খুলনা ব্যুরো
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক হাসপাতাল। ছয়তলা দৃষ্টিনন্দন ভবন, প্রশস্ত অভ্যন্তরীণ সড়ক, বিদ্যুৎ সংযোগ- সবই আছে। অথচ হাসপাতালের ভেতরে নেই কোনো রোগী, নেই চিকিৎসক-নার্সের ব্যস্ততা, নেই জরুরি বিভাগের সেবা। আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। কোথাও নেই প্রধান ফটক, নেই পূর্ণাঙ্গ সীমানাপ্রাচীর। পড়ে আছে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো। এ চিত্র খুলনা বিভাগীয় সরকারি শিশু হাসপাতালের। খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়কের পাশে কেডিএর ময়ূরী আবাসিক এলাকা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যবর্তী স্থানে প্রায় পাঁচ একর জমিতে নির্মিত হাসপাতালটি ২০২৪ সালের জুনেই নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার দুই বছর পার হতে চললেও আজও শুরু হয়নি চিকিৎসাসেবা। অথচ চলতি বছরের জুলাইয়ে সরকার হাসপাতালটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশেষায়িত হাসপাতাল’ ঘোষণা করেছে। এদিকে, গত জুনে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, খুলনা ও বরিশালের ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল দু’টি আগস্টের প্রথম দিকে চালুর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও জুলাইয়ের মধ্যে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু আগস্ট শেষ হলেও খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতালটি চালু হয়নি। ফলে একদিকে পড়ে আছে সরকারি অর্থে নির্মিত বিশাল হাসপাতাল, অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিশু রোগীদের চিকিৎসার চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে খুলনার একমাত্র বেসরকারি শিশু হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগ।
সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রায় ৪ দশমিক ৮০ একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় ৫২ কোটি দুই লাখ টাকা। এরপর ২০২০ সালে হাসপাতালের বেজমেন্ট ও একতলা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ের কাজে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৬ কোটি টাকা। পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা নির্মাণ, রান্নাঘর, সাবস্টেশন, পাম্প হাউজ, সড়ক, ড্রেন ও গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। অর্থাৎ জমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পের প্রথম ধাপেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। এ ধাপে পাঁচতলা পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্ণ প্রকল্পে ভবনটি ১০ তলা করে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তর খুলনা-১-এর সূত্র জানায়, প্রথমে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ দেখানো হয়।
গণপূর্ত বিভাগ খুলনা-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান বলেন, “ইতোমধ্যেই হাসপাতালটি খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের।” খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, হাসপাতালটির প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। লোকবলের বাজেটও করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সীমিত জনবল এনে আউটডোর চালু করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ জনবল দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ২০০ শয্যার প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। চাহিদা দেওয়া হয়েছিল এক হাজার জনবলের। কিন্তু প্রাথমিকভাবে তিন শতাধিকের কম জনবল অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন হয়ে গেলে আউটডোর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।
ডা. মোশাররফ হোসেন বলেন, “খুলনায় একটি বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল অত্যন্ত প্রয়োজন। এ হাসপাতাল চালু হলে খুলনা বিভাগের শিশুদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।”