চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ এলাকায় ছাত্রদল কর্তৃক ছাত্রশিবিরের ওপর হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে নগরজুড়ে। মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এই সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং ধারালো অস্ত্রের ব্যবহারে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এতে ছাত্রশিবিরের এক নেতা গুরুতর আহত হন; তার পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পরে তাকে দ্রুত একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে এবং তিনি আপাতত শঙ্কামুক্ত। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

সংঘর্ষের সময় ধারণ করা বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ শুরু হলে ছাত্রদলের মিছিল থেকে কয়েকজন নেতাকর্মী ধারালো অস্ত্র হাতে শিবিরের কর্মীদের দিকে তেড়ে যান। অন্তত পাঁচজনকে রামদা ও কিরিচ হাতে সক্রিয়ভাবে হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে সাদা টি-শার্ট ও ক্যাপ পরিহিত এক যুবককে প্রতিপক্ষের দিকে কিরিচ উঁচিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। এছাড়া কালো পোশাক ও হেলমেট পরিহিত আরেকজন যুবককেও একইভাবে অস্ত্র হাতে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। পরে তার পরিচয় নূর নবী রিশাদ হিসেবে জানা যায়, যিনি সিটি কলেজের মানবিক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

আরেকজনকে নীল শার্ট পরিহিত অবস্থায় মিছিলে সামনের সারিতে দেখা যায়, যিনি ওমরগণি এম ই এস কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মির্জা ফারুক বলে জানা গেছে। এছাড়া আরও কয়েকজনকে ধারালো অস্ত্র হাতে দেখা গেলেও তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। সংঘর্ষে অংশ নেওয়া কয়েকজনকে হেলমেট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়, যাদের মধ্যে কমার্স কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পলাশের নামও সামনে এসেছে।

অভিযুক্তদের বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সিটি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সৈয়দ সিদ্দিকী দাবি করেন, নূর নবী রিশাদ মিছিলে থাকলেও কিরিচ হাতে যাকে দেখা গেছে, তিনি রিশাদ নন। অপরদিকে নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, শিবির বহিরাগত নিয়ে মিছিল করায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা এসে মিছিলে যোগ দেন। তিনি আরও দাবি করেন, শিবিরের ফেলে যাওয়া কিছু রামদা ও কিরিচ তাদের কর্মীরা কুড়িয়ে নিয়েছিল।

এদিকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদেরও লাটিসোঁটা ও বাঁশ হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেখা যায়। সংঘর্ষের সময় কয়েকজনকে পাথর নিক্ষেপ করতে দেখা গেছে। শিবিরের দাবি, তারা আত্মরক্ষার জন্যই এসব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদেক কায়েম। বুধবার সকালে আহতদের দেখতে গিয়ে তিনি বলেন, “চাপাতি দিয়ে পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করার রাজনীতি ছাত্রসমাজ কখনো মেনে নেবে না। যারা এ ধরনের সহিংস রাজনীতি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।” তিনি দাবি করেন, এ ঘটনায় ছাত্রশিবিরের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী জানিয়েছেন, সংঘর্ষে জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশের কোনো গাফিলতি থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে নগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া দাবি করেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চেষ্টা করেছে।

সব মিলিয়ে এই সংঘর্ষ আবারও ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতার চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার, গুরুতর আহতের ঘটনা এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।