‎নুরুল আজিম ইমতিয়াজ, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)

চট্টগ্রাম শহর থেকে ৪৫ কিমি দূরত্বে অবস্থিত ৩৯২ কি.মি. আয়তনের বাঁশখালী উপজেলাটি হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। বাঁশখালী ভূ-প্রকৃতির নৈসর্গিক ভূমি। সবুজে সাজানো প্রকৃতির কুঁড়েঘর। প্রকৃতি অপরূপ সৌন্দর্যের দৃশ্য এই ছোট্ট বাঁশখালীতে উপভোগ করা যায়।

‎নান্দনিক সৌন্দর্যের বাঁশখালীর উত্তরে কোল ঘেঁষে আছে সাঙ্গু নদী, পূর্বে সবুজে মোড়ানো উঁচু উঁচু পাহাড়, পশ্চিমে বিশাল জলরাশি সমুদ্র বঙ্গোপসাগর। দক্ষিণে রয়েছে লবণের মাঠ।

‎চা বাগান

বাঁশখালীর পুকুরিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই চা বাগান। বাংলাদেশের সবুজ চা-পাতার গুণগত মানের দিক দিয়ে চট্টগ্রামের ৩য় অবস্থানে। প্রায় ৩,৪৭২.৫৩ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই চা বাগানটি ব্র্যাকের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। এখানে প্রায় ৭০০ একর জায়গায় চা পাতা উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিক্রয়ের কাজ চলে। বৈলগাঁও চা বাগানে চলতি বছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৫০ হাজার কেজি। চা-বাগানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে, প্রতিদিন ছুটে আসে নানা প্রান্তের মানুষ।

‎ইকো-পার্ক

বাঁশখালীর শীলকূপ ইউনিয়নে অবস্থিত বাঁশখালী ইকো-পার্ক। প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যম-িত উঁচু-নিচু পাহাড়। বাংলাদেশের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু। দুটি ছড়া, বামের ছড়া এবং ডানের ছড়া রয়েছে এই ইকো-পার্কে। ছড়াগুলো প্রায় লেকের মতো। নৌকায় চড়ে কাপ্তাই লেকের স্বাদ উপভোগ করা যায়। এখানে আরও আছে ওয়াচ টাওয়ার যেখান থেকে বঙ্গোপসাগর দেখা যায়। এখানে আরও আছে চিড়িয়াখানা আর কৃত্রিম লেক সেখানের মনোরম পরিবেশে দর্শনার্থীরা বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। বাঁশখালীর ইকো-পার্কের সৌন্দর্য যেকোনও পর্যটককে মুগ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। প্রতিনিয়ত পার্কটি দেখতে ছুটে আসে দেশের নানা প্রান্তের মানুষ।

‎সমুদ্র সৈকত

বাঁশখালী বাহারছাড়া ইউনিয়নে মিনি কক্সবাজার খ্যাত বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত। এখানে বসেই কক্সবাজার ভ্রমণের স্বাদ পাওয়া যাবে। এখানের বিশাল আঁচড়ানো ঢেউ আর বালিয়াড়ি বিচের কারণে দর্শনার্থীরা বিচটিকে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে ডাকে। গভীর সমুদ্রের আঁচড়ানো ঢেউ ঝাউ বাগানে বসেই এটি দারুণভাবে উপভোগ করা যাবে। বাঁশখালীতে “জলকদর” খালসহ অসংখ্য কুমারী ছড়াও রয়েছে এই ছোট্ট উপজেলায়।

‎আমেনা পার্ক

বাঁশখালী পৌরসভার পূর্বদিকে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে উঠেছে আমেনা পার্ক। এই পার্কটি পাহাড়ের উঁচু উঁচু এলাকা জুড়ে অবস্থিত। দৃষ্টিনন্দন কারুকাজের মাধ্যমে পার্কটি সাজানো হয়েছে। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাওয়ার জন্য নান্দনিক সিঁড়ি আর বসার জন্য সুসজ্জিত ছাতার মতো সিট রয়েছে। নিরিবিলি পরিবেশ, সবুজের সমারোহ, নানারকম ফলজ-বনজ গাছ আর বাহারি রঙের ফুলের গাছ। নানা রকম পাখির কলকাকলীতে দর্শনার্থীরা বেশ আনন্দ পায়। এই পার্কে আরও আছে দৃষ্টিনন্দন বাঘ, সিংহ, জেব্রাসহ বেশ কয়েকটি প্রাণীর ভাস্কর্য। পৌরসভার ভিতরে হওয়ায় ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের প্রচুর ভিড় হয়।

‎মিনি কাশ্মীর

বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়নে অবস্থিত সবুজেঘেরা উঁচু উঁচু পাহাড়, যা পর্যটকদের কাছে ‘বাংলাদেশের মিনি কাশ্মীর’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, বিশেষত পাহাড়গুলো ছন ক্ষেত ও বন্যপ্রাণীর জন্য পরিচিত হলেও সবুজে আচ্ছাদিত উঁচু পাহাড়ের দৃশ্য দর্শনার্থীদের মনে অন্য রকম প্রশান্তি এনে দেয়। এজন্য পাহাড় দেখতে প্রতিনিয়ত দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

‎বখশী হামিদ মসজিদ

বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক বখশী হামিদ মসজিদ। তথ্য-প্রামাণ্য অনুযায়ী, ৪৫০ বছর আগে নির্মিত হয় এটি। চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রাচীনতম মসজিদগুলোরও একটি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, হযরত বখশী হামিদ (রহ.) ছিলেন একজন সুফি ধর্মপ্রচারক। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি এ এলাকায় এসে পরবর্তীতে মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। প্রাচীন এই স্থাপনাটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এখানে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন পর্যটক আসে।

‎মালকাবানুর মসজিদ

বাঁশখালীর আরেকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন মালকাবানুর মসজিদ। একটি দীঘির পশ্চিম পাশে অবস্থিত এ মসজিদটি আজও অতীত ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। মোগল শাসনামলের শেষদিকে জমিদার আমির মোহাম্মদ চৌধুরী মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন ঐতিহ্যবাহী মালেকা বানু চৌধুরীর পিতা। প্রাচীন এই স্থাপনাটিও বাঁশখালীর পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

‎প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছোট্ট এই বাঁশখালীকে পর্যটন উপজেলা ঘোষণা এখন সময়ের দাবি। এই উপজেলাকে পর্যটন উপজেলা ঘোষণা করা হলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প খাতে বৃহৎ একটা আয়ের উৎস তৈরি হবে। পর্যটন বাঁশখালী ঘোষণার জন্য বাংলাদেশ সরকারের সুদৃষ্টি দরকার। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টা পেলেই পর্যটন উপজেলা হওয়ার যে স্বপ্ন বাঁশখালীর তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে, সে স্বপ্ন পূরণ হবে।