পিরোজপুরে সংবাদদাতা : পরিবারিক সূত্রে জানা যায়, পিরোজপুর পুলিশ লাইনস এলাকায় কর্মকর্তাদের একটি আবাসিক মেসে অস্থায়ী কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন ইউনুস ফকির। ওই মেসের একটি কক্ষে থাকতেন পিরোজপুর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলাম। ঐ কক্ষের দুটি চাবির একটি চাবি ইউনুস ফকিরের কাছে ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে আরিফুল ইসলাম হঠাৎ ইউনুসের কাছে থাকা চাবি ফেরত চান। চাবি দিতে ব্যর্থ হলে তাকে জানানো হয়, তার কক্ষ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে এবং ইউনুসই এ চুরির সঙ্গে ইউনুস জড়িত। ইউনুস অভিযোগ অস্বীকার করলে তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিচতলায় নিয়ে মারধর করা হয়। পরবর্তীতে আরও কয়েকজন ডিবি সদস্য এসে তাকে মারধর, বৈদ্যুতিক শক এবং শারীরিক নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ করে তার পরিবার। একপর্যায়ে তাকে জোর করে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে গোপনাঙ্গে গলিত মোম ঢেলে দেয়। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের এক পর্যায়ে ইউনুসের স্বজনরা টাকা জোগাড় করে অভিযুক্তদের হাতে তুলে দেন। পরে পিরোজপুরের জেলা পুলিশ সুপারের কাছে বিষয়টি জানানো হলে তিনি মেসের অন্য এক কর্মচারী শাকিলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শাকিল চুরির কথা স্বীকার করেন এবং টাকা ফেরত দেন। পরবর্তীতে ইউনুসের দেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যরা আরো জানান, ঘটনাটি গোপন রাখতে প্রথমে তাকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি না করে একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকদের কাছেও প্রকৃত ঘটনা বলতে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরদিন (১৪ এপ্রিল) পুলিশ সুপারের নির্দেশে তাকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও নির্যাতনের প্রকৃত ঘটনা গোপন রাখতে ইউনুসকে ভিন্ন বক্তব্য দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।
ইউনুসের ভাই আনিসুর রহমান বলেন, “আমার ভাইয়ের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা চরম অমানবিক। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ডিবি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, তিনি বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন এবং এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগ। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মজনুর আহম্মেদ সিদ্দিকি বলেন, “বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একইসঙ্গে ডিবির ওসি আরিফসহ দুই কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) ইউনুসের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. স্বাগত হাওলাদার জানান, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং পুরুষাঙ্গে পোড়ার আলামত পাওয়া গেছে।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিক মহল আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক এ ধরনের অমানবিক কাজের ব্যাপারে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। নতুবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না।