মোঃ ফিরোজ আহমেদ (পাইকগাছা)
দক্ষিণ পশ্চিমঞ্চলের জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট অঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে মহিষ। বর্ষা সময় পাইকগাছা, কয়রা, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর, দাকোপ, বটিয়াঘাটা বিল-খালজুড়ে দেখা যেত মহিষের পাল। দল বেঁধে পানিতে নামা, বিলের ঘাস খাওয়া কিংবা কৃষকের জমিতে হালচাষ গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল মহিষ পালন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চেনা দৃশ্য এখন প্রায় বিলুপ্তের কথা। খাদ্য ও পানির সংকট, খাল-বিলে মাছের ঘের, রোগবালাই এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার সব মিলিয়ে এই অঞ্চল থেকে ঐতিহ্যবাহী মহিষ পালন এখন বিলুপ্তির পথে। পাইকগাছা, কয়রা, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর, দাকোপ, বটিয়াঘাটা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে জানা গেছে, একসময় গ্রামের অধিকাংশ সচ্ছল কৃষক পরিবারেই পারিবারিক ভাবে মহিষ পালন করা হতো। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বিল ও খালে ছেড়ে দেওয়া হতো মহিষের পাল। পর্যাপ্ত পানি ও ঘাস থাকায় খুব বেশি খরচ ছাড়াই মহিষ পালন করা সম্ভব হতো। দুধ ও মাংসের পাশাপাশি কৃষিকাজে হালচাষের জন্যও মহিষের ছিল আলাদা কদর।
কৃষকেরা জানান, তখন পাওয়ার টিলার বা আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার ছিল না। মহিষ দিয়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টানা হালচাষ করা যেত। এতে কৃষকের খরচও তুলনামূলক কম হতো। ফলে কৃষি ও পারিবারিক অর্থনীতিতে মহিষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। খাল-বিলে পানি ও প্রাকৃতিক ঘাসের সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক জলাশয় ও বিল মাছের ঘেরের আওতায় চলে যাওয়ায় সেখানে গরু-মহিষ নামানোর সুযোগও নেই। অন্যদিকে বাজার থেকে মহিষের খাবার কিনে পালন করাও অনেক কৃষকের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা ব্যয় ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে এখন হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে মহিষ পালন করছে। অনেক পরিবারের খামারে যেখানে একসময় ২০-৩০টি পর্যন্ত মহিষ ছিল, সেখানে এখন একটি মহিষও নেই। কপিলমুনি ইউনিয়নের রেজাকপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. লেয়াকাত আলী বলেন, “একসময় আমাদের ২০ থেকে ৩০টি মহিষ ছিল। এ গ্রামে অনেক পরিবারই মহিষ পালন করত। এখন আমাদের পরিবারে মহিষ তো দূরের কথা, কোনো গরুও নেই। খাবার ও পানির অভাবে গরু-মহিষ পালন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মহিষের খাবার কিনে খাওয়ানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, একটি মহিষের প্রতিদিন প্রচুর খাবার ও পানির প্রয়োজন হয়। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা করা কঠিন। আধুনিক কৃষিযন্ত্রের কারণে মহিষ দিয়ে হালচাষও বন্ধ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে মহিষ পালন দিন দিন কমে যাচ্ছে। চাঁদখালী ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দা সবুজ বলেন, “আগে বিল-বাওড় খোলা ছিল। ইচ্ছেমতো সেখানে মহিষ ছেড়ে দিতাম। এখন খাল-বিলে মাছের লিজ ঘের ও লোনাপানির মাছ চাষ হচ্ছে। সেখানে গরু-মহিষ নামতে দেওয়া হয় না। ফলে আগের মতো পানি ও ঘাস না থাকায় আমরা মহিষ পালন ছেড়ে দিয়েছি।”
একই এলাকার বাসিন্দা হানিফ মোড়ল বলেন, “মহিষ পালন করলে লাভ করা সম্ভব। এক বছর বয়সী একটি মহিষের বাচ্চা ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। একটি মহিষ থেকে প্রতিদিন ৫-৬ কেজি পর্যন্ত দুধ পাওয়া সম্ভব। আবার জবাই করলে ভালো পরিমাণ মাংসও পাওয়া যায়। তারপরও খাবার, পানি ও চিকিৎসার সংকটের কারণে অনেক কৃষক মহিষ পালন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।”
স্থানীয় পশু চিকিৎসক সুকুমার ভদ্র বলেন, “গড়ইখালী ইউনিয়নে এখন হাতে গোনা তিন-চারটি পরিবারে মহিষ পালন করতে দেখা যায়। খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা গেলে কৃষকদের মধ্যে আবারও মহিষ পালনের আগ্রহ তৈরি হতে পারে।”
সাউথ খুলনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যান ইসলাম মেজর মেসবাহুল ইসলাম বলেন একটি প্রাণী পালন নয়, মহিষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপকূলীয় এলাকার পুরোনো কৃষি ও গ্রামীণ সংস্কৃতির ইতিহাস। পরিকল্পিত ভাবে খাল-বিলের পরিবেশ রক্ষা, পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা, সহজলভ্য পশুচিকিৎসা এবং কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া গেলে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্য আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নইলে সময়ের স্রোতে দক্ষিণ পশ্চিমঞ্চলের অনেক উপজেলার বিল-খালে মহিষের পালন, কৃষকের হালচাষ আর সেই চিরচেনা গ্রামীণ দৃশ্য শুধু স্মৃতির পাতাতেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।