বিরোধী দলের নানা আপত্তি ও সমালোচনার মুখেই বহুল আলোচিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে বিলটি পাস করা হয়। অপরদিকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তদন্তের পরিধি সম্প্রসারিত করে বিল পাস করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিল দু’টি কণ্ঠভোটে দিলে তা পাস হয়।

এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর এসআরবি বিল সংসদে উত্থাপন করা হয় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তা সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। বুধবার কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উত্থাপিত হলেও সেখানে বিলটির বিভিন্ন ধারার ওপর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সাতটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানানো হয়। তবে সংসদীয় কমিটির সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে বিরোধী দলীয় নেতাসহ অন্যান্য বিরোধী সদস্যরা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। বিরোধী দলীয় নেতা তার বক্তব্যে বলেন, র‌্যাব বিলুপ্ত করে কেবল নতুন নামে একই ধাঁচের বাহিনী গঠন জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। তাই কোনো অবস্থাতেই এই আইন পাস করা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের আপত্তিতে উল্লেখ করেন যে, র‌্যাব বিলুপ্তির পর পর্যাপ্ত জাতীয় পরামর্শ এবং শক্তিশালী ও স্বাধীন জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে এসআরবি শেষ পর্যন্ত র‌্যাবেরই নতুন রূপ ধারণ করতে পারে। এজন্য তারা রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার দাবি জানান। বিশেষ করে র‌্যাবের পুরোনো নথি, গুমের আলামত ও রেকর্ডপত্র সরাসরি স্থানান্তরের আগে আলাদা তালিকা তৈরি ও সংরক্ষণের দাবি তোলা হয়, যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট বা পরিবর্তন না হতে পারে।

পাস হওয়া আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের অধীন এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে, যার সদর দপ্তর স্থাপন করা হবে ঢাকায়। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এটি গঠন করা হবে। এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মহাপরিচালক, যিনি পুলিশ বাহিনীর অন্তত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা হবেন। তিনি বাহিনীর প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা পরিচালনা করবেন।

আইনের ১০ ও ১২ ধারায় এসআরবির মূল দায়িত্ব ও ক্ষমতার পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ, গুম, ভূঁইফোড় ভূমিদস্যুতা, মানবপাচার, গুম ও মাদক দমনে বাহিনীটি কাজ করবে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারি, তল্লাশি ও আলামত জব্দের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত এসআরবির কাছে নিজস্ব হেফাজতে রাখা যাবে না, বরং আইন অনুযায়ী অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। বাহিনীর সাব-ইন্সপেক্টর বা তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আদালত, সরকার বা পুলিশ প্রধানের নির্দেশনায় এসব অপরাধের আনুষ্ঠানিক তদন্ত পরিচালনা করতে পারবেন।

বিলে বাহিনীর সদস্যদের জন্য কঠোর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা, মদ্যপ অবস্থা, বেআইনি দখলদারি, হেফাজতে থাকা ব্যক্তির প্রতি নির্যাতন বা বল প্রয়োগ, প্ররোচনা দেওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ অমান্য করাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। প্রমাণ সাপেক্ষে বরখাস্ত, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর বা বেতন-ভাতা বাজয়াপ্তের পাশাপাশি তিরস্কার ও জরিমানা মতো শাস্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা ব্যক্তিগত অভিযোগ বা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ নিরসনে একটি বিশেষ ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠিত হবে।

আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিলে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পরিবর্তিত সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে অপরাধের বৈচিত্র্যময় রূপ এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এমন আধুনিক ও দক্ষ বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। র‌্যাব বিলুপ্তির মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিমূলক আধুনিক বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে এসআরবিকে তৈরি করা হয়েছে। আইনটি দ্রুত কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাব সংক্রান্ত আগের সব বিধান বাতিল বলে গণ্য হবে এবং বিলুপ্ত র‌্যাবের সমস্ত সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, তহবিল ও নথি এসআরবিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যস্ত হবে।

বিলের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য

বিরোধী দলের আপত্তির জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইন পাসের পরই র‌্যাব বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং এরপর নতুন ব্যাটালিয়ন হিসেবে এসআরবি গড়ে তোলা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই দুই বাহিনীর মধ্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জনগণের সম্পদের অপচয় রোধ করতেই র‌্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি এসআরবিতে হস্তান্তর করা হবে। নতুন সরঞ্জাম কেনার বদলে সরকার বিদ্যমান সম্পদ পুনর্ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিকায়ন করবে।

র‌্যাবের নথিপত্র সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, নথিপত্র হস্তান্তর একটি বিধিসম্মত প্রক্রিয়া এবং তা নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হবে। প্রস্তাবিত অভিযোগ প্রতিকার কমিটির পক্ষে যুক্তি দিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, এটি ফৌজদারি অপরাধের জন্য নয়, বরং বিভাগীয় ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়াদি মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ উঠলে তা প্রচলিত আইনেই বিচার করা হবে।

র‌্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দিন বলেন, ২০০৩-০৪ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের একটি ধারার অধীনে অ্যাডহক (অস্থায়ী) ভিত্তিতে র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর আইনি কাঠামোয় নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দেয়। তাই নতুন আইনের মাধ্যমে র‌্যাবকে এপিবিএন কাঠামো থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এসআরবি কেবল নতুন নামের র‌্যাব—এমন যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের পরিচালনগত প্রয়োজন এবং সমাজের পরিবর্তনশীল চাহিদা মেটাতেই এই নতুন বাহিনী গঠন করা হচ্ছে।

এপিবিএন বিল

এপিবিএন বিল পাসের মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ রদ (বাতিল) করে বাংলায় একটি নতুন আইনি কাঠামো চালু করা হলো এবং এখান থেকে র‌্যাব সংক্রান্ত বিধানগুলো বাদ দেওয়া হলো। নতুন আইনটিতে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, মাউন্টেন (ট্যুরিস্ট) ব্যাটালিয়ন এবং বিমানবন্দর ব্যাটালিয়নের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলোকে এপিবিএন কাঠামোর অধীনে আনা হয়েছে।

এর মাধ্যমে এপিবিএনের দায়িত্বের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার, মানব পাচার, ধর্ষণ, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাইবার অপরাধ, গুম এবং জমি দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাহিনীকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে।

এপিবিএন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মনোনীত ভিআইপিদের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় সহায়তা করবে। এই প্রথমবারের মতো এই বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি (ঈৎচঈ, ১৮৯৮) এবং পুলিশ রেগুলেশন (চজই, ১৯৪৩) অনুযায়ী ন্যূনতম সাব-ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করতে হবে।

তদন্তের প্রয়োজনে এপিবিএনকে ডিটেনশন সেল (আটক কেন্দ্র), ব্যারাক ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে আইনটিতে। এপিবিএন মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) অধীনে পরিচালিত হবে। এপিবিএন সদর দপ্তরে একটি সাইবার সেল এবং গবেষণা ইউনিট স্থাপন করা হবে।

অপারেশনাল চাহিদা অনুযায়ী সরকার বাইরে থেকে পুলিশ বাহিনীর বাইরের পেশাজীবীদের—যেমন আইনজীবী, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও বিচারকদের চুক্তিভিত্তিক বা প্রেষণে নিয়োগ দিতে পারবে। বাহিনীতে যোগদানের পর সব সদস্যের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নতুন আইনে ১৯৭৯ সালের পুলিশ-নিয়ন্ত্রিত আদালত কাঠামোর পরিবর্তে এপিবিএনের বিশেষ ও আপিল আদালতে বিচার বিভাগীয় সদস্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ যুক্ত করা হয়েছে। এপিবিএনের সংক্ষিপ্ত আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এবং বিশেষ এপিবিএন আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল দায়ের করতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ক্রসফায়ারের অভিযোগ এনে রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বহু বছরের দাবির মুখেই সরকার শেষ পর্যন্ত র‌্যাব বিলুপ্তির এই পদক্ষেপ নিল।

বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিলের বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান, বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল, নাজিবুর রহমান মোমেন, আখতার হোসেনসহ আরো বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য।

