ক্স ইমামের মেয়েকে প্রকাশ্যে অপহরণে তোলপাড়

ক্স বেড়েছে খুন, ডাকাতি, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ

ক্স বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল, দাবি পুলিশের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পর মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসতে শুরু করেছিল। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো অবস্থায় ফিরবে এমন আশা ছিল দেশের মানুষের। নতুন সরকারের যাত্রার শুরতেই পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল করায় মানুষ আশাবাদী হয়েছিল হয়তো বিগত সময়ের চেয়ে পরিস্থিতি উন্নতি হবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের গত দুই মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলার তেমন উন্নতি হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে। নতুন সরকার শপথ নেয়ার পর থেকে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। সম্প্রতি একজন তরুণীকে প্রকাশ্যে পরিবারের সদস্যদের সামনে থেকে নিজের ঘর থেকে তুলে নেয়ার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে একের পর এক হত্যা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, ডাকাতির ঘটনায় বেড়েছে চরম আতঙ্ক। সাধারণ মানুষ এসব নিয় এখন উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় আছেন।

নির্বাচনের পরে এখনো সেনাবাহিনীসহ যৌথবাহিনীর টহল অব্যহত আছে। পুলিশ প্রশাসনসহ শীর্ষ কয়েকটি পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এরপরও দলীয় পরিচয়ে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে ঘটছে এসব ঘটনা। বিভিন্ন এলাকায় অনেকটো বেপরোয়া হয়ে উঠছে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করা অপরাধীরা। সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই-ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় মানুষ আতংকিত হয়ে পড়েছেন। দেশব্যাপী এক ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করছে দুর্বৃত্তরা। সন্ত্রাসীরা দিবালোকে সড়কে, বাসে, অটোরিকশায়, এমনকি বাড়ি ফেরার পথে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এ নিয়ে দেশব্যাপী শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন উদ্বেগজনক অবনতির কারণে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষ নানা প্রশ্ন তুলছে। ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় দিনের আলোয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এতে সন্ধ্যার পর বের হতে ভয় পাচ্ছেন অনেকেই। বেড়েছে কিশোর গ্যাংদের দৌরাত্ম্যও।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দেশে হত্যাকা- বেড়েছে ১৪ শতাংশ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে যথাক্রমে ২৯৪, ২১৭ ও ২৩৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে হত্যা মামলা হয়েছে যথাক্রমে ২৮৭, ২৫০ ও ৩১৭টি।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ সারাদেশে নানামুখী অপরাধে যুক্ত হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। নিজেদের হিরোইজম জাহির করতে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার এমনকি খুনোখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে এসব কিশোর-তরুণ। এতে আতঙ্কিত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর-পাড়া-মহল্লার বাসিন্দারা। সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাদকের আগ্রাসন বেশি। এ আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে কিশোররা। এ কারণে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা- করতে দ্বিধা করছে না। কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতারের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। মূলত ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন নিয়ে এলেক্স গ্রুপের সঙ্গে আরমান-শাহরুখ গ্রুপের দ্বন্দ্বে হত্যা করা হয় এলেক্স ইমনকে। একই দিন সকালে দুই দফায় তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। এ ঘটনায় আরমান-শাহরুখ গ্রুপের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নিহত এলেক্স ইমনের বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ ১৮টি মামলা ছিল। আরেক ঘটনা শেরপুরের। গত ১০ মার্চ শেরপুরের নকলায় কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয় সজীব মিয়া (১৪)। জানা যায়, ১০ মার্চ রাতে সজীবকে আড্ডা দেওয়ার কথা বলে ডেকে নকলা বাইপাস ব্রিজের নিচে নিয়ে যায় একই গ্রামের মো. রিফাতসহ (১৮) আরও তিন-চারজন। পরে একটি মোবাইল ফোন হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে সজীবের শরীরে ছুরিকাঘাত করা হয়। এসময় চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করে নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় এলাকাবাসী। অবস্থা গুরুতর দেখে চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চারদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর সজীব মারা যায়। এ দুই ঘটনাই হত্যাকা-ের। শুধু হত্যাকা-ের মতো নৃশংস ঘটনায় নয়, এমন কোনো অপরাধ নেই যাতে কিশোর গ্যাং সদস্যরা জড়িত নয়। বিগত আওয়ামী লীগ আমলের কিশোর গ্যাং সদস্যরা ঘুরেফিরে নতুন নামে নতুনভাবে মাঠে নেমেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব গ্যাং সদস্যরা বদলেছে দল, কেউবা বদলেছে তাদের লিডারকে। নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও অপরাধের কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং ক্রমেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিষফোঁড়ার মতো হয়ে উঠছে তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে কিশোর গ্যাং বর্তমানে ২৩৭টি। এসব গ্যাংয়ের মোট সদস্য অন্তত ৫০ হাজার। নির্বাচনের পর কিশোর গ্যাংগুলো স্থানীয় রাজনীতিকদের আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টায় রয়েছে।

