যেরা আমার স্বামীরে মাইরা লাইছে আমি হেগো ফাঁসি চাইঃ স্ত্রী

দেওয়ান মুরাদুজ্জামান, মতলব উত্তর (চাঁদপুর) সংবাদদাতা : আরিফুল ইসলাম রাজীব (২৯)। পেশায় একজন ভাঙ্গারী ব্যবসায়ী। ২০২০ সালে নেত্রকোনার মেয়ে শরীফাকে (২৪) বিয়ে করে। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান ইব্রাহীমকে (৪) নিয়ে থাকতেন গাজীপুর সদরের বোর্ড বাজার এলাকায়। আদর্শ নগর বটতলায় ৪ বছর যাবত ভাঙ্গারী ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

প্রতিদিনের মতো ঘটনার দিন সকালে কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। দুপুরে বাসায় আসেন। খাবার খেয়ে ১০০ টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হলে স্ত্রী শরীফা যেতে বাধা দেন। সারা দেশে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলন তুঙ্গে। ছোট ভাই ফোন করে বারণ করেছিলো যেন বড় ভাই রাজীব বাসা থেকে বের না হন। কেউ থামাতে পারেনি আরিফুল ইসলাম রাজীবকে। বিকেল সাড়ে তিনটায় স্ত্রী শরীফা বেগম জানতে পারেন রাজীব বোর্ড বাজার এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শরীফার কাছে কোনো টাকা নেই। স্বামীর লাশ কিভাবে মতলব উত্তরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসবেন। চিন্তায় পড়ে গেলেন। পরে বোর্ড বাজার এলাকার লোকজনের সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে গ্রামের বাড়ি মতলব উত্তরের গজরা ইউনিয়নের টরকী এওয়াজ নিয়ে আসেন।পার্শ¦বর্তী রাঢ়ীকান্দি গ্রামের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়েছে।

সে টরকী এওয়াজ গ্রামের রজ্জব আলী বেপারির (৬০) বড় ছেলে। রজ্জব আলী বেপারীর ডান হাত (অবশ) অকেজো হয়ে যাওয়ায় ৪ বছর যাবত কাজ করতে পারেন না। ফলে ভিক্ষা করে সংসার চালান।

তাদের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বড় ছেলে আরিফুল ইসলাম রাজীব। রজ্জব আলী বেপারির ৪ মেয়ে ২ ছেলে। তন্মধ্যে ৩ মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন।

সংসারে অভাব থাকায় ছোট মেয়ে সুমি ৬ষ্ট শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনার পর লেখাপড়া করতে পারেনি। সে অবিবাহিতা। ছোট ছেলে ফয়েজ (১৯) স্থানীয় ওটারচর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। করোনার কারণে পড়াশোনা বেশিদূর এগোতে পারেনি। ফলে ৬ সদস্যের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস তিনি। চাঁদপুরের একটি হোটেলে সামান্য বেতনে বয়ের কাজ করে।

সরেজমিনে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার প্রতিনিধি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে নিহত আরিফুল ইসলাম রাজীবের গ্রামের বাড়ি টরকী এওয়াজ যান। সেখানে সাংবাদিক পরিচয় শুনে নিহত রাজীবের মা রাহিমা বেগম (৫১) ঘর থেকে উঠানে আসেন। পুত্রের ছবি হাতে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তাঁর কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। আশপাশের লোকজন চলে আসে।

নিহত আরিফুল ইসলাম রাজীবের মা রাহিমা বেগম বলেন, মৃত্যুর আগের দিন রাতে আমার ছেলেকে মোবাইলে ফোন দিছিলাম।আমার ছেলে কয়, মা আমি যদি মইরা যাই, আমার ছেলেডারে দেইখা রাইখো। অরে এতিম কইরোনা। আমি কই বাজান কি কস। তুই কেন মইরা যাবি। আমার পুতে (ছেলে) কয় মা হায়াত মউতের কথা তো কওন যায়না। স্যার গো হের পরদিন হুনি আমার যাদুমনি গুলি খাইয়া মইরা গেছে। এহন আমারে কে মা বইল্লা ডাকবো। তিনি বলেন, আমার ছোডো পোলাডারে যদি সরকার একখান চারকি (চাকুরী) দিতো তয় আমাগো সংসার ভালো চলবো। কি কমু আমার স্বামী ভিক্ষা কইরা আমগো সংসার চালায়। দৈনিক ৩/৪ কেজি যা চাউল পায়, তা দিয়েই আমগো সংসার চলে।

নিহত রাজীবের স্ত্রী শরীফা বেগম (২৪) বলেন, যেরা আমার স্বামীরে মাইরা লাইছে, আমি হেগো ফাঁসি চাই। তিনি জানান, জুলাই ফাউন্ডেশন তাদের ৫ লাখ টাকা দিয়েছে। সে টাকা কৃষি ব্যাংক লিমিটেড গজরা বাজার শাখায় রাজীবের ছেলে ইব্রাহীমের নামে স্থায়ী ডিপোজিট করে রেখেছেন।ইব্রাহীমের বয়স আঠারোর আগে ওই টাকা কেউ উত্তোলন করতে পারবেনা। জামায়াত ইসলামী দিয়েছে ২ লাখ টাকা।

রজ্জব আলী বেপারি (৬০) জানান, তাদের তিন ভাই মিলে ৫ শতক ভিটে মাটি রয়েছে। তন্মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একটি দো-চালা ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। যারা আমার নাতি ইব্রাহীমকে এতিম করেছে, মরার আগে যেন তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখতে পাই।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গাজীপুরের গাছা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই)

সুমন খান আমার দেশকে বলেন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চালাকালীন গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আরিফুল ইসলাম রাজিব মারা যান। তখন ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয়েছিল। পরে এ ঘটনায় তার বাবা রজ্জব আলী বেপারি বাদী হয়ে সাবেক প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের,আকম মোজাম্মেল হক, জাহাঙ্গীর আলমসহ অঞ্জাত আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: রবিউল হক জানান, ময়না তদন্ত ছাড়া রাজিবের লাশ রাঢ়ীকান্দি কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করে। ফলে গাজীপুর মেট্রোপলিটন চীফ জুডিশিয়াল আদালত মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করতে মরদেহ উত্তোলন করে ময়না তদন্তের জন্য আদেশ দেন।

গত ১৮ ডিসেম্বর সকালে রাজীবের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়না তদন্তের জন্য চাঁদপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ময়না তদন্ত শেষে বিকেলে লাশ পুনরায় রাঢ়ীকান্দি কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।