র‌্যাবের বিলুপ্তি চেয়েছিলাম, নাম বদলে একই বাহিনী চাইনি : শফিকুর রহমান

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, র‌্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নামে একই ধরনের বাহিনী গঠন জনগণ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। একইসঙ্গে ‘এই আইনটা কোনো অবস্থায় পাস করা উচিত না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী কার্যপ্রণালি-বিধির আইন-প্রণয়ন-সংক্রান্ত কার্যাবলীতে সরকারি বিলটি স্থায়ী কমিটির সুপারিশ বিবেচনার জন্য আনা হলে বিলের ওপর বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। এর আগে বুধবার বিলটি নিয়ে বিরোধী দল সাতটি আপত্তি জানিয়েছিল।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই বিলটি জাতীয় জীবনে অন্য ১০টি বিলের মতো নয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিল। প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে এই জাতির সামগ্রিক অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তার কিছুটা ইতিবাচক দিক থাকলেও নেতিবাচক দিক এত বেশি ছিল যে এটা গোটা বিশ্বকে চিন্তিত করে ফেলেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এই হাউসে আমি বিশ্বাস করি র‌্যাবের হাতে ভুক্তভোগী অনেকেই আছেন, আমি নিজেও। তবে আমি তো বেঁচে আছি। কিন্তু করুণভাবে জীবন দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন কিংবা গুমের শিকার হয়ে অনেকে কোথায় আছেন কেউ জানে না।’

মীর আহমদ বিন কাসেম ও সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগমের স্বামীর প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘গুমের শিকার হয়ে ফিরে আমার সম্মানিত সহকর্মী সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম এখানে আজকে সংসদ সদস্য হয়েছেন। সংরক্ষিত নারী আসন থেকে আমাদের একজন সহকর্মী রয়েছেন মারজিয়া বেগম। তার স্বামী একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক, মানবিক ডাক্তার হিসেবে যার সুপরিচিতি অত্যন্ত সবার কাছে ছিল। রাত ১২টার সময় তাকে শয়ন কক্ষ থেকে তুলে নিয়ে ছাদের ওপর নেওয়া হলো। তার ওপর অমানবিক নির্যাতন হলো। তারপর জীবিত মানুষটাকে ছাদের ওপর থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হলো।’

তিনি বলেন, ‘চোখের সামনেই তার এই করুণ অবস্থা পরিবারের সদস্যরা প্রত্যক্ষ করেছে। শুনে আমাদের হৃদয় ভেঙেছে। যারা দেখেছেন তাদের অবস্থা কী ছিল? আল্লাহ ভালো জানেন।’

র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই বাহিনীটা বিলুপ্তি ছিল সবার দাবি। এখানে নাজিবুর রহমান বলেছেন, খালেদা জিয়াও বারবার এ বিষয়ে কথা বলেছেন। দেশে-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো কথা বলেছে। এটা বিলুপ্ত করে আরেকটা বাহিনী গঠনের দাবি কিন্তু কারওই ছিল না। শুধুই বিলুপ্তির দাবি ছিল।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে সরকারি তরফ থেকে ঠিক একই ধরনের আরেকটা বাহিনী বিল্ডআপ করার দাবি নিয়ে আসা শুধু হয়নি। হুবহু বাহিনীটাকে জায়গায় রেখে, সবকিছু জায়গায় রেখে একটা প্রস্তাবনা নিয়ে আসা হয়েছে।’

সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি জাস্ট পাঁচ দিন আগের ঘটনা বলতে চাই। যখন এই বিলটি আলোচিত হচ্ছে, তখন এই ধরনের একটা বিস্ময়কর ঘটনা একই বাহিনীর দ্বারা ঘটেছে। এবং এটি পুরান ঢাকা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্রীর বাসা থেকে তাকে তুলে নেওয়ার জন্য আসা হয়েছিল।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘সেখানে কোনো সার্চ ওয়ারেন্ট ছিল কি?’

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যদি তড়িঘড়ি করে দৌড়ে না আসতেন, তাহলে কিন্তু মেয়েটাকে নিয়ে যায়। হতে পারে এই মেয়েটা কোনো সামাজিক অপরাধ করেছেন অথবা করেন—এটা আমরা জানি না। কিন্তু এই ঘটনা আমাদের কী বার্তা দিচ্ছে?’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘বার্তা দিচ্ছে, যেই বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত সদস্যদের কোনো ধরনের বোধোদয় হয়নি। তারা আগে যেমন ছিলেন, এখনো তেমনই আছেন। সেই একই বাহিনীর লোকেরা একই জায়গায় হস্তান্তর হচ্ছেন। কোথায় হস্তান্তর? তাদের স্থাপনা যা আছে তাই থাকবে। লজিস্টিক যা আছে তাই থাকবে। ম্যানপাওয়ারও যা আছে তাই থাকবে। তাই তো কোনো কিছু স্থানান্তর হলো না। শুধু একটা নাম বদলায়, আরেকটা নাম আসে।’

