এম, এ জাফর লিটন, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : সিরাজগঞ্জ-৬ শাহজাদপুর আসনে বিএনপি ও জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর মাঠে সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের। বিএনপি-জামায়াত, এবি পার্টি, গণঅধিকার, জাতীয় নাগরিক পার্টি ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলের তৎপরতা নেই। বিএনপি থেকে একাধিক ব্যক্তি দলীয় মনোনয়ন চেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী চুড়ান্ত হয়েছে। বিএনপিতে দলীয় মনোনয়ন যুদ্ধে কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে তৃণমূলে বিভেদ এখন তুঙ্গে। সম্প্রতি বিএনপির দুপক্ষের প্রকাশ্যে সংঘর্ষ ও সংঘাতের পরই বিএনপি মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা ড এম এ মুহিত স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম সারোয়ারের দলীয় পদ স্থগিত করে। ফলে গৃহবিবাদ প্রভাব পড়েছে তৃণমূলেও।
শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে সিরাজগঞ্জ-৬ আসন গঠিত। দেশের বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদন কারখানা (মিল্কভিটা), উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম বাঘাবাড়ী নদী বন্দর,তাঁত শিল্প, বৃহত্তম কাপড়ের হাট, রবীন্দ্র বিশ¦িদ্যালয় এই আসনে অবস্থিত। তাই মর্যাদা ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সকল রাজনৈতিক দলের কাছে আসনটির গুরুত্ব বেশি। বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি দুইবার, জাতীয় পার্টি ২ বার, স্বতন্ত্র একবার, চারদলীয় ঐক্যজোট একবার বিজয়ী হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বদলে গেছে শাহজাদপুরের মাঠের রাজনীতির হালচাল। আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা ভোটের মাঠে নেই। দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি-জামায়াতের মধ্যেই এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এমন সমীকরণ সামনে রেখেই প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি- জামায়াত। প্রথমবারের মতো এ আসনে বিজয়ের স্বপ্ন দেখছে জামায়াত। এ আসনে বর্তমানে মোট ভোটার ৪,৫৬,৩৭৯ (ডিসেম্বর ২০২৩) পুরুষ ভোটার: ২,৩১,৭৯০ নারী ভোটার: ২,২৪,৫৮৭ হিজড়া ভোটার: ২জন।
জানা যায়, এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী তিন নেতা মাঠে রয়েছেন। সাবেক উপপ্রধান মন্ত্রী মরহুম ডাঃ এম এ মতিনের পুত্র প্রফেসর ড. এম এ মুহিত ২০১৮ সালের মতো ত্রয়োদশষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ধানের শীষের মনোনয়ন প্রত্যাশী। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ২০ দলীয় জোট সমর্থিত ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বি হচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা গোলাম সারোয়ার ও জেলা বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা শফিকুল ইসলাম ছালাম। গত রমযান মাসে ইফতার মাহফিল, ঈদের পরে ঈদ পুনর্মিলনী, সামাজিক, ধর্মীয় নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন বিএনপি ও জামায়াতের এসব প্রার্থীরা।
পর্যবেক্ষকমহল বলছেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ দলীয় কোন্দল। বিএনপির রাজনীতিতে এ কোন্দল প্রকাশ্যে এসেছে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর। দলীয় আধিপত্য বিস্তার ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নিয়ে জেলা বিএনপি’র সাবেক উপদেষ্টা এম এ মুহিত ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম সারোয়ারের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে দলের তৃণমূলে। এছাড়াও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুস ছালামও দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনিও প্রচার .প্রচারণা ও গণ সংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশী গোলাম সারোয়ার বলেন, ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসেছি। আওয়ামীলীগের জুলুম নির্যাতন ভোগ করে দীর্ঘদিন ঢাকার রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে ছিলাম। এলাকায় নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এলাকায় আরও সক্রিয় হয়েছি। প্রত্যন্ত জনপদে নিয়মিত গণসংযোগ, মতবিনিময় করছি। আমি ও আমার লোকজন চাঁদাবাজি, লুটপাট, দখলবাজির সাথে জড়িত নই। দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। তবে আদর্শিক বিরোধ নেই। বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবেই কাজ করবো।
উপজেলা বিএনপি’র সদ্য বিলুপ্ত সহ-সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার বলেন, আমাদের নেতা মুহিত একজন ক্লিন ইমেজের লোক । বিগত সাড়ে ১৫ বছর আন্দোলন, সংগ্রাম ও নির্যাতনে ড এম এ মুহিতের নেতৃত্বে আমরা মাঠে ছিলাম। একাধিক মামলা ও নির্যাতনের পরেও আমরা মাঠে থেকেছি। এই দুঃসময়ে ড. মুহিত সাহেব নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। তাই তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চায়, ড. মুহিতকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হোক। তবে মনোনয়ন যাকেই দেওয়া হবে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষকে বিজয়ী করবো।
এদিকে এই আসনে জামায়াতে ইসলামী কখনও বিজয়ী না হলেও দলটির সাংগঠনিক অবস্থা অনেকটা শক্তিশালী। রয়েছে সমৃদ্ধ ভোট ব্যাংক। ৫ আগস্টের পর এ আসনে সাংগঠনিক তৎপরতা ব্যাপক বৃদ্ধি করেছে জামায়াত। উল্লেখ যোগ্য হারে বেড়েছে কর্মী সমর্থকও। শাহজাদপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক মাওঃ মিজানুর রহমানকে কেন্দ্র থেকে আগামী সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দিয়েছেন। ফলে আগে ভাগেই চালাচ্ছেন প্রচারণা ও গণ সংযোগ। বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিজয়ের টার্গেট নিয়ে কাজ করছে জামায়াত। ফলে প্রথমবারের মতো এ আসনে বিজয়ী হয়ে চমক দেখাতে চায় জামায়াত প্রার্থী।
এ ব্যাপারে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মাওঃ মিজানুর রহমান বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে আমরা প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারিনি। কিন্তু পুলিশ ও আওয়ামী লীগের অগোচরে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। দলকে সুসংগঠিক করেছি। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আমরা মানুষের কাছে যাচ্ছি। জামায়াতের প্রতি সমর্থনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। ভালো সাড়া পাচ্ছি। জামায়াতে ইসলামীর প্রতি অতীতের চেয়ে মানুষের ভালোবাসা বেড়েছে। মানুষ চায়, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। এজন্য জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে।