দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া হাম-সন্দেহে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে একদিনে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামরোগী শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ১১৫ জন। আর ১৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪৬৭ জনে। এ সময়ে নিশ্চিত হামরোগী শনাক্ত হয়েছে ১২৭ জন। ১৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মোট নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা তিন হাজার ১৯২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, ১৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ৮৯৮ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ হাজার ২৪৩ জন। এই সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০৮ জনে।

এদিকে মে নয়, ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী হামের টিকা কার্যক্রম শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। গতকাল শুক্রবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এ কথা জানান। সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৩ মে নয়, আগামী ২০ এপ্রিল থেকেই শুরু হচ্ছে দেশব্যাপী হামের টিকা কার্যক্রম। বগুড়ায় প্রধানমন্ত্রী টিকা কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। সেখানে স্বাস্থ্য সচিব থাকবেন। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী পাবনায় উদ্বোধন করবেন এবং আমি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে উদ্বোধন করবো। সারাদেশে শিশুদেরকে টিকা দেওয়া হবে। হাম মোকাবিলায় সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এর আগে গত ৭ এপ্রিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৩ মে থেকে সারাদেশে এই টিকা কার্যক্রম শুরু হবে। শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে সারাদেশে টিকা দেওয়ার চূড়ান্ত তারিখ জানানো হয়।

যক্ষার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, কয়েক দিন ধরে পত্রিকায় দেখছি যক্ষার কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। আমি সাংবাদিকদের কাজকে সম্মান করি এবং ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করি। তবে মাঝে মধ্যে এমন কিছু নিউজ আসে, যেগুলি সত্যতার সঙ্গে কোনো মিল থাকে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ফান্ড যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। জনস্বার্থে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় নাই। গতানুগতিক কাজ করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, আমাদের যক্ষা টিকার কোনো ঘাটতি নেই। আগামী জুন মাস পর্যন্ত টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবো এবং কোনো ধরনের বাধা থাকবে না। যক্ষার দুই ধরনের টিকার মজুদ রয়েছে। টিকা ঘাটতির খবর সত্য নয়। সিরিঞ্জের ঘাটতিও নেই এবং ফান্ড আরও আনা হবে। সেইসঙ্গে পর্যাপ্ত লোকবল রয়েছে।

খুলনা ব্যুরো জানায় : খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৯৭ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. মুজিবর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ১ হাজার ৩৩৩ শিশু। এছাড়া ৬৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে মারা গেছে ১০ জন। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা কুষ্টিয়া জেলার। কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি সর্বোচ্চ ৫২৪ শিশু। এছাড়া মাগুরায় ১৮৬, যশোরে ১৫৮ শিশু, খুলনায় ১৩৩, মেহেরপুরে ৮৫, সাতক্ষীরায় ৭২, ঝিনাইদহে ৬৪, নড়াইলে ৪৫, বাগেরহাটে ৩৪ এবং চুয়াডাঙ্গায় ৩২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এদিকে, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে ৯৭ শিশু। এরমধ্যে কুষ্টিয়ায় ৩৯, সাতক্ষীরায় ২, খুলনায় ৭, যশোরে ১৩, বাগেরহাটে ১৩, চুয়াডাঙ্গায় ৩, ঝিনাইদহে ৪, মাগুরায় ৮, নড়াইলে ৭ ও মেহেরপুরে এক শিশু ভর্তি হয়েছে।

খুলনা নগরীকে হামের প্রভাব মুক্ত করতে সোমবার থেকে টিকা দান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুরা এ সুযোগ পাবে। আগামি ২০ মে পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে। ১৫ মার্চ থেকে দক্ষিণ জনপদে হামের প্রার্দুভাব শুরু হলেও নগরীতে এ ধরণের রোগী সনাক্ত হয়নি। হাম সন্দেহের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কুষ্টিয়া ও যশোর জেলা। হামের টিকার জন্য দেশব্যাপী হৈচৈ শুরু হয়েছে। বিরোধী দল ইস্যু করে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে ঝড় তুলছে। ইতিমধ্যেই অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়ে প্রত্রিকায় প্রবন্ধ ও নিবন্ধ ছাপা হচ্ছে। এ রোগের প্রার্দুভাব শুরু হলেও মজুদ না থাকায় টিকা দেয়া সম্ভব হয়নি।

কেসিসি’র স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্রের দেয়া তথ্য মতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় টিকা মজুদ করা হয়েছে। এ কর্মসূচি সফল করতে ১৯ এপ্রিল রবিবার স্বাস্থ্য ভবনে বেলা ২ টায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু সার্বিক পরিস্থিতি ও টিকা দান সম্পর্কে নগরবাসীকে অবহিত করবেন। এ অনুষ্ঠানে নাগরিক নেতা, বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।

কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ শরীফ শাম্মীউল ইসলাম ৩১টি ওয়ার্ডে টিকা দেয়া হবে বলে বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, সোমবার থেকে এক মাস সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৩ টা পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে। শুক্রবার-শনিবার সেবা দান বন্ধ থাকবে। কর্পোরেশনের কর্মচারী-সরকারি হাসপাতালের নার্স ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মচারীরা টিকা দানে সহায়তা করবেন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষা মঞ্চ, খুলনা শনিবার বেলা পৌনে ১ টায়’ নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়ে ‘চাই হাম মুক্ত খুলনা’ শীর্ষক মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের উপ-পরিচালক ডাঃ মুজিবুর রহমান জানান, এপ্রিলে ২০ দিনের কর্মসূচিতে যশোর সদর পৌর এলাকায় ৯১ হাজার শিশুকে টিকা দানের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় এ কর্মসূচি পরিচালিত হয়।

এ সূত্র জানায়, বিভাগের ১০ জেলায় ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম সন্দেহে এক হাজার ৬৮৩ জন সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি হয়। এক হাজার ৩৩৩ জন হাসপাতাল ছাড়া পেয়েছে। হাম সন্দেহে বিভাগে ১০ জনের মৃত্যু হয়। ৬৮ জনের দেহে হাম নিশ্চিত হয়েছে।