• ছুটির দিনেও তেল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন
  • ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না জ্বালানি তেল
  • জ্বালানি সংকট নিয়ে লুকোচুরি খেলছে সরকার : ডা. ইরান

রাজধানী ঢাকায় তেল পাম্পগুলোতে ছুটির দিনেও তেল সংগ্রহে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে রাইডশেয়ার চালক ও চাকরিজীবীরা। গতকাল শুক্রবার ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যান একসঙ্গে পাম্পে ভিড় করায় অনেক স্থানে সড়ক পর্যন্ত লাইন বিস্তৃত হয়, ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের।

বিজয় স্বরণী ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন, আসাদগেটে তালুকদার ফিলিং স্টেশনসহ কয়েকটি পাম্পে ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। এদিকে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দশটার পর থেকে নীলক্ষেত এলাকায় পেট্রলপাম্পগুলোতে বাইক ও ব্যক্তিগত গাড়ির লাইন দেখা গেছে। অনেকেই গতকাল সকালে অন্তত কিছু তেল পান সে চিন্তায় কাল রাত থেকেই লাইনে ছিলেন।

রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পাম্পগুলোর সামনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা গেছে । অনেক চালক ভোর ৫টা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, তবুও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কাঙ্খিত জ্বালানি পাচ্ছেন না। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্বালানি পাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে তারা বাধ্য হয়ে আগেভাগেই লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ কেউ জানান, দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে শুধু তেলের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

তালুকদার ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়ানো তৌসিফ হাসান নামে এক চাকরিজীবী বলেন, সকাল থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রথম ১৫০ জনের মধ্যে থাকায় আশা রাখছি তেল শেষ হওয়ার আগেই পাবো।

ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়ানো গালিব হোসেন বলেন, অনেকগুলো পাম্পে ঘুরলাম সব জায়গায় দীর্ঘ লাইন। ছুটির দিনে যেখানে পরিবারকে সময় দেবো। সেখানে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি।

পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়েছে। এর প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়েছে, ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে। এদিকে, পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনের কারণে আশপাশের সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, যা নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করছে।

ফিলিং স্টেশন একটি, তেলের লাইনে ১ হাজার ১১ যানবাহন:

রাজধানীর পরীবাগের একটি ফিলিং স্টেশন। শুক্রবার বেলা ১১টার সময় এখানে ৫১৮টি মোটরসাইকেল ও ৪৯৩টি প্রাইভেট কার তেলের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। এই স্টেশনে মোট ১ হাজার ১১টি যান লাইনে দাঁড়ানো। মৎস্য ভবনের আরেকটি ফিলিং স্টেশনেও অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সংখ্যা কাছাকাছি। সেখানে সকাল ১০টার সময় তেল নিতে লাইনে আছে ৪২২টি মোটরসাইকেল ও ৩৫৮টি প্রাইভেট কার। যানবাহনের সংখ্যা গুনেই বোঝা যায় তেলের জন্য অপেক্ষমাণ লাইন কতটা লম্বা। আর একেকজনকে কত ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

পরীবাগের মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে প্রাইভেট কারের চালক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘তেল না নিলে তো আমাদের চাকরি থাকবে না, সে জন্য যত কষ্টই হোক, আমাদের তেল নিতে হবে। এরপর আবার ডিউটি করতে হবে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন বলে জানান তিনি। শুক্রবার বেলা ১১টায়ও তিনি তেল পাননি। যখন কথা হয়, তখন তাঁর সামনে আরও তিনটি গাড়ি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ানো।

আবদুল আজিজের সাথে একই সময় অপেক্ষায় আছেন মোটরসাইকেলের চালক সাইফুল ইসলাম। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মৎস্য ভবনে রমনা ফিলিং স্টেশনে কথা হয় এই চালকের সঙ্গে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার সময় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন সকাল সাড়ে ১০টা পার হয়েছে। তবু তেল পাননি। পাম্প থেকে জানানো হয়েছে, দুপুরের পর তেল পেতে পারেন।

এই মোটরসাইকেলের চালক বলেন, ‘চাকরি করি। শুক্রবার ছুটির দিন হিসেবে একটু বিশ্রাম নেব, পরিবারকে সময় দেব, কিন্তু এই তেলসংকট শুরু হওয়ার পর থেকে আর কোনো কিছু করতে পারছি না। বৃহস্পতিবার পুরো রাত, শুক্রবার পুরো দিন কেটে যায় তেল নিতে নিতে। এই ভোগান্তি থেকে কবে মুক্তি পাব, জানি না। সাইফুল ইসলামের অভিযোগ, সরকার বলে তেলের সংকট নেই, অথচ ফিলিং স্টেশনে এলে ভিন্ন চিত্র।