ইমামের মেয়েকে প্রকাশ্যে অপহরণ

গাজীপুরের শ্রীপুরে ইমামের কিশোরী মেয়েকে অপহরণের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় হয়। মামলা ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় মসজিদের ইমাম হাদিউল ইসলামের মেয়ে ফারিহা (১৬) স্থানীয় একটি মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। একই এলাকার আবিদ (২১) দীর্ঘদিন ধরে তাকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল এবং বিভিন্ন সময় কু-প্রস্তাব দিত। পরিবার থেকে একাধিকবার নিষেধ করা হলেও সে তা উপেক্ষা করে। একপর্যায়ে অপহরণের হুমকিও দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ১৪ এপ্রিল সকাল ৮টার দিকে ফারিহা মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে মাওনা ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন এলাকা থেকে আবিদ ও তার সহযোগীরা তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের চাপে ১৫ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। একই দিন বেলা ১১টার দিকে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশ বসলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, আবিদ ও সুমিতসহ প্রায় ১০ জন এবং আরও ২৫-৩০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে হাদিউল ইসলামের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা ঘরের দরজা ভেঙে ফারিহাকে আবার টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যায় এবং পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। ঘটনার সময় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা হলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্তরা ফারিহাকে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরবর্তীতে মেয়েটিকে উদ্ধারের পর আদালতের নির্দেশে তাকে বাবার জিম্মায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ ডাক্তার শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, গাজীপুরের শ্রীপুরে দিনদুপুরে একটি মসজিদের ইমামের মেয়েকে অপহরণ, পরিবারের সদস্যদের ওপর বর্বরোচিত হামলা এবং লুটপাটের ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। এ ঘটনা আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করেছে। এটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। যাদের ছত্রচ্ছায়ায় এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে, সামাজিকভাবে এদের বয়কট করতে হবে এবং দেশবাসীকে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে। বিশেষভাবে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অপরাধীদের প্রশ্রয় দিয়ে কোনোভাবেই এ ধরনের বর্বরতা চলতে দেওয়া যায় না।’

ফেব্রুয়ারিতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১০ নারী-শিশু

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সারাদেশে ২৩৬ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৩ মার্চ এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানায় সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৩৬ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া ১০ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং তিনজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন ৯০ জন নারী ও কন্যা শিশু, এরমধ্যে শিশু ১১ জন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ৯৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৫১ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

যা বলেছেন ডিএমপি কমিশনার

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অবশ্য পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা।। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। ফুট পেট্রোল জোরদার করতে হবে। থানা এলাকায় মাদক উদ্ধার ও পরোয়ানাভুক্ত আসামী গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। কোনো অপরাধ যেন থানা এলাকায় সংঘটিত হতে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি। তিনি বলেন, জনবান্ধব পুলিশিং গড়ে তুলতে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করতে হবে। মানুষ যেন তাদের কাঙ্খিত আইনি সেবা থানা থেকে পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। গত বৃহস্পতিবার (ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের সম্মেলন কক্ষে মার্চ মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ডিএমপির ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি এসব কথা বলেছেন।