কুরআন-সুন্নাহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে স্বাক্ষর না করার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের শতাধিক বিশিষ্ট মুফতি। একই সঙ্গে আইনটির সংশ্লিষ্ট ধারা বাতিল করে দেশের স্বীকৃত মুফতি, ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ, মুসলিম পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট আলেমদের সমন্বয়ে এর শরিয়াহ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে মুফতিগণ বলেন, মুসলিম নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে হেবা (দান), মিরাস (উত্তরাধিকার) ও ওসিয়াতের বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্পত্তি দানসংক্রান্ত কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়াহর প্রতিষ্ঠিত নীতিমালার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিবৃতিতে তারা Gift Reserving Life Usufruct ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, নির্দিষ্ট রক্ত-সম্পর্কীয় ব্যক্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমনভাবে সম্পত্তি দানের সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে দাতা জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারেন। তাদের দাবি, এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যত উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে শরিয়াহর নির্ধারিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

মুফতিগণ বলেন, হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর দাতা কর্তৃক দানকৃত সম্পত্তি ভোগ করার বিষয়ে শরিয়াহতে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। তারা এ প্রসঙ্গে সহিহ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, দান করে তা পুনরায় গ্রহণ করাকে হাদিসে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে।

ওসিয়াতের ক্ষেত্রেও শরিয়াহ নির্ধারিত সীমারেখার কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, সাধারণভাবে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি ওসিয়াত করা যায় এবং কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়াত করার বিধান নেই। এ প্রসঙ্গে তারা ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার অধিকার দিয়েছেন; অতএব কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়াত নেই’ মর্মে হাদিসের উদ্ধৃতি দেন।

বিবৃতিতে সৌদি আরবের আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ লিল-বুহূস আল-ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতার ১১০৮৭ নম্বর ফতোয়া এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্স

(IUMS)-এর বিভিন্ন মতামতের উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ওয়ারিশদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে জীবদ্দশায় সব সম্পত্তি হেবা করে দেওয়া শরিয়াহসম্মত নয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ বিষয়ে ফতোয়া চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বায়তুল মোকাররমের খতিব আল্লামা মুফতি আব্দুল মালেক গত ৪ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে মতামত দেন। তার উদ্ধৃতি দিয়ে মুফতিগণ বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) কর্তৃক নির্ধারিত মিরাস বণ্টননীতি এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হেবা হারাম। মৃত্যুর পর কার্যকর করার উদ্দেশ্যে জীবদ্দশায় যে হেবা করা হয়, নাম হেবা হলেও উদ্দেশ্য বিবেচনায় তা ওসিয়াতের পর্যায়ে পড়ে এবং কোনো ওয়ারিশের জন্য এ ধরনের ওসিয়াত শরিয়াহসম্মত নয়। তবে সব প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ স্বেচ্ছায় তা মেনে নিলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে বলে ওই মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।

মুফতিগণ বলেন, আইনটি নিয়ে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, পারিবারিক সম্পত্তির ওপর সম্ভাব্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং শরিয়াহ নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পুনঃপর্যালোচনা করা জরুরি। এজন্য আইনটি বাতিল করে স্বীকৃত মুফতি, ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ, মুসলিম পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট আলেমদের সমন্বয়ে বিস্তারিত শরিয়াহ পর্যালোচনার দাবি জানান তারা।

বিবৃতিতে আগামীকাল দেশের মসজিদগুলোতে জুমার খুতবায় সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের কথিত শরিয়াহবিরোধী ধারা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে মুসল্লিদের সামনে বক্তব্য তুলে ধরার জন্য ইমাম-খতিবদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

