মুঃ শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)
একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট, বিল-ঝিল আর বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরজুড়ে ছিল গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ। ভোরের আলো ফুটতেই রাখালের বাঁশির সুরে গরুর পাল বেরিয়ে যেত মাঠের দিকে। সবুজ ঘাসে মুখ ডুবিয়ে চরত গরু, দূর থেকে ভেসে আসত ঘণ্টার মৃদু শব্দ। সন্ধ্যা নামার আগে আবার সেই পাল ফিরত গ্রামের পথে। দৃশ্যটি ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামীণ জীবনের এক চিরচেনা অংশ।
আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
সময়ের পরিবর্তনে গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাটের চেহারা বদলেছে। একসময় যে বিস্তীর্ণ জমি, চর, বিলের পাড় কিংবা পতিত জায়গা গবাদিপশুর বিচরণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেসব জায়গার অনেকটাই এখন কৃষিকাজ, বসতি, সড়ক কিংবা নানা প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কমে গেছে উন্মুক্ত গোচারণভূমি। আর গোচারণভূমি কমার সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক গবাদিপশু পালনের পরিসরও।
একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি সচ্ছল পরিবারের উঠানে গরু থাকা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। অনেক পরিবার এক-দুটি গরু পালন করে নিজেদের দুধের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি দুধ বিক্রি করত। কারও সংসারে গরু ছিল সঞ্চয়ের মতো সম্পদ, কারও কাছে ছিল পারিবারিক আয়ের অন্যতম উৎস। গৃহস্থের উঠান, গোয়ালঘর আর পাশের সবুজ মাঠ—সব মিলিয়ে গবাদিপশুকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক স্বাভাবিক গ্রামীণ জীবন।
সেই জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল খাঁটি দুধের স্বাদ।
সকালে দুধ দোহনের পর মাটির হাঁড়ি কিংবা পিতলের পাত্রে দুধ নিয়ে বাড়ি বাড়ি যেতেন স্থানীয় দুধওয়ালারা। কোথাও সেই দুধ থেকে তৈরি হতো দই, কোথাও ছানা। আবার সেই ছানা দিয়ে কারিগরের হাতে তৈরি হতো সন্দেশ, রসগোল্লা, ছানার পায়েসসহ নানা মিষ্টান্ন। গ্রামবাংলার মিষ্টির স্বাদে ছিল দুধের স্বাভাবিক ঘ্রাণ ও ছানার নিজস্ব কোমলতা।
আজকের ব্যস্ত জীবনে সেই ঐতিহ্যও যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।
গবাদিপশু পালনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে খাদ্য ও ব্যয়ের জায়গায়। আগে মাঠের সবুজ ঘাস ছিল গরুর অন্যতম প্রধান খাদ্য। এখন অনেক ক্ষেত্রেই গরুর খাদ্যের জন্য খড়, ভুসি, দানাদার খাবার ও বাজারনির্ভর নানা উপকরণের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে গরু পালন মানেই বেড়েছে নিয়মিত ব্যয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পশুচিকিৎসা, শ্রম ও পরিচর্যার খরচ।
ফলে অনেক পরিবার আগের মতো গরু পালন করতে আগ্রহী হচ্ছে না।
অন্যদিকে জমির মালিকানার ধরন ও ব্যবহারও বদলেছে। কৃষিজমি এখন ফসল উৎপাদনের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। বসতি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে খোলা জায়গার পরিমাণও কমছে। ফলে গবাদিপশু নিয়ে মাঠে যাওয়ার সুযোগ কমেছে। কোথাও আবার গরু চরাতে গেলে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কৃষক ও গৃহস্থের মধ্যে বিরোধও তৈরি হয়।
এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে একটি স্বাভাবিক গ্রামীণ ব্যবস্থা।
গোচারণভূমি শুধু গরুর ঘাস খাওয়ার জায়গা নয়; এটি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির একটি নীরব ভিত্তি। একটি পরিবারের গরুকে কেন্দ্র করে দুধ বিক্রেতা, গোখাদ্য সরবরাহকারী, রাখাল, দুধ সংগ্রহকারী, ছানা প্রস্তুতকারী ও মিষ্টির কারিগর—অনেক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল। গবাদিপশু পালন কমে গেলে এই পুরো অর্থনৈতিক শৃঙ্খলেই তার প্রভাব পড়ে।
সবচেয়ে বেশি আঘাত লাগে ঐতিহ্যে : চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামবাংলায় দুধ ও ছানার তৈরি মিষ্টির যে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ছিল, তার সঙ্গে মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে। কোনো বাড়িতে নতুন অতিথি এলে দুধের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন, উৎসব-পার্বণে ছানার তৈরি মিষ্টি, কিংবা গ্রামের কোনো পরিচিত কারিগরের হাতে তৈরি বিশেষ মিষ্টি -এসব ছিল সামাজিকতারও অংশ।
এখন বাজারে মিষ্টির বৈচিত্র্য বেড়েছে, আধুনিক উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা এসেছে। কিন্তু বৈচিত্র্য বাড়লেও অনেকের মনে প্রশ্ন -আগের সেই স্বাদ কোথায়?