তিনি বলেন, ‘এটা তো জাতি চায় না।’

বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়েছেন জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমাদের তরফ থেকে যে নোট অব ডিসেন্ট স্থায়ী কমিটিকে দেওয়া হয়েছে, তাও আমি দেখেছি।’

বিল উত্থাপনকারী সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘র‌্যাবের জন্ম হয়েছিল উনাদেরই হাতে। যখন উনারা আমাদের লুৎফুজ্জামান বাবর সাহেব তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে এবং তিনি সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করেছেন, আমার যতটুকু মনে হয়।’

তিনি বলেন, ‘র‌্যাবের হাতে জাতীয়তাবাদী দল সবচাইতে বেশি নিগৃহীত হয়েছে। এরপর আমরা হয়েছি। জাতি হয়েছে। জাতির কোনো অংশ বাদ যায় নাই।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এই বিষয়টা সামনে আসার পরে বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি থেকে আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। সবাই উদ্বিগ্ন।’

তিনি সরকারকে বিলটি এ অধিবেশনে পাস না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা অনুরোধ করবো, এই সেশনে এই বিলটা পাস করার দরকার নেই। এটা নিয়ে স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আরও কাজ করা হোক। আরও গভীরভাবে চিন্তা করা হোক।’

কেন এমন একটি বাহিনীর প্রয়োজন, তার যথার্থতা আরও পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যাতে অনুভব করুক যে এই ধরনের একটা স্পেশালাইজড ফোর্স আমাদের লাগবে। যাতে কনভিন্স হোক। আদারওয়াইজ গোটা জাতি এটাকে স্বাভাবিকভাবে নেবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ব সম্প্রদায়ও তারা যে আপত্তি উত্থাপন করেছিল, দাবি জানিয়েছিল, এটা গঠনের মধ্য দিয়ে এই বাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে সেই দাবি পূরণ হবে না। বরঞ্চ আমরা কলঙ্কিত অবস্থায় থেকে যাব।’

বিলে কিছু পরিবর্তন ও বাধ্যবাধকতা আনা হলেও মৌলিক জায়গায় কোনো পরিবর্তন হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ‘যদিও এখানে ছোটখাটো কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, কিছু বাধ্যবাধকতা আনা হয়েছে। কিন্তু মৌলিক জায়গায় কোনো কিছুই হয়নি। মৌলিক জায়গাগুলো যেমন ছিল তেমনই আছে। আমার অপরাধ আমি তদন্ত করব। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা।’

বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমি মনে করি যে এই আইনটা কোনো অবস্থায় পাস করা উচিত না। এই আইনটা ফিরিয়ে নেওয়া দরকার। যাদের বৃহত্তর স্বার্থে একটা উদাহরণ তৈরি হোক যে সরকারি দল জনগণের এই সেন্টিমেন্টের প্রতি এবং বাস্তব অভিব্যক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে এটা প্রত্যাহার করবেন। পরবর্তী পর্যায়ে চিন্তাভাবনা করে আনতে হলে তারা আসবেন।

র‌্যাবের বদলে এসআরবি, নতুন বোতলে পুরোনো মদ: সংসদে এমপি নাজিবুর

পাবনা-২ (সাঁথিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিলের মূল কাঠামোতে কোথাও পরিবর্তন আনা হয়নি।

তিনি বলেন, একটি দক্ষ বিশেষায়িত বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা নই। কিন্তু এর প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা ঠিকমতো না রেখে শুধু ‘পুরোনো বোতলে নতুন মদ’ করলে উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। এ বিষয়ে আমাদেরও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ছিল।

নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ‘২০১৪ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জে যে ন্যক্কারজনক সাত খুনের ঘটনা ঘটলো, সে ঘটনার পরে র‌্যাব স্কোয়াডকে কিলিং স্কোয়াড আখ্যায়িত করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সে সময় তিনি র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি জানান। সংস্কার নয়, সরাসরি বাহিনীর বিলুপ্তির দাবি করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে দেশনেত্রী র‌্যাবকে ক্যানসার আখ্যায়িত করেছিলেন। তখনো তিনি র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি করেন।’

