হাওরের বিস্তীর্ণ দিগন্ত জুড়ে সোনালী ধানের খেলা। যেখানে এখন ধান মাড়ায়ের উৎসবে মুখরিত থাকার কথা ছিল সেখানে এখন কেবল কৃষকের হাহাকার। টানা ৬ দিনের ভারী বৃষ্টিতে এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল কেড়ে নিয়েছে সোনালী ধান।অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে পাকা আধা পাকা ধান। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে হাজারো কৃষকের ঘরে বইছে শোকের মাতাম। ত্রিমুখী সংকটের মুখে পড়েছে হাওড়া অঞ্চলের কৃষকেরা আগাম বৃষ্টি, শ্রমিক সংকট, শ্রমিক মজুরি বেশি, ধান কাটার হারভেস্ট নামক যন্ত্রের ঘাটতি এই তিন সমস্যা নিয়ে হাওড়া অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। মাঠ ভরা বোরো পাকা ধান ঘরে তোলার আগেই দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে হার্ভেস্ট মেশিন এখন হাওড় অঞ্চলে অকেজো।

তবে ধানের শুকনো জমিতে হারভেস্ট মেশিন চালাতে পারে। কৃষকেরা কোমর সমান পানিতে নেমে আদা কাঁচা ধান কাটতে শুরু করেছে।শ্রমিকের বর্তমান মজুরি প্রতিদিন ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা। পানিতে তলিয়ে থাকা ধান কাটতে গিয়ে কৃষককে গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত টাকা। বৃষ্টির পানি এবং কৃষকের চোখের পানি মিলে একাকার। রোদের কারণে ধান শুকাতে ও পারছেন না হাওড় অঞ্চলের কৃষকেরা।

কিশোরগঞ্জের কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি এবং প্রবল বর্ষণে ইতোমধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২১ হাজার কৃষক।

গত ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমি পানির নিচে চলে গেছে। এর মধ্যে ইটনা উপজেলাতেই প্রায় ২ হাজার ৬০০ হেক্টর বোরোধানের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার হাওর উপজেলা নিকলী, ইটনা মিটামইন এবং অষ্টগ্রাম এর নিমাঞ্চল।

নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৬১ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন অর্থাৎ ২৮শে এপ্রিল বৃষ্টিপাত ছিল ১৬০ মিলিমিটার।যাহা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল সকাল থেকে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রোদের দেখা মিলেছে, যা কিছুটা কৃষকদের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়েছে।

তবে গতকাল শুক্রবার থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েকদিনের অব্যাহত বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে হাওরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু ইটনা উপজেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই হাজার ৬০০ হেক্টর বোরো ধানের জমি। এতে ধান কাটতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টিতে জেলার অন্যান্য উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজির ক্ষেতেও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইতিমধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর উপজেলার স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত ধান কাটার জন্য নোটিশ প্রদান করেছেন। কিশোরগঞ্জের হাওড় অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে ধান উৎপাদনে ব্যয় বাড়লেও, মিলছে না ধানের ন্যায্য দাম। কৃষকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় প্রতি বছর তারা বোরো আবাদে লোকসান দিয়ে যাচ্ছেন। এবার ভালো ফলন হলে সে ধকল কিছুটা কাটিয়ে ওঠার আশা করেছিলেন তারা।

কিন্তু তাদের সে আশায় গুড়েবালি। ব্রিধান-৮৮ এর বীজে মিশ্রণের ফলে ঘটেছে ফলন বিপর্যয়। হাওরের অনেক জায়গায় তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। এছাড়া ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে এবারও লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের।

