টানা আন্দোলন, ‘লাল কার্ড’, ব্লকেড ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মধ্যেই অবশেষে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন নবনিযুক্ত ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল। শিক্ষার্থীশূন্য ও প্রায় নিস্তব্ধ ক্যাম্পাসে বৃহস্পতিবার দুপুরে তার প্রবেশকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে আলোচনা ও নানা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুর আনুমানিক বেলা আড়াইটার দিকে শিক্ষকদের একাংশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত ভিসি। নিয়োগ পাওয়ার প্রায় আট দিন পর তিনি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ডুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া জানান, ক্যাম্পাসের শহীদ আবু সাঈদ ভবনে অবস্থিত ভিসির কার্যালয়ে গিয়ে নিজের নির্ধারিত আসনে বসেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল। এ সময় শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। উপস্থিত ছিলেন সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনও।

জানা গেছে, এর আগে বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন সদর দপ্তরের সভাকক্ষে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন নবনিযুক্ত ভিসি। পরে শিক্ষক ও কর্মচারীদের একটি অংশ তাকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন।

এদিকে, ভিসির আগমনের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দীর্ঘদিন ধরে রাখা বিভিন্ন অবরোধমূলক কাঠামো, আসবাবপত্র ও ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলতে দেখা যায় কর্মচারীদের। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক স্বাভাবিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

তবে ভিসির এই প্রবেশের সময় ক্যাম্পাসে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়নি। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণার পর থেকেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী হল ত্যাগ করে নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান। বুধবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ে। ফলে বৃহস্পতিবারের পুরো পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই নীরব ও সতর্কতাপূর্ণ।

ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকে ভিসি নিয়োগের দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের’ ব্যানারে আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, ব্লকেড এবং ‘লাল কার্ড’ কর্মসূচি পালন করেন। পরে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করা হয়।

গত রোববার ভিসি নিয়োগ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় অন্তত ১৮ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। আহত হন কয়েকজন পুলিশ সদস্যও।

এ ঘটনায় গাজীপুর সদর মেট্রো থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আহত করার অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে, আন্দোলন ঘিরে শিক্ষক সমিতি, সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে পৃথক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে শিক্ষক নেতারা অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকে ভিসি নিয়োগের বিষয়ে পূর্বের রেজোল্যুশনের কথাও উল্লেখ করেন।

ছাত্রদল নেতারা নতুন ভিসিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সরকার যাকে নিয়োগ দিয়েছে তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত। তবে সরকার চাইলে ডুয়েটের কোনো শিক্ষককে ভিসি নিয়োগ দিলেও তাদের আপত্তি থাকবে না বলেও জানান তারা।

অন্যদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দাবি করে আসছেন, তাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ও অরাজনৈতিক। তারা বলছেন, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার শিক্ষা ও প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা বেশি, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকেই ভিসি নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।

তবে বৃহস্পতিবার ভিসির ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, আন্দোলনকারীরা পরবর্তী কী কর্মসূচি দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা কত দ্রুত কাটবে-তা নিয়েই এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে আলোচনা।