তিনি বলেন, ‘এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পুলিশ সংস্কার কমিশনের কাছে র‌্যাব বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করে বিএনপি। এই সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও গুম কমিশনও র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল।’

এ সংসদ সদস্য বলেন, ‘এখানে আমরা কী দেখছি? র‌্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি, দায়-দায়িত্ব সরাসরি এসআরবি নামের নতুন বাহিনীর কাছে চলে যাবে। অর্থাৎ শুধু সাইনবোর্ডটাই পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন বোতলে পুরোনো মদ। র‌্যাবের নাম ছাড়া আর কোনো কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে না, সব ঠিক থাকছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, গুম-অপহরণসহ অনেক অপরাধের মামলা এবং তদন্ত ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

আখতার হোসেন বলেন, একজন মানুষকে গ্রেপ্তার বা আটক করার পর সে কোথায় যাচ্ছে সেই জায়গাটা স্পেসিফিকভাবে নজরদারিতে আনার জন্য পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড থাকা দরকার। কোনো মানুষ যেন রাষ্ট্রের হেফাজতে গিয়ে অদৃশ্য না হয়ে যায় বা যে ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলো ঘটেছে সেগুলোর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। একইভাবে র‌্যাবের পুরনো সব অপারেশন রেকর্ড, কাস্টডি রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ, অস্ত্রের রেকর্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ বাহিনীর নাম পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু অতীতের দায় মুছে দিতে দেয়া যাবে না কোনোভাবেই।

নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, কোনো পরামর্শ ছাড়াই এত বড় একটা বিল, যেটি যে র‌্যাবের প্রতি আমাদের আতঙ্ক আছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং গোটা বাংলাদেশের গুম এবং খুনের একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে, এই ধরনের একটা বিল, এই ঝুঁকিপূর্ণ বিলটিকে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে মাত্র চার কর্মদিবসের মধ্যে এটিকে পাস করার জন্য এখানে নিয়ে আসা—এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা চাই যে স্টেকহোল্ডার যারা এখানে ভুক্তভোগী আছে, ফৌজদারি আইনজীবী যারা আছেন, মানবাধিকার কমিশন আছেন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার যে সমস্ত সংস্থা আছে—এসবকিছু মিলিয়ে বিচারিক আদালতে যারা ভূমিকা পালন করেছেন, সবার মতামত প্রয়োজন এবং অধিকতর আলোচনা করে এ বিলটিকে সংসদে নিয়ে আসার জন্য দরকার ছিল; এটি আমাদের দাবি ছিল। দুই হচ্ছে র‌্যাব থেকে এসআরবিতে হস্তান্তরের সময় তাদের রেকর্ডপত্র কীভাবে সংরক্ষিত হবে, এ আইনে এই সুরক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ধারা ২৪-এ যে কমিটি গঠন করা হয়েছে অভিযোগ প্রতিকারের জন্য, এসআরবির বিরুদ্ধে আসলে এই কমিটি অভিযোগের প্রতিকার করার মতো সামর্থ্য রাখে কিনা—কোনোভাবেই সামর্থ্য রাখে না।

বিরোধী দল সেজে সংসদে থাকার দরকার নাই: রুমিন ফারহানা

হাজারো প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া নতুন সংসদে যদি ন্যূনতম কোনো পরিবর্তন না ঘটে, তবে বিরোধী দল সেজে শুধু ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য এই সংসদে থাকার কোনো দরকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।

একই সঙ্গে মহান সংসদে অন্য সংসদ সদস্যদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও অসহিষ্ণু আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি।

স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় র‌্যাবের মতো বাহিনী প্রয়োজন: বাবর

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিলের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে নেত্রকোনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, র‌্যাবের পরিবর্তে এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন) নামে যে সংগঠনটি আসছে, সেটা প্রয়োজন। কারণ এখনো বিভিন্ন বোমা হামলা হচ্ছে। বোমা হামলাসহ বিভিন্ন বোমা আসছে। আপনারা দেখছেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী যে কোনো একটি দেশ বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রকম প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে, অতীতেও করেছিল। এ কারণে র‌্যাবের মতো একটি সংগঠন প্রয়োজন।