কেবল ন্যায্য দাম নয়, একের পর এক সংকটে কাবু হাওরের কৃষক। দ্বিগুণ-তিনগুণ পারিশ্রমিক দিয়েও মিলছে না ধান কাটা শ্রমিক। ডিজেল সংকটের কারণে কাটা ধান পরিবহন ও মাড়াইয়েও গুণতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। ব্যাপক দরপতন ও লোকসানের কারণে হাসি নেই হাওরের কৃষকের মধ্যে।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বোরো উৎপাদনকারী জেলা কিশোরগঞ্জ। এই জেলাটি ১৩ টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। তন্মধ্যে চারটি উপজেলা কে হাওর উপজেলা বলা হয়। হাওর উপজেলা গুলো হলো নিকলী, ইটনা, মিঠামইন, ও অষ্টগ্রাম। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানায়, এ বছর জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর অধ্যুষিত ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী-এ চারটি উপজেলায় আবাদ হয়েছিল প্রায় এক লাখ হেক্টর। সেখানকার ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে এবার আবাদ করা হয়েছিলো ব্রি-ধান ৮৮। এই ব্রি-ধান ৮৮ এর বীজে মিশ্রণের কারণে হাওরের প্রায় এক পঞ্চমাংশ কৃষক ফলন বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, হাওরের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকেরা মূলত ধার দেনা ও মহাজনের কাছ থেকে সুদের ওপর ঋণ নিয়ে জমি চাষ করে থাকেন। ধান তোলার সাথে সাথেই তাদেরকে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু ধানের কম দাম তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এই কারণে তারা মহাজনের ঋণ শোধ করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। মহাজনরা বলছে টাকা দিতে না পারলে আমাদেরকে ধান দিয়ে দাও।

কৃষকেরা আরো জানান, সারের চড়ামূল্য, সেচ খরচ, শ্রমিকের চড়া মজুরীতে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। কিন্তু ফসলের ন্যায্য দাম নেই। মূল্য কম-বেশি যাই হোক, মহাজনের ঋণ পরিশোধ করতেই হয়।

সরজমিন হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আরো জানা গেছে, জেলার হাওরের অনেক কৃষক অন্যের জমি পত্তন নিয়ে বোরো আবাদ করেছেন। আবার অনেকে বিত্তশালীদের জমি বর্গা চাষ করেছেন। কৃষকেরা শ্রমিকের মজুরি আর মহাজনের ঋণ শোধ করতে গিয়ে ধান কাটা শুরু হওয়ার পর থেকেই নতুন ধান বিক্রি করছেন। প্রতি মণ মোটা ধানের সর্বোচ্চ মূল্য ৭০০ টাকা। চিকন ধানের দাম সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা। অথচ উৎপাদন ব্যয় পড়েছে ১০০০ থেকে ১১০০ টাকা। তাই বর্তমান বাজারে সর্বোচ্চ দামেও তাদের উৎপাদন ব্যয় উঠবে না বলে জানান কৃষকেরা।

আরো জানান, প্রতিটি কৃষক পরিবারের যেসব সদস্য চাষাবাদে শ্রম দেন, তারা নিজেদের মজুরিটা কখনোই টাকার মুল্যে হিসাব ধরতে শেখেননি। কেবল নগদ যে টাকাগুলো চাষাবাদে খরচ করেন, কেবল সেটাই হিসাবের মধ্যে ধরেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষকরা বোরো আবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেন, এনজিও থেকেও ঋণ নেন। আবার উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন চাতাল মিল মালিক কৃষকদের মধ্যে আগাম লগ্নি করেন। ধান কেনার জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে যান। ফলে ধানের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য নির্ধারণ করে এসব লগ্নির টাকা কৃষকদের হাতে তুলে দেন। আর নতুন ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এসব চাতাল মিল মালিকের লোকদের হাতে কৃষকদেরকে পরিশ্রমের ধান কম মূল্যে তুলে দিতে হয়।

