সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়ায় পর্যটন শিল্প বিকাশের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। কিন্তু পর্যাপ্ত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে সেই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য শিলাইদহের কুঠিবাড়ী এবং বাউল সম্রাট লালন শাহের সাধনভূমি ছেউড়িয়া যুগ যুগ ধরে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে।
শুধু রবীন্দ্রনাথ ও লালনকে ঘিরেই নয়, কুষ্টিয়াজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের অসংখ্য নিদর্শন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা, সাংবাদিক ও সমাজসংস্কারক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতিবিজড়িত কাঙাল কুঠির, টেগোর লজ, ঐতিহাসিক মোহিনী মিলস, রেনউইক বাঁধ, ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ, ভেড়ামারা পাম্প হাউস, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু উল্লেখযোগ্য পর্যটন আকর্ষণ।
রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ কুঠিবাড়ী
কুষ্টিয়া শহর থেকে এক ঘণ্টারও কম সময়ে যাওয়া যায় শিলাইদহ কুঠিবাড়ীতে। চারদিকে সবুজ বাগানঘেরা মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কুঠিবাড়ীর ভেতরে রয়েছে কবিগুরুর ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র ও স্মৃতিচিহ্ন। বাইরে রয়েছে বকুলতলার পুকুরঘাট। পাশেই পদ্মার পাড়। সব মিলিয়ে প্রকৃতি ও ইতিহাসের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এখানে। কুঠিবাড়ী সংলগ্ন খোরশেদপুরে হজরত খোরশেদ উল মৌলুকের মাজারও দর্শন করা যায়।
ছেউড়িয়ায় লালনের সাধনভূমি
কুষ্টিয়া শহরসংলগ্ন কালীগঙ্গা নদীর তীরে ছেউড়িয়া গ্রামে রয়েছে বাউল সম্রাট লালন শাহের সাধনভূমি। এখানেই লালন শাহসহ অন্যান্য সাধকের মাজার এবং লালন মিউজিয়াম অবস্থিত।
দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা এখানে এসে লালনের দর্শন ও জীবন সম্পর্কে জানার পাশাপাশি বাউলগান উপভোগ করেন। বিশেষ করে লালন স্মরণোৎসব ও দোলপূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে এ এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে।
মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা
উনিশ শতকের অন্যতম খ্যাতিমান মুসলিম সাহিত্যিক এবং ‘বিষাদ সিন্ধু’র রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়ায়। কুষ্টিয়া শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২০ মিনিটের পথ।
১৮৪৭ সালে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিকের শৈশবের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে এ স্থানটির সঙ্গে। প্রতিবছর এখানে নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে স্থানটি বিশেষ আকর্ষণের।
কাঙাল হরিনাথের কাঙাল কুঠির
কুষ্টিয়ার প্রথম সংবাদপত্র ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বাড়ি ‘কাঙাল কুঠির’ কুমারখালী উপজেলা শহরের মধ্যেই অবস্থিত। ১৮৬৩ সালে তিনি ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ শুরু করেন।
কাঙাল হরিনাথ তাঁর লেখনীর মাধ্যমে নীলকর, অত্যাচারী জমিদার ও লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। বর্তমানে গাছপালায় ঘেরা কাঙাল কুঠিরে তাঁর স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। তবে যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি দিন দিন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
টেগোর লজ ও মোহিনী মিলস
কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় অবস্থিত টেগোর লজ। এটি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’র এদেশীয় শাখা কার্যালয়। কলকাতা থেকে শিলাইদহে যাতায়াতের সময় কবিগুরু এখানে বিশ্রাম নিতেন বলে জানা যায়।
টেগোর লজের পেছনেই রয়েছে অবিভক্ত বাংলার প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্রকল ‘মোহিনী মিলস’। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এ মিলটি কুষ্টিয়ার শিল্প-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। একসময় মোহিনী মিলের হুইসেলের শব্দকে ঘিরেই এলাকার মানুষের দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞ শুরু হতো বলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।
রেনউইক বাঁধে প্রকৃতির সান্নিধ্য
কুষ্টিয়া শহরের গড়াই নদীর তীরে রয়েছে রেনউইক বাঁধ। রেনউইক অ্যান্ড যজ্ঞেশ্বর কোম্পানি একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আখমাড়াই কলের যন্ত্রাংশ তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশে নদীর তীরে গড়ে ওঠা এ বাঁধে প্রতিদিনই স্থানীয় মানুষসহ দর্শনার্থীদের আনাগোনা দেখা যায়। গড়াই নদীর পাড়ে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নৌভ্রমণের সুযোগও রয়েছে।
ঐতিহাসিক ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ
কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ দেশের ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর অন্যতম। মুঘল আমলে নির্মিত এ মসজিদের স্থাপত্যশৈলী এখনো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বৃত্তিপাড়া থেকে এ মসজিদে যাওয়া যায়। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
একসঙ্গে তিন ঐতিহাসিক স্থাপনা
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় পদ্মার তীরে কাছাকাছি অবস্থান করছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু ও ভেড়ামারা পাম্প হাউস। কুষ্টিয়া শহর থেকে এ এলাকাটির দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার।
দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচ প্রকল্প জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) সেচ প্রকল্পের প্রধান পাম্প হাউসটি প্রকৌশল ও সেচ ব্যবস্থাপনার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অনুমতি সাপেক্ষে এটি পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু পদ্মার ওপর নির্মিত দেশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোর অংশ। দুই সেতুর মধ্যবর্তী পদ্মার পাড়ও দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে।
পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও নেই পরিকল্পিত উদ্যোগ
কুষ্টিয়ায় পর্যটনের এতসব সম্ভাবনাময় স্থান থাকলেও এগুলোকে সমন্বিতভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। কোথাও নেই পর্যাপ্ত সড়কব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র, পর্যটকবান্ধব নির্দেশনা, বিশ্রামাগার বা পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, কুষ্টিয়ার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলোকে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিটের আওতায় আনা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কুষ্টিয়ার পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি স্থাপনা সংস্কার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় বিভিন্ন পরিবহনের বাস চলাচল করে। আরিচা-পাটুরিয়া হয়ে কুষ্টিয়া গেলে কুমারখালীতে নেমে কাঙাল হরিনাথের কাঙাল কুঠির দিয়ে ভ্রমণ শুরু করা যায়। এরপর মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা, লালনের আখড়া ও শিলাইদহ কুঠিবাড়ী ঘুরে দেখা সম্ভব।
অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে কুষ্টিয়ায় যাওয়া যায়। এ পথে কুষ্টিয়া শহরে নেমে লালনের আখড়া, মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা, শিলাইদহ কুঠিবাড়ী, কাঙাল কুঠিরসহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা যায়। হাতে দুই দিন সময় থাকলে পরিকল্পনা করে অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা সম্ভব।
কোথায় থাকবেন
কুষ্টিয়া শহরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। এছাড়া অনুমতি সাপেক্ষে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতেও থাকার ব্যবস্থা করা যায়।
কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, ছেউড়িয়া, কুমারখালী, লাহিনীপাড়া, মিলপাড়া, ঝাউদিয়া ও ভেড়ামারাকে নিয়ে একটি সমন্বিত পর্যটন রুট তৈরি করা গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই জেলার পর্যটন খাত নতুন মাত্রা পেতে পারে। প্রয়োজন শুধু যথাযথ পরিকল্পনা, সংরক্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ।