সন্দেহজনক হাম’ বা হামের উপসর্গ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে অতিসংক্রামক হামে মৃত্যু হয়েছে আরও এক শিশুর। এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই ঢাকা বিভাগে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হামে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ১২৮ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া শিশুদের ৯ জনই ঢাকা বিভাগের। আর অন্য দুজনের মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত হামে আক্রান্ত মোট শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৩৯৮। আর সন্দেহজনক হাম নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৮৮৩। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়া পাওয়া রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৬৩৫। গত দিন ‘সন্দেহজনক হাম’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এই সংখ্যা ২৫৬। এরপর রয়েছে যথাক্রমে চট্টগ্রাম (১২৫), রাজশাহী (৯২), খুলনা (৬৫), বরিশাল (৫০),সিলেট (২১), রংপুর (১৭) ও ময়মনসিংহ (১৫)। সন্দেহজনক হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ৫৮৫ জন ছুটিও পেয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৩৮ ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৯ জন হাসপাতাল ছেড়েছে। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম নিয়ে ১ হাজার ২৩৬ জন হাসপাতালে এসেছে। এ নিয়ে গত ২৪ দিনে হাসপাতালে আসা ৯ হাজার ৮৮৩ জনের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৬ হাজার ৮৮৩ জন। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছে ৪ হাজার ৬৩৫ জন।
এদিকে দেশজুড়ে হঠাৎ বাড়তে থাকা হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রোগ শনাক্তে ধীরগতি এই উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বেশিরভাগই উপসর্গ নিয়ে ‘সন্দেহজনক’ হামে মৃত্যু হচ্ছে। সরকার জরুরি ভিত্তিতে ৫৬টি জেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান শুরু করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন জেলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছেÑমৃতদের মধ্যে প্রায় ৯২ দশমিক ৮৬ শতাংশই শিশু, যাদের বড় একটি অংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন হাজারো রোগীর বেশিরভাগও শিশু হওয়ায় পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি চালু হওযার পর দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্য ছিল না বললেই চলে। বিশেষ করে ২০২০ সাল থেকে দেশে হামে মৃত্যুর কোনো রেকর্ড নেই। হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ টিকাদান কর্মসূচির কভারেজ ধস। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে টিকাদানের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২ সালে তা উঠে যায় ১০৩ দশমিক ৬ শতাংশে। ২০২৪ সালে নেমে আসে ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশে। আর ২০২৫ সালে বড় ধস নেমে তা দাঁড়ায় ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীর পাঁচটি হাসপাতালসহ ৬৪টি জেলায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মৃতদের মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশের বয়স শূন্য থেকে ৫ বছর এবং ১২ দশমিক ২৬ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১৮ বছর। বাকি ১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক। আর সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীর মধ্যে বেশিরভাগই শিশু।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে হামে যত মৃত্যু হয়েছে, তা গত দেড় দশকে সর্বোচ্চ। এ সময়ে পাঁচ বার হামে মৃত্যুর ঘটনা জানা যায়। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি মারা যায় ১০ জন। ডব্লিউএইচওর দেওয়া বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে ৯ হাজার ৭৪৩টি হাম রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৯৩৪ জনে। এরপর ২০০৬ সালে তা নেমে আসে ৬ হাজার ১৯২-এ। ২০০৭ সালে ২ হাজার ৯২৪, ২০০৮-এ ২ হাজার ৬৬০, ২০০৯-এ ৭১৮, আর ২০১০ সালে ৭৮৮।
অর্থাৎ ২০০৪ থেকে ২০০৫-এর ভয়াবহ অবস্থার পর আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত কমে আসে। ২০১১ সালে দেশে হাম রোগীর সংখ্যা আবার লাফ দিয়ে ৫ হাজার ৬২৫-এ ওঠে। ২০১২ সালে তা ১ হাজার ৯৮৬-এ নেমে আসে। ২০১৩ সালে ২৩৭, ২০১৪ সালে ২৮৯, ২০১৫ সালে ২৪০-এ তিন বছর তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে আবার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ৯৭২।
খুলনা ব্যুরো জানান: খুলনা বিভাগে হামে আক্রান্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিভাগজুড়ে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩৭ জনে। এর মধ্যে নতুন শনাক্ত হয়েছে ১ জন এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১টি। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে দেওয়া হামের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার আওতায় এসব রোগী শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া গেছে কুষ্টিয়ায়। জেলাটিতে মোট ১০১ জন সন্দেহভাজন রোগী রয়েছে, যার মধ্যে নতুন শনাক্ত ২৫ জন। এছাড়া যশোরে ৫৭ জন এবং খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) এলাকায়ও ৫৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
বাগেরহাটে মোট ১৭ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৪ জন, ঝিনাইদহে ১৩ জন, খুলনা জেলায় ৫ জন, মাগুরায় ২৮ জন, মেহেরপুরে ১৮ জন, নড়াইলে ১৭ জন এবং সাতক্ষীরায় ২০ জন সন্দেহভাজন রোগী পাওয়া গেছে।
এদিকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (কেএমসিএইচ)-এ গত রোববার রাতে হামে আক্রান্ত সন্দেহে ৬ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ঘটনাটি সোমবার প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। একইসঙ্গে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও পৃথকীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. মুজিবুর রহমান জনসাধারণকে সচেতন থাকার পাশাপাশি শিশুদের নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে খুলনায় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (খুমেক) শিশু রোগীদের জন্য আলাদা করে হাম কর্নার চালু করা হয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সেখানে চরম বেড সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত বেড না থাকায় শিশু রোগীদের অনেককে ফ্লোরে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
খুমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাম কর্ণারে মোট ১৪টি বেড থাকলেও এর মধ্যে একটি বেড ভাঙা থাকায় তা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে কার্যকর ১৩টি বেডে বর্তমানে ২১ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে একটি বেডে দুইজন রোগী রাখার পাশাপাশি অনেককে ফ্লোরে থাকতে হচ্ছে। নতুন রোগী এলে তাদেরও ফ্লোরে থাকতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশ। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কুষ্টিয়া জেলায়। সেখানে হামে আক্রান্ত হয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। খুমেক হাসপাতাল সূত্র আরও জানায়, গত কয়েকদিনে হাম কর্নারে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ১ এপ্রিল ভর্তি ছিল ১১ জন, ২ এপ্রিল ১৫ জন, ৩ এপ্রিল ১৯ জন, ৪ এপ্রিল ১৪ জন, ৫ এপ্রিল ১৫ জন এবং ৬ এপ্রিল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। এ বিষয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান স্যায়েদা রুখশানা পারভীন এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন জানান, বর্তমানে খুলনা জেলা আপাতত ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিতান কুমার মন্ডল জানিয়েছে, রোগীর চাপ মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে খুলনা সদর হাসপাতাল ও বক্ষব্যাধি বিশেষায়িত হাসপাতাল নতুন করে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিতান কুমার মন্ডল বলেন, সংকট মোকাবিলায় দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে যাতে প্রয়োজন হলে সেখানে চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ করা যায়। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং শিশুদের টিকা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।