এই সময় হাজার হাজার মণ ধান বড় বড় নৌকা বা কার্গোতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় হাওরাঞ্চলের ‘প্রবেশদ্বার’ বলে খ্যাত করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দরে। বাজিতপুর ফেরিঘাট। কুলিয়ারচর নদী ঘাট, এবং ভৈরব বাজার বন্দরে। সেখান থেকে ট্রাক এবং ট্রাক্টরে ভরে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরবঙ্গসহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের চাতালে। আবার ধান কাটার মৌসুমে চামড়া নৌবন্দরে,ভৈরব বাজার নৌবন্দরে, আশুগঞ্জ নৌবন্দরে, কুরিয়ারচর বন্দরে, অস্থায়ী আড়ত খুলে বসেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা দালালের মাধ্যমে হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে সস্তায় ধান কিনে আড়তে গুদামজাত করেন। এখান থেকে সরবরাহ করেন বিভিন্ন বড় বড় চালকল বা ধানের অটো রাইস মিলে।

ইটনা উপজেলা সদরের বাঘাইহাটি গ্রামের কৃষক মহসীন মিয়া এবার ২ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। দক্ষিণবন্দে তার জমিতে ব্রিধান-১০২ রোপন করেছিলেন। ফলনও হয়েছে বেশ ভালো। কিন্তু ধান কাটা শ্রমিক মিলছে না।

পার্শ্ববর্তী মৃধাহাটি গ্রামের জাকির হোসেন জানান, তিনি ৩ খের (৭৫ শতাংশ) জমিতে ব্রিধান-১০২ করেছিলেন। এইটুকু জমি করতে তার খরচ হয়েছে ৫৭ হাজার টাকা। অথচ ৮০০ টাকা মণ ধরে ধান বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৪২ হাজার টাকা। ১৫ হাজার টাকা তার লোকসান হয়েছে।

ইটনা উপজেলার করনশী গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ধান কাটার জন্য তাদেরকে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হয়েছে। ঘরে যে পরিমাণ ধান তারা তুলতে পারবেন বলে আশা করেছিলেন, তার এক চতুর্থাংশও তুলতে পারেননি। এর উপর ধানের দাম কম হওয়ায় তারা দিশেহারা।

তিনি বলেন, প্রতি বছর ভালো দাম পাওয়ার আশা করলেও আমরা বার বারই নিরাশ হচ্ছি। তবুও বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আমাদের বাধ্য হয়ে ধান চাষ করতে হচ্ছে।

একই গ্রামের কৃষক আনোয়ার ঠাকুর জানান, উৎপাদিত ধানের বেশির ভাগই ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মজুরির খরচ মেটাতে চলে যায়। এছাড়া মৌসুমজুড়ে হালচাষ, আবাদ, সার ও কীটনাশকসহ উৎপাদন সংশ্লিষ্ট নানা খরচ গুণতে হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম কৃষকদেরকে চরমভাবে হতাশ করেছে।

জয়সিদ্ধি বড়হাটি গ্রামের কৃষক মন্নান ঠাকুর জানান, চার একর জমিতে তিনি বোরো আবাদ করেছিলেন। মহাজনের ঋণ শোধ করার জন্য ধান কাটার পর খলা থেকেই বিক্রি করে দিয়েছেন। প্রতি মণ ধান মাত্র ৭০০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। ‘মহাজনের ঋণ শোধ করে যে সারাটা বছর কিভাবে চলবো তা একমাত্র আল্লাহই জানে!’ বলতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন মন্নান ঠাকুর।

জয়সিদ্ধি শান্তিপুর গ্রামের কৃষক জালাল মিয়া জানান, তিনি ৩ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। ধানের দাম কম হলেও তাকে ঋণ পরিশোধ করতে খলাতে রেখেই ধান বিক্রি করতে হয়েছে।

জয়সিদ্ধি গ্রামের কৃষক মামুনুল আলম খান জানান, কৃষিকাজ না করে এখানকার কৃষক বসে থাকতে পারে না। তাই লাভ-লোকসানের হিসাব না করে প্রতি বছরই তারা বোরো আবাদ করেন। তিনি বলেন, দিন দিন কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে চলেছে। তাই হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে কৃষিকাজ করলেও তারা লাভবান হতে পারেন না। তার দাবি, কৃষকদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকদের হাত থেকে মৌসুমের শুরু থেকেই ধান ক্রয় করতে হবে।

নিকলী উপজেলার মজলিশপুর গ্রামের মামুন মিয়া (৩৫) জানান, এবার তিনি চার একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে অর্ধেক জমিতে ব্রিধান-৮৮ করেছিলেন। এই দুই একর জমিতে স্বাভাবিক ফলনে ধান হওয়ার কথা ছিলো ১৬০ মণ। ফলন বিপর্যয়ের কারণে ধান হয়েছে ৮০ মণ। বাকি ২ একর জমিতে অন্য ধান রোপণ করে স্বাভাবিক ফলন পেলেও ঋণগ্রস্থ এই কৃষক এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন।

কৃষক মামুন মিয়া বলেন, ‘একদিকে ধানের উৎপাদন কম হয়েছে, অন্যদিকে ধানের দাম কম থাকায় এবার আমি বড় ধরণের ধরা খেয়েছি। পাওনাদারদের তাগাদার কারণে সস্তায় সব ধান বিক্রি করে দিয়েছি। ঘরে এক ছটাক ধানও রাখিনি। সামনের দিনগুলোতে কী খেয়ে বাঁচবো এখন এই চিন্তায় আছি।’

একই গ্রামের কৃষক লোকমান হেকিম (৬০) জানান, তিনি এক একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে এক একর জমিতে ব্রিধান-৮৮ করেছিলেন। এই জমিতে মিশ্রণ এবং চিটার কারণে ফলন অর্ধেক হয়েছে। কৃষক লোকমান হেকিম বলেন, প্রতি মণ ধান ফলাতে আমার খরচ হয়েছে ১১০০ টাকা। এখন ৮০০ টাকার বেশি ধানের দাম উঠছে না। এছাড়া পাইকাররাও আসছে না। তাই ধান বিক্রি নিয়ে বিপাকে আছি।

মজলিশপুর গ্রামেরই কৃষক সবুজ মিয়া (৫৫) জানান, দুই একরের কিছু বেশি জমিতে ব্রিধান-৮৮ চাষ করেছিলেন। ফলন ভালো হয়নি। অর্ধেক ধান তার কাটা হয়েছে। দেনা শোধ করার জন্য ৮০০ টাকা মণ করে তিনি কিছু ধান বিক্রি করেছেন।

নিকলী সদর ইউনিয়নের কৃষক কিতাব আলী বলেন, এ বছর ধান উৎপাদনে বেশি খরচ পড়েছে। এবছর আমি যে ধান চাষাবাদ করেছি যে টাকা খরচ হয়েছে উৎপাদিত ধান বিক্রি করলে উৎপাদন খরচ উঠে আসবে না। খুবই অভাবে পড়ে যেতে হবে। একই উপজেলার সাজনপুর গ্রামের মোহাম্মদ রুবেল মিয়া জানান এ বছর বোরো দানের বাম্পার ফলন হলেও উৎপাদন খরচ উঠবে না। নিজেদের সংসারে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাপ-দাদার আমল থেকেই ধান চাষ করে আসছি।

মিঠামইনের কাটখাল গ্রামের ষাটোর্ধ কৃষক রমজান মিয়া এবার ৪ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। ফলন মোটামুটি হয়েছে। তারপরও স্বস্তি নেই তার মনে। ধানের কম দাম তার ফসল তোলার আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে।

একই গ্রামের কৃষক সিরাজ মিয়া জানান, প্রতি মণ ধান ফলাতে কৃষকের খরচ পড়েছে ১০০০’ থেকে ১১শ’ টাকা। অথচ বর্তমানে এর কাছাকাছি দামও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তাদের মণপ্রতি বড় অঙ্কের লোকসান গুণতে হচ্ছে।

কাটখাল সাহেবনগর গ্রামের কৃষক হারুন মিয়া জানান, একটি মাত্র বোরো ফসলই হাওরের জীবন-জীবিকা। কৃষকের হাতে নগদ টাকা না থাকায় শ্রমিক খরচসহ নানা খরচের যোগান দিতে বাধ্য হয়ে কম মূল্যে তাদের ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এই কারণে ধানের ফলনে তারা কমবেশি খুশি হলেও দামে ধরা খাচ্ছেন।

