এক সময়ে কাঁসা পিতল শিল্পের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও আধুনিকতার ছোঁয়ায় এ শিল্প বিলুপ্তির পথে। হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার ঐতিহ্য পিতল-কাঁসা শিল্প। নিত্য নতুন সিরামিক, মেলামাইন, কাঁচ ইত্যাদির সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ পিতল-কাঁসার ব্যবহার একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন। নিকট অতীতেও পিতল-কাঁসা সামগ্রী গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিত্য ব্যবহৃত হিসেবে দেখা যেতো। বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ার সাথে সাথে এসবের ব্যবহারে ভাটা পড়েছে। ফলে এ শিল্পের সাথে জড়িত শিল্প পরিবারগুলোরও দূর্দশার শেষ নেই। কুষ্টিয়া শহরে ২০/২৫ টি কাসা পিতল কারখানা থাকলেও তা বন্ধের পথে।

মেলামাইনের কারণে কাঁসা-পিতল শিল্প বিলুপ্ত হতে চললেও এ ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে ধরে রেখেছে কুষ্টিয়ার বেশ কিছু কাঁসা পিতল কারখানার মালিকরা।

বিয়ের অনুষ্ঠান, জন্মদিনের উপহার, অতিথি আপ্যায়নে কাঁসা পিতল শিল্পের তৈরি সামগ্রীর কোন বিকল্প ছিলনা। জামাই ও আত্মীয় স্বজনদের কাসার পাত্রে খেতে না দিলে তাদেরকে অপমান করা হয়েছে বলে মনে করা হতো। তখনকার চাহিদার আলোকে কুষ্টিয়ায় গড়ে ওঠে ২৫/৩০টি কাসা পিতল কারখানা।

কুষ্টিয়া শহরের গড়াই নদীর ধারে বড় বাজার ঘোড়া ঘাটের পাশ দিয়ে পথচারী যাওয়ার সময় কাঁসা পিতল তৈরি কারখানার বড় বড় হাতুড়ির ঠাস ঠাস শব্দে মানুষ কানে আঙুল দিয়ে হাঁটতো। কাঁসা-পিতল কারিগরদের হাতুড়ি আর যন্ত্রপাতির টুং টাং শব্দে যেন কানে তালা লেগে যেত।

এক সময়ে কুষ্টিয়ার উৎকৃষ্ট মানের সামগ্রী থালা, কলসি, ড্যাগ, জগ, বালতি, কড়াই, বদনা, ঘটি বাটিসহ নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীর সুনাম ছিল দেশ জুড়ে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মেলামাইন তৈরি হওয়ায় কদর কমেছে এ শিল্পের তৈজষপত্রের।

প্রয়োজনীয় পূজির অভাব, কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, কাঁসা-পিতলের আসবাবপত্র ব্যবহারে মানুষের অনীহাসহ বিভিন্ন কারণে শত বছরের ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে কুষ্টিয়ার ২৫/৩০টি কাসা পিতল কারখানা। এর পরও অনেকেই টিকে আছে এ পেশায়।

বাজারে কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্রের কদর কমে যাওয়ায় মালিকরা কারখানা গুটিয়ে নিয়েছে। এখন মাত্র কয়েকটি কারখানা রয়েছে। এখানে কাজ করে এখন আর তেমন আয় হয়না। যে টাকা আয় হচ্ছে তা দিয়ে সংসার চলছে খুবিই কষ্টে।

বর্তমানে কাঁচামালের সংকট থাকায় বাহির থেকে কাঁচামাল আসছেনা। ফলে কাজ কমে গেছে। যত টুকু কাঁচামাল আমদানী করা হচ্ছে তা দিয়ে কোন রকমে কাজ চলছে।

প্রায় ২৬/২৭ বছর ধরে এই কাঁসা-পিতল শিল্পের সাথে জড়িত। এক সময় এই শিল্পের কদর ছিল। বর্তমানে মেলামাইনের তৈজসপত্র বাজারে আসায় কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্রের কদর আর নেই। আগে শত শত শ্রমিক এই কাসা শিল্পে কাজ করে ভালোভাবে সংসার চালালেও এখন আর আয় না থাকায় শ্রমিকরা পেশা ছেড়ে দিয়েছে।

কাসা-পিতলের কাচামাল একস্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া হলে পথের মাঝে পুলিশ-বিডিআর-এর ঝামেলার কারনে কাচা মাল সংগ্রহে হিমসিম খেতে হয়। তাছাড়া কাসা-পিতলের তৈজসপত্র পাশ্ববর্তী ভারতে পাচার হওয়ায় এ শিল্প চরম ভাবে বাধা গ্রস্থ হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার তৈরী কাঁসা-পিতল উন্নতমানের হলেও তা বাহিরে পাঠানো সম্ভব হচ্ছেনা। যে কারনে এই ব্যবসা দিনদিন ধবংশ হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি এ শিল্পের উপর একটু সহযোগীতা করতো তা হলে পুরাতন এ পেশা আবারও ফিরে পেত তার যৌবন।

কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার মধ্যবাজারে অবস্থিত তামা কাঁসার ও পিতলের দোকান মালিক বিপুল পাল বলেন, আমি ছোট কাল থেকেই এই ব্যবসার সাথে জড়িত আছি। বর্তমানে বেচাকেনা কম হয় তারপরও পুরাতন ঐতিহ্য ব্যবসা ছাড়তে পারি না। বিদেশী পর্যটকরা এক সময়ে কাঁসা-পিতলের মধ্যে কারুকাজ খচিত বিভিন্ন দেবদেবী ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যেতো। কিন্তু এই পিতল-কাঁসা শিল্পের ঐতিহ্য আজ নানা সমস্যার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সাথে জড়িত শিল্পী ও ব্যবসায়ীরা বর্তমানে অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছে। তাদের দেখারও কেউ নেই।

কাঁসার তৈজসপত্র আমাদের ঐতিহ্য ও বাঙালী সামাজিক জীবনের অন্যতম কালচারের অংশ। বাঙালির গৃহস্থালি ও কৃষ্টির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে তামা, কাঁসা ও পিতলশিল্প। একসময় বিয়ে, খৎনা, জন্মদিন, আকিকা প্রভৃতি অনুষ্ঠানে প্রধান উপহার সামগ্রী ছিল কাঁসার গ্লাস, বাটি, ফুলদানি, চামচ, রেকাব শানকে, গামলা, বেলিবগি, পানদানি, থালা, পিতলের টব, কলসি, বালতি, কড়াই, পানের থালা, ধূপদানি, তামার কলস, হাঁড়ি-পাতিল, পুষ্পপাত্র ইত্যাদি। যেকোনো অনুষ্ঠানেও দেওয়া হতো নাম খোদাই করা এসব কাঁসার। সেসব উপহার স্থান দখল করে নিয়েছে আধুনিক ডিজাইনের চীনামাটি, পাইরেক্স, মেলামাইন, প্লাস্টিক, কাঁচ ও স্টিল। কাঁচামাল কারিগরের অভাবে বাংলা ঐতিহ্য তামা, কাঁসা ও পিতলশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে।

কাঁসা ও পিতলের অপূর্ব শিল্প কর্মের জন্য ব্রিটিশ সরকার কাঁসা শিল্পীদের মধ্যে নাম করা অনেককেই প্রশংসা ও পদকে ভূষিত করেছেন। এদের মধ্যে প্রয়াত মধুসূদন কর্মকার, গণেশ কর্মকার, বসন্ত কর্মকার, যোগেশ কর্মকার, হারান কর্মকার উল্লেখযোগ্য।

কাঁসা একটি মিশ্র ধাতব পদার্থ। বাংলায় এ মিশ্র ধাতব শিল্পটি কখন, কোথায় শুরু হয়েছিল, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়না।

তবে শিল্প গবেষক ও নৃবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ একে পাহাড়পুর মহাস্থানগড় সভ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চান। এই শিল্পকে রামায়ণ-মহাভারতের যুগের বলেও মনে করেন অনেক অভিজ্ঞ লোকশিল্পী। বংশগত পেশায় কাঁসার শিল্পী প্রয়াত যোগেশ চন্দ্র কর্মকার মনে করতেন, রামায়ণ-মহাভারতের জীবনচর্চায় পূজা-পার্বণে কাঁসার তৈরি ঘটি-বাটি বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহারে তিনি এ ধারণা পোষণ করতেন।

১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল শাসনামলে এ দেশে তামা, কাঁসা ও পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। এসব ধাতু দিয়ে তারা ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক, বন্দুক ও কামান তৈরি করত। ব্রিটিশ শাসনামলে এ শিল্পের প্রসার ঘটে এবং বাংলার ঘরে ঘরে এর ব্যবহার খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর এ শিল্পের ছোট-বড় বহু কারখানা গড়ে ওঠে।

নৃবিজ্ঞানীদের তথ্যসূত্রে জানা যায়, এ শিল্পের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সে সময়ের রাজা প্রদ্যুৎ কুমার ঠাকুর। তিনি প্রথম এই হস্তশিল্পের সামগ্রী নিজে ব্যবহার করেন এবং বিভিন্ন রাজা-বাদশা থেকে শুরু করে লন্ডনের রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত এ স্বর্ণোজ্জ্বল রাজকীয় নকশার ডিনার সেট উপঢৌকন হিসেবে রাজপরিবারে পাঠিয়েছিলেন।