স্বাদের এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু মিষ্টির কারিগরকে দায়ী করলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িত গোটা উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তন। খাঁটি দুধের পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য জোগান, দুধের মান, সংরক্ষণব্যবস্থা, ছানা তৈরির পদ্ধতি এবং বাজারজাতকরণ -সবকিছু মিলেই একটি ভালো মিষ্টির ভিত্তি তৈরি হয়। সেই ভিত্তির একটি বড় অংশ হলো স্থানীয় দুগ্ধ উৎপাদন।
তাই খাঁটি দুধের স্বাদ ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু মিষ্টির দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না; ফিরে তাকাতে হবে মাঠের দিকেও।
প্রয়োজন পরিকল্পিত গোচারণভূমি সংরক্ষণ। যেখানে সম্ভব সরকারি ও খাস জমি চিহ্নিত করে স্থানীয়ভাবে গবাদিপশুর জন্য নির্ধারিত চরাঞ্চল বা ঘাসের মাঠ গড়ে তোলা যেতে পারে। কৃষিজমির সঙ্গে সমন্বয় করে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে গোচারণ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। খামারিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, উন্নত গোখাদ্য, নিয়মিত পশুচিকিৎসা এবং দুধের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে গবাদিপশু পালন আবারও লাভজনক হতে পারে।
একই সঙ্গে স্থানীয় দুধ, ছানা ও মিষ্টান্নকে ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা দরকার। ভালো মানের স্থানীয় পণ্যকে পরিচিত করে তুলতে পারলে এর বাজার বাড়বে। এতে একদিকে ঐতিহ্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ।
কারণ একটি জনপদের ঐতিহ্য তখনই বেঁচে থাকে, যখন তার সঙ্গে মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির সম্পর্ক থাকে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামবাংলার মাঠে গরুর পাল ফিরে আসা মানে শুধু একটি পুরোনো দৃশ্য ফিরে আসা নয়। এর অর্থ -গ্রামীণ অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় অংশকে পুনরুজ্জীবিত করা। এর অর্থ- দুধ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখা। এর অর্থ-স্থানীয় ছানা ও মিষ্টির ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
আজ প্রয়োজন উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা। মাঠ থাকবে, কৃষিও থাকবে; বসতি ও উন্নয়নও হবে- কিন্তু তার পাশাপাশি গবাদিপশুর জন্য প্রয়োজনীয় জায়গাটুকুও রক্ষা করতে হবে। কারণ সবুজ মাঠ কেবল ফসলের জন্য নয়, গ্রামীণ জীবনেরও অংশ।
একদিন হয়তো আবার কোনো ভোরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো গ্রামের মাঠে দেখা যাবে গরুর পাল। রাখালের হাতে থাকবে বাঁশি, শিশুরা দূর থেকে দেখবে সেই দৃশ্য। কোনো গৃহস্থের উঠানে দুধ দোহন হবে। সেই দুধ থেকে তৈরি হবে ছানা। আর স্থানীয় কারিগরের হাতে সেই ছানা ফিরে পাবে মিষ্টির রূপ।
তখন হয়তো মানুষ আবার বলবে -এ স্বাদ শুধু মিষ্টির নয়, এ স্বাদ মাটির; এ স্বাদ হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার।
মাঠ হারালে শুধু গোচারণভূমি হারায় না; হারায় একটি জনপদের জীবনযাত্রার স্মৃতি। আর গোচারণভূমি হারালে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় গরু পালন, খাঁটি দুধ, ছানা ও মাটির ঘ্রাণমাখা মিষ্টির সেই পুরোনো ঐতিহ্য।
তাই মাঠ বাঁচাতে হবে, গোচারণভূমি বাঁচাতে হবে। কারণ মাঠ বাঁচলেই ফিরে আসতে পারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের হারিয়ে যাওয়া দুধের স্বাদ।