একই রকম কথা জানালেন কাটখাল সাহেবনগর গ্রামের কৃষক দ্বীন ইসলাম মিয়া, লাল মিয়া, মিঠামইনের ঢাকী গ্রামের কৃষক কামাল মিয়া, শফিকুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর মিয়া ও জিল্লুর রহমানসহ অনেকেই। তারা জানান, হাওরে এখন অধিকাংশ কৃষকের একই দশা। ধানের দাম না থাকায় তাদের মাথায় হাত । কৃষক গন বলেন যখন হাতে ধান থাকে তখন দাম থাকে না। আবার ধান কৃষকের হাত থেকে ধান চলে যায় তখন দাম বাড়ে।

এদিকে কিশোরগঞ্জে সারা জেলায় বোরো ধানের উৎসব চলছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে ছাত্রলীগ কৃষকদের ধান কেটে দিতো।এবছর কোন রাজনৈতিক দল কৃষকদের পাশে ধান কেটে দিয়ে ধান উৎসব করতে যাইনি।

যদিও বাংলাদেশকে কৃষি প্রধান দেশ বলা হয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসেন তারাই বলেন আমরা কৃষকদের পাশে আছি প্রকৃতপক্ষে কতটুকু পাশে আছে সরকার একমাত্র ভুক্তভোগী কৃষকেরই ভালো জানেন।

নিকলী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক আখতার ফারুক জানান, আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেও সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় তা কমে ৬১ দশমিক ১ মিলিমিটারে নেমে এসেছে।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, করিমগঞ্জের চামড়াঘাট এলাকার মগড়া নদীর পানি বুধবার (২৯ এপ্রিল) ৬৩ সেন্টিমিটার বাড়লেও আজ দুই সেন্টিমিটার কমেছে। ইটনার ধনু-বৌলাই নদীতে গতকাল ৪৯ সেন্টিমিটার পানি বাড়লেও আজ বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার। একই সময় অষ্টগ্রামের কালনী নদীতে ৬৯ সেন্টিমিটার বাড়লেও আজ বেড়েছে মাত্র ১ সেন্টিমিটার। ভৈরবের মেঘনা নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে।

অপরদিকে গতকাল শনিবার থেকে কিশোরগঞ্জে আবারো বৃষ্টি, এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বেড়েছে নদ-নদীর পানি।

কিশোরগঞ্জের বেশিরভাগ নদ-নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একটি পয়েন্টে পানি কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

শনিবার (২ মে) সকাল ৯টায় কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.০৬ মিটার, যা আগের দিনের তুলনায় ৫ সেন্টিমিটার বেশি। চামড়াঘাটে মেঘনা নদীর পানি ২.৭৩ মিটার, বেড়েছে ১০ সেন্টিমিটার। অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি ২.৪৫ মিটার, যা ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, গত ৩০শে এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের তথ্যে সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটনা উপজেলায়। তবে এখন বৃষ্টিপাত না হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কম বলে তিনি জানান।

গতকাল শনিবার হাওর অঞ্চলের সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে সূর্যের কোন দেখা মিলছে না। বৃষ্টি হচ্ছে এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে নতুন নতুন ধানের জমি তলিয়ে যাচ্ছে। হাওড় অঞ্চলের কৃষকেরা হতাশার মাতাম করছে।

কিশোরগঞ্জ ৫ আসনের এমপি মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ইকবাল গতকাল শুক্রবার পহেলা মে নিকলী উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট প্রফেসর কর্নেল(অব:) জিহাদ খান করিমগঞ্জ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এছাড়াও জেলা পর্যায়ের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা গুলো পরিদর্শন করেছেন।

অপরদিকে জেলার বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সদ্য যোগদান কৃত কিশোরগঞ্জ জেলার মাননীয় জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন এবং কৃষি বিভাগের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা বৃন্দ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বেলা ২টা রবিবার ২ মে ২০২৬ কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।