা ভোট এবং অর্থবিল ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মত দিতে পারবেন এবং ভোট দিতে পারবেন।

তিনি বলেন, এটাই আমরা সবাই চেয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, সত্য হলো, গণভোটে এটা পাস হওয়ার পরও ১২ ফেব্রুয়ারির পর বিএনপির গোঁড়ামি এবং দলীয় সংকীর্ণতার কারণে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে না পারার কারণে গণতন্ত্রকে আবার জনগণের অধিকারের জায়গা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা এই সংস্কার করছেন না। বিশেষ করে গণভোটের যে রায়, সেটি তারা বাস্তবায়ন করছেন না। গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন হতো, তাহলে আজকে আমরা আশা করতাম, কর্নেল সাহেব বিপুল ভোটে বিজয়ী হতেন। কারণ সংসদ সদস্যদের কাছে তিনি একজন গ্রহণযোগ্য ও যোগ্য প্রার্থী।

তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্পর্কে বলেন, সরকার যদি চায়, একটি অধ্যাদেশ জারি করেও এটা করতে পারে। পার্লামেন্ট যেহেতু নেই, অনেক অধ্যাদেশ ইতোমধ্যে জারি করেছেন। তার সঙ্গে যদি বলতেন, সবাই মিলে যখন একমত হয়েছি, একটা অধ্যাদেশ জারি করে দেই, বাংলাদেশের গণতন্ত্র উচ্চ পর্যায় থেকে চর্চা শুরু হোক, তারাও এটা করার সুযোগ আছে।

দলের সিদ্ধান্তের বাইরে এমপিরা ভোট দিলে সদস্যপদ বাতিল : চিফ হুইপ

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যেহেতু সংশোধিত হয়নি, সুতরাং কোনো সংসদ সদস্য দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন না। ভোট দিলে তাদের সদস্যপদ বাতিল হবে। তিনি দাবি করেন জুলাই সনদ অনুযায়ীও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় বিদ্যমান ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে।

চিফ হুইপ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আমরা আজকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়েছি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক যাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য এবং গণতন্ত্রকে বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য। আমরা এরকম একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে চাই এবং স্বচ্ছ একটা প্রক্রিয়া, যাতে এদেশের মানুষ ভবিষ্যতে নির্বাচনমুখী হয়।

বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটা হওয়া উচিত ছিল। যেহেতু গণভোটের রায়ও সংস্কারের পক্ষে এসেছে, তাই ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যেত। তাহলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আরও বেশি সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হত।