স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর : গাজীপুরে আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের প্রতিবিপ্লবের প্রথম শহীদ আবুল কাশেমের চিরশয্যা হয়েছে তার বাবার কবরের পাশে, বরই গাছের তলায়। গতকাল বৃহস্পতিবার বাদ জোহর জানাযা শেষে তাকে মহানগরীর গাছা থানাধীন বোর্ডবাজারের দক্ষিণ কলমেশ্বর এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সন্ত্রাসী হামলায় আহত হয়ে মৃত্যু : গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুর মহানগরীর সদর থানার ধীরাশ্রম দাক্ষিণখান এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রজনতা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা তাদের ঘেরাও করে মারধর করে ও কোপায়। এতে আবুল কাশেমসহ ১৭ জন আহত হন।
পুলিশ ও সেনাবাহিনী আহতদের উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। পরে গুরুতর আহত কাশেমসহ সাতজনকে ঢামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আবুল কাশেম (১৮)।
গাজীপুরে উত্তাল বিক্ষোভ : তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রজনতা বিক্ষোভ মিছিল বের করে, এতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গাজীপুর।
জনসমুদ্রে শেষ বিদায় : বুধবার রাত ১১টায় তার লাশ ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি দক্ষিণ কলমেশ্বরে পৌঁছায়। স্বজন ও এলাকাবাসী কান্নায় ভেঙে পড়েন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় গাজীপুর শহরের ভাওয়াল রাজবাড়ি মাঠে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এরপর বোর্ডবাজারের আল-হেরা ফিলিং স্টেশন মাঠে বাদ জোহর আরেকটি জানাযা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও বক্তব্য : জানাযায় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) কমিশনার ডা. মো. নাজমুল করিম খান, গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক জামাল উদ্দিন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশিদ, ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি সালাহ উদ্দিন আইউবী, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর মো. হোসেন আলী, বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান এলিস, প্রভাষক বশির আহমেদ, জেলা হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক মুফতি নাসির উদ্দিন ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী তৃণমূল মঞ্চের সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম বিকি প্রমুখ।
কাশেম হলেন আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের প্রতিবিপ্লবের প্রথম শহীদ : জিএমপি কমিশনার
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ড. মোঃ নাজমুল করিম খান বলেছেন, "কাশেম হলেন আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের প্রতিবিপ্লবের প্রথম শহীদ। তিনি ছিলেন অন্যায়ের প্রতিবাদকারী ছাত্র। তিনি বলেন, এই পরিকল্পিত হত্যার বিচার না হলে চব্বিশের বিপ্লব ব্যর্থ হবে। তিনি আরও বলেন, গত ১৫ বছর ধরে পুলিশকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এখন যারা জনগণের জন্য কাজ করবে, পুলিশ তাদের পক্ষে থাকবে। ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ তা প্রতিহত করবে।"
মহানগর জামায়াত আমীর : গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, ফ্যাসিবাদের মাথা পালিয়ে গেলেও তাদের দোসররা এখনো ষড়যন্ত্র করছে। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা ধ্বংসের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমরা জনগণ, রাজনৈতিক শক্তি, ছাত্রসমাজ ও সাংবাদিকরা মিলে এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করব। তিনি আরও বলেন, "যারা কাশেম হত্যার সাথে জড়িত, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
এসময় বক্তারা আবুল কাশেমের হত্যার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত বিচার দাবি করেন।
কাশেমের একমাত্র বোনের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলো ইসলামী ছাত্র শিবির: গাজীপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত আবুল কাশেমের পরিবারের সাথে গত বুধবার রাতেই সাক্ষাৎ করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য ও গাজীপুর মহানগরে সভাপতি রেজাউল ইসলাম। সাথে ছিলেন গাজীপুর মহানগরের ইসলামী ছাত্র শিবির ও জামায়াতের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
এসময় শহীদ আবুল কাশেমের একমাত্র বোন সুইটিকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয় এবং তার পড়াশোনার সকল দায়িত্ব ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বহন করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
হত্যা মামলা ও গ্রেপ্তার অভিযান : গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান, ৭ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের গাজীপুর জেলা আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মুহিম বাদী হয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি মামলা করেন। মামলায় ২৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে ২০০-৩০০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়েছে।
আবুল কাশেমের মৃত্যুর ফলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।