শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা: সাতক্ষীরা জেলার উপকূলবর্তী জনপদ শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের বংশীপুর গ্রামে প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন বংশীপুর শাহী মসজিদ কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। এই মসজিদ কেবল ইবাদতের জায়গা নয়, বরং ইসলামী স্থাপত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব স্মারক।

শ্যামনগর উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বংশীপুর বাজারের উত্তর পাশে মসজিদটির অবস্থান। স্থানীয়ভাবে এটি টেঙ্গা মসজিদ’ নামেও পরিচিত। মসজিদের প্রাচীনতা, গঠনশৈলী ও ইতিহাস বহুদিন ধরেই ইতিহাস-অনুরাগীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

ইতিহাসবিদদের মতে, ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে বা সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে মসজিদটি নির্মিত হয়। অনেকে বিশ্বাস করেন, মুসলিম সেনাদের নামাজের ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে রাজা প্রতাপাদিত্যের বিশ্বস্ত সেনাপতি খাজা কামাল মসজিদটির পত্তন করেন। অনেকে এটিকে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে নির্মিত বলে ধারণা করেন। ‘ টেঙ্গা’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ অস্থায়ী ছাউনি। প্রথমে এটি একটি অস্থায়ী কাঠামো ছিল, যা কালের বিবর্তনে পাকা স্থাপনায় রূপ নেয় এবং কালক্রমে পরিচিতি পায় শাহী মসজিদ নামে।

১৩৩ ফুট ৯ ইঞ্চি দীর্ঘ ও ৩২.৫ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট মসজিদটির নির্মাণশৈলীতে স্পষ্টভাবে মুঘল স্থাপত্যের ছাপ পরিলক্ষিত হয়। পাঁচটি গম্বুজ, অলংকৃত মিহরাব, খাঁজকাটা দরজা ও কারুকার্যযুক্ত দেয়াল মসজিদের স্থাপত্য-ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। নির্মাণে ব্যবহৃত ইটগুলোর গঠন ও গাঁথুনি যশোরেশ্বরী মন্দির ও ধুমঘাট রাজপ্রাসাদের নির্মাণশৈলীর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা মসজিদটির সম্ভাব্য নির্মাণকাল ও ঐতিহাসিক পটভূমিকে সমর্থন করে।

মসজিদটি দীর্ঘ সময় মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল। বিশ শতকের গোড়ায় স্থানীয় মুসল্লিরা এটি আবিষ্কার করেন। পরবর্তী সময়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিকল্পনাহীন সংস্কারের ফলে মসজিদের প্রাচীন ও মৌলিক অনেক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। কারুকাজখচিত ইটের গাঁথুনি ঢেকে যায় সিমেন্ট-বালির প্লাস্টারে, গম্বুজের নিচের অলংকরণ লোপ পায়, বসানো হয় টাইলস ও এসি।

এই সংস্কার মসজিদকে ব্যবহারোপযোগী করে তুললেও ঐতিহাসিক মূল্য কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়। তবে আজও মসজিদের মূল কাঠামো ইতিহাসের গৌরব বহন করছে। -হুসাইন বিন আফতাব