এই ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়েও তেল পাচ্ছেন না আরেক চালক মাসুম । তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার সময় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। শুক্রবার বেলা ১১টা পেরিয়ে গেলেও তিনি তেল পাননি। কখন পাবেন, সেটিও জানেন না। মাসুম অভিযোগ করে বলেন, সরকার, মন্ত্রীরা সবাই বলে তেলের কোনো সংকট নেই। তেল নাকি আরও আসছে। কিন্তু পাম্পে বাস্তবতা আলাদা।

দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত আছে

দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত আছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। শুক্রবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা জানান।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত রয়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকেও জ্বালানী সংগ্রহের চেষ্টা করছে সরকার। দেশে এপ্রিল ও মে মাসের জন্য দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে জুন মাসের সম্ভাব্য চাহিদা মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা চলছে। আবার পরিশোধন বন্ধ থাকায় পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে মনোযোগ দিয়েছে সরকার। ২০২৯ সাল থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কার্যক্রম শুরু হবে। শিল্প ও কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে বর্তমানে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে।

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড (ইআরএল) ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের সংকটে পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত ১৩ এপ্রিল সর্বশেষ সেখানে পরিশোধন কার্যক্রম চালানো হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার কারণে প্রায় দুই মাস ধরে ক্রুড তেল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। দেশে সর্বশেষ অপরিশোধিত তেলের চালান আসে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। আগামী মে মাসের শুরুতে নতুন চালান আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইআরএলের কর্মকর্তারা জানান, কক্সবাজারের মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা প্রায় ৫ হাজার টন এবং চারটি ট্যাংকের তলানিতে থাকা ডেড স্টক ব্যবহার করে কয়েকদিন পরিশোধন কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছিল। মূল মজুত ৬ এপ্রিল শেষ হয়ে যাওয়ার পর এসব বিকল্প উৎসের তেল দিয়েই উৎপাদন চলছিল।

তথ্য মতে, ইআরএল সাধারণত দৈনিক গড়ে ৪ হাজার ৫০০ টন ক্রুড তেল পরিশোধন করে। তবে সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়। পাঁচটি ট্যাংকের তলানিতে থাকা প্রায় ৩৩ হাজার টন ডেড স্টক এবং এসপিএম থেকে আনা ৫ হাজার টন তেল দিয়ে এতদিন উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এসব মজুতও শেষ হয়ে যাওয়ায় ক্রুড প্রসেসিং কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে ৬৮ থেকে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যা ইআরএলে পরিশোধন করা হয়। ইআরএল এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল ও ফার্নেসসহ মোট ১৬ ধরনের জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করে। বাকি চাহিদা মেটাতে ভারত ও চীন থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়।

জ্বালানি সংকট নিয়ে জনগণের সাথে লুকোচুরি খেলছে সরকার : ডা. ইরান

বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেছেন, দেশে চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার জনগণের সাথে লুকোচুরি ও মিথ্যাচারে লিপ্ত রয়েছে। তেলের পাম্পগুলোতে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হলেও এ বিষয়ে সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

শুক্রবার বাদ মাগরিব গ্রীন চিলি চাইনিজে ডেমরা থানা লেবার পার্টির উদ্যোগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কাউন্সিল সফল করার লক্ষ্যে আয়োজিত এক কর্মী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, দেশে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট বিদ্যমান থাকলেও জাতীয় সংসদে এমপি ও মন্ত্রীরা এই সংকট স্বীকার করছেন না। বাস্তবে পাম্পে তেল না থাকলেও সংসদে যেন তেলের কোনো ঘাটতি নেই, এমন বক্তব্য জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

ডা. ইরান আরও বলেন, দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড ক্রুড অয়েলের সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।

তিনি অবিলম্বে জ্বালানি সংকট নিরসনে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এবং প্রকৃত পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরার দাবি জানান।

মোঃ গোলাম আজমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম, দফতর সম্পাদক মোঃ মিরাজ খান, প্রচার সম্পাদক মোঃ মনির হোসেন খান, ঢাকা মহানগর সদস্য সচিব মোঃ জাহিদুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ মাসুদ আলম পাটোয়ারী, মোঃ ইমরান হোসেন মুন্সি, মহানগর সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মোঃ রাজু বেপারী এবং বাংলাদেশ ছাত্র মিশনের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম মামুন প্রমুখ।