রাজশাহী ব্যুরো
রাজশাহীর হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অধিকাংশেই তরল মেডিকেল বর্জ্য সরাসরি নগরীর ড্রেনে গিয়ে পড়ছে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। এ নিয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।
পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, মেডিকেল বা চিকিৎসা বর্জ্য হলো হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবরেটরিতে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা কিংবা গবেষণার সময় উৎপাদিত ক্ষতিকর ও সংক্রামক বর্জ্য। এ গুলোর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ বর্জ্য অত্যন্ত বিপজ্জনক, যা এইডস, হেপাটাইটিসের মতো মারাত্মক রোগ ছড়ায় এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করে। রাজশাহী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, জেলায় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২১৬টি। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটিতে তরল বর্জ্য শোধনের জন্য কার্যকর ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বা বর্জ্য শোধনাগার রয়েছে। অর্থাৎ ২১৪ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই তরল মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। রাজশাহী নগরীর হাসপাতালপাড়া হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তরল ও কঠিন চিকিৎসা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। তরল বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে রক্ত, শরীরের বিভিন্ন তরল পদার্থ, রাসায়নিক পদার্থ এবং বিভিন্ন ধরনের জীবাণুযুক্ত উপাদান। নিয়মানুযায়ী, এসব তরল বর্জ্য শোধন করে নিরাপদভাবে নিষ্কাশন করার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত শোধনব্যবস্থা না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত তরল বর্জ্য পয়ঃনিষ্কাশন বা ড্রেনেজ লাইনের মাধ্যমে বাইরে ফেলে দিচ্ছি।
নগরীর বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রায় সবকটিরই তরল বর্জ্য ড্রেনে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ড্রেন ও নালার মাধ্যমে এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে পবা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ড্রেনের পানি বারনই নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে নগরীর ড্রেনের বর্জ্যও শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ। একই সঙ্গে এসব বর্জ্যে থাকা জীবাণু ও ক্ষতিকর উপাদান মানুষের সংস্পর্শে এসে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ ও রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
পবা উপজেলার একজন বাসিন্দা বলেন, এলাকার ড্রেনে প্রায়ই মেডিকেল বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। ড্রেনের পানিতে রক্ত, তুলা, গজসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ভাসতে থাকে। এসব বর্জ্যরে কারণে প্রচ- দুর্গন্ধ ছড়ায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ওই পানিতে নামতে হয়। তখন সিরিঞ্জ, তার ও কাঁচের বোতলের মতো বর্জ্য পায়ে লেগে কেটে যায়। পরে চুলকানি ও ঘা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ও রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। অপরিশোধিত অবস্থায় তা ড্রেনে বা পরিবেশে গেলে পানি ও মাটি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তা ছাড়া জলাশয় ও নদীর পানির জীববৈচিত্র্যের জন্যও এসব বর্জ্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেন, বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ বিষয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। বর্তমানে তারা একটি হাসপাতালের একটি বাথরুমে এসব বর্জ্য কিছুটা পরিশোধন করে তারপর পয়োনিষ্কাশন লাইনে দেন। তবে সরকার যদি এটি পুরোপুরি পরিশোধন করতে বলে, সে ক্ষেত্রে তারা তা মেনে চলবেন। রাজশাহীর সিভিল সার্জন অফিস থেকে বলা হয়, চিকিৎসা বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্র্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে। যারা নিয়ম মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।