১৯৪২ সালে লন্ডনের বার্মিংহাম শহরে সারা বিশ্বের হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সে প্রদর্শনীতে কাঁসার বাসন দর্শকের বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর ফলে শিল্পী জগৎচন্দ্র কর্মকার তাঁর হাতে গড়া তৈজসপত্রের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ কাঁসাশিল্পী হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন। এতে করে সারা বিশ্বে কাঁসাশিল্পের পরিচিতি লাভ করে এর চাহিদা দিন দিন আরও বেড়ে যায়।

অপরদিকে, বিজ্ঞ হেকিম চিকিৎসকরা কাসা পিতলের তৈজসপত্রের বহু গুণাগুন ও উপকারিতার কথা উল্লেখ করেছেন।

তারা বর্ননা করেছেন, রান্নার কাজে কাঁসা, পিতল ও তামার পাত্র ব্যবহার সুস্থ জীবন ধারণের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

কাঁসার ক্ষারীয় বৈশিষ্ট্য খাদ্যের অম্লতাকে প্রশমিত করে। ফলে পানি বা খাদ্যে থাকা পানির পিএইচের (পটেনশিয়াল অফ হাইড্রোজেন) স্তর উন্নত হয়। এই পিএইচ মূলত পানির দ্রবণে অম্ল বা ক্ষারের উপস্থিতি নির্ণয়ের মাপকাঠি। এভাবে রান্না করা খাবারটি বিশুদ্ধ হয়ে হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে।

কাঁসা এমন একটি সংকর ধাতু যাতে যথেষ্ট পরিমাণে তামা থাকে, যেটি চর্বি ভেঙে ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এটি রান্নায় অতিরিক্ত চর্বি ও তেলের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে খাবারের সর্বত্রে সমানভাবে তাপ বিতরণ করে।

কাঁসার ভেতরে থাকা তামা শরীরের সবখানে রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। ফলে কালশিটে পড়া পেশি, ব্যথা হওয়া জয়েন্টগুলো এবং এমনকি আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রেও ভালো বোধ হয়।

সারারাত ধরে কাঁসার পাত্রে পানি সংরক্ষণ করা হলে পানিতে একাধিক পুষ্টি যোগ হয়। এই পানি পানের মাধ্যমে শরীরে শক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়ক পুষ্টিগুলোর চাহিদা পূরণ হয়।

হেকিমগন আরও বলেন, পিতল এমন একটি সংকর ধাতু যেখানে যথেষ্ট পরিমাণে দস্তার উপস্থিতি বিদ্যমান। দস্তা প্রদাহ কমাতে, দ্রুত ক্ষত নিরাময়, কোষের বৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এটি নিরবচ্ছিন্ন বিপাকের ক্ষেত্রেও সহায়ক। তাই শরীরে দস্তার ঘাটতি থাকলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পাশাপাশি পিতলের তৈজসপত্রে রান্না করা বা খাবার খাওয়া শুরু করা যেতে পারে।

ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া এবং রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবের বিরুদ্ধে পিতল বেশ কার্যকর। অন্যান্য পাত্রের তুলনায় পিতলের পাত্রগুলো খাবারকে দীর্ঘ সময়ের জন্য উষ্ণ রাখে। ফলে রান্না করা খাদ্য যে কোনো সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে।

অম্লত্ব হ্রাস করার মাধ্যমে গ্যাস্ট্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো বিভিন্ন ধরনের হজমের সমস্যা মোকাবিলায় সহায়তা করে। ফলে পাকস্থলী পরিষ্কার হয়ে পুষ্টি শোষণ ক্ষমতা বাড়ে এবং অন্ত্রের সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে।

সবমিলিয়ে একদিকে জনগণের চাহিদা, অপরদিকে কাসা পিতলের তৈজসপত্রের উপকারিতা সামনে রেখেই কাসা ও পিতলের তৈজসপত্রের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এ কারণেই গড়াই নদীর ধারে কুষ্টিয়ার ঘোড়াই ঘাটে গড়ে উঠেছিল ২৫ টি কাসা পিতলের কারখানা। কালের পরিক্রমায় আধুনিকতার ছোয়ায় তা হারিয়ে যেতে বসেছে।

কুষ্টিয়ার কাঁসা-পিতল কারখানার মালিক আশরাফ উদ্দিন জানায়, কাসার তৈরী থালা, বাটি, ঘরা, জগ, ড্যাগ, চামচ এর কদর এখনো রয়েছে। মেলামাইনসহ অন্যান্য শিল্পে সরকার যেভাবে সাহায্য সহযোগীতা করছে তেমনি ভাবে কাসা পিতল শিল্পে সহযোগীতা করলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

মেলামাইনের কারণে ও অন্যান্য সমস্যার কারণে বন্ধ হওয়ার পথে এ শিল্প। এ শিল্পে যদি প্রয়োজনীয় পৃষ্টপোষকতা না দেওয়া যায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে কাঁসা-পিতল শিল্পের ব্যবহার একেবারেই শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। তাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারী পৃষ্টপোষকতা প্রয়োজন বলে ব্যবসায়ীরা অভিমত প্রকাশ করেন।