মুফতিগণ বলেন, সরকারকে অবিলম্বে আইনটির কথিত কোরআন-সুন্নাহবিরোধী ধারা বাতিল করতে হবে। অন্যথায় এ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির দায় সরকারকেই বহন করতে হবে বলেও তারা বিবৃতিতে উল্লেখ করেন।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন, বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদের আমীর ও সম্মিলিত উলামা সভাপতি মুফতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন, বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ড ও সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব ড. মুফতি মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য, মুফতি আবু জাফর কাসেমী, ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহ কাউন্সিলের সাবেক সেক্রেটারি ড. মুফতি মাওলানা আব্দুস সামাদ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ ড. সামিউল হক ফারুকী, মুফতি আলী হাসান ওসামা, মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী, শায়খ সাইফুল্লাহ নোমানি, খতিব ও পরিচালক আল- আমিন জামে মসজিদ ও মাদরাসা, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা, মুফতি শফিকুল ইসলাম বিন বাহাউদ্দিন, বেফাকুল মাদারিস বাংলাদেশ, মুফতি আবু দাউদ জাকারিয়া, মুফতি আবুল কাশেম গাজী, মুফতি আব্দুল আউয়াল, মুফতি মুজিবুর রহমান হামিদী, প্রধান মুফতি মাদ্রাসা নুরিয়া ঢাকা, মুফতি সুলতান মহিউদ্দীন, ইফতার বিভাগ মাদ্রাসা নুরিয়া ঢাকা, মুফতি আবুল কালাম মুহতামিম মিরপুর জামিয়া মুফতি বরকত উল্লাহ আনসারী, খতিব ও প্রিন্সিপাল,বাইতুল মেরাজ জামে মসজিদ ও মাদরাসা ঢাকা, খতিব সাবার জামে মসজিদ, মুফতি ফখরুল ইসলাম, মুহতামিম বাইতুল আজিজ মাদ্রাসা কামরাঙ্গীরচর, মুফতি আবুল কাশেম কাসেমী, মুফতি কবির আজহারী আজহারী,খতিব বিশ্ব রোড জামে মসজিদ, মুফতি ইসমাইল হোসাইন,প্রফেসর মুফতি আ.ন.ম. রশিদ আহমাদ মাদানী, ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ আশরাফী, হক্কানী পীর মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব মুফতি মাওলানা শাহ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দীকি, খেলাফাতে রব্বানী আমির মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী, মুফতি মহিউদ্দিন খতিব আদর্শ নগর জামে মসজিদ ঢাকা, মুফতি সরফুল ইসলাম, খতিব আফতাব নগর জামে মসজিদ, মুফতি ডক্টর জাকারিয়া নূর, মুফতি লুৎফর রহমান খতিব পল্টন জামে মসজিদ, খতিব পল্টন জামে মসজিদ, মুফতি ইব্রাহিম খলিল টঙ্গী, অধ্যক্ষ মুফতি মিজানুর রহমান খতিব আনোয়ারা খাতুন জামে মসজিদ ঢাকা, অধ্যাপক মুফতি শফিকুল ইসলাম খতিব আবহাওয়া কোয়াটার জামে মসজিদ উত্তরা ঢাকা, মুফতি আব্দুল কুদ্দুস, খতিব খালাসী জামে মসজিদ খুলনা, মুফতি অধ্যক্ষ রাহমাতুল্লাহ, খতিব নেসারিয়া জামে মসজিদ খুলনা, মুফতি অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, খতিব বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদ খুলনা, মুফতি মোস্তাফিজুর রহমান, মুফতি জাহিদুর রহমান,খতীভ চাঁদনী চক জামে মসজিদ ঢাকা, পীর মুফতি মাওলানা শরীফ হোসাইন, মুসলিম জনতা পরিষদের আমির মুফতি মাওলানা আজিজুর রহমান আজিজ, হক্কানী ত্বরীকত মিশনের জেনারেল সেক্রেটারী মুফতি আল্লামা মুস্তাক আহমাদ, জমিয়াতে উলামা দেওবন্দ পরিষদের সেক্রেটারী হযরত মুফতি মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক কাসেমী, মীরের সরাইর পীর সাহেব মুফতি মাওলানা আঃ মোমেন নাছেরী, টেকের হাটের পীর সাহেব মুফতি মাওলানা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী, অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা মোশাররফ হোসাইন, মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, গাউছিয়া দরবার শরিফের পীর মুফতি ড. আব্দুল কাইউম আল আযহারী, বিশিষ্ঠ মুফাসসির মুফতি মাওলানা ফখরুদ্দীন আহমাদ, মুফতি মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালী, মুফতি মাওলানা মো: নূরুল আমীন, মুফতি ড. কামরুল হাসান শাহীন, মুফতি ড. সাইফুল ইসলাম রফিক (প্রিন্সিপাল মুহাম্মাদাবাদ ফাযিল মাদরাসা), জাতীয় খতীব পরিষদের আমীর মুফতি মাওলানা মাউদুর রহমান, হুফ্ফাজ পরিষদ সেক্রেটারী মুফতি মাহবুবুর রহমান, মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী,কওমী হাফেজ পরিষদ সভাপতি মুফতি নূরুল আমিন গোপালগন্জী হুজুর, সম্মিলিত ইসলামিক জোটের আমির মুফতি মাওলানা আবদুল বাকি, ইসলামী জনতা সভাপতি মুফতি আবদুল কুদ্দুস, মহাসচিব হাফেজ মুফতি আবুল কাসেম, মুহাদ্দিস আবু বকর সিদ্দিক, ইসলাহুল উম্মাহ সভাপতি মুফতি মাওলানা আবু হানিফ নেছারী, মুফতি ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন আযহারী, মুফতি মাওলানা ইরশাদুল্লাহ আযহারী, মুফতি মাওলানা আবু নাঈম, মুফতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ(খতিব, আজাদ মসজিদ, গুলশান), মুফতি মাওলানা সাদিক মুহাম্মাদ ইয়াকুব আল আযহারী প্রমুখ।