জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের প্রতি অশালীন আচরণ, হুমকি এবং কাজে বাধা দেওয়ার একাধিক অভিযোগ উঠেছে একদল শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এছাড়াও আন্দোলনকারীদের 'বামপন্থী' বলায় হেনস্তা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২ ব্যাচের এক শিক্ষার্থীকে।
তবে আন্দোলনে নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (বাসদ) ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একাধিক নেতাকর্মীদের দেখা যায়।
রোববার (১৭ মে) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে আক্রমণ করতে উদ্যত হওয়ার ঘটনা ভিডিও করেন ক্যাম্পাসের একদল সাংবাদিক। এ সময় নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৪৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী নূরে তামিম স্রোতসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে।
এরপর এ ভিডিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে, প্রকাশকারী গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের অশ্রাব্য শব্দচয়ন করে ক্যারিয়ার ধ্বংস করার হুমকিসহ নানান উষ্কানিমূলক বক্তব্য দিতে দেখা যায় ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কার্যকরী সদস্য নাজিহা নাওয়ারকে। এসময় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সংগঠক সজিব আহমেদ জেনিচসহ একদল শিক্ষার্থীকে পেছন থেকে উস্কানি দিতে দেখা যায়।
নাজিহা নাওয়ার এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভিডিও প্রতিবেদককে প্রতিবেদন প্রকাশ করার জের ধরে হ্যান্ডমাইকে নাম ধরে ডাকতে থাকেন। এসময় তাকে উদ্দেশ্য করে বলতে শোনা যায়, "মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ আপনি কে? সৎসাহস থাকলে সামনে আসেন, আমি নাজিহা আপনাকে ওপেন চ্যালেঞ্জ দিলাম। আপনি যে ক্যাপশন দিছেন সেই ক্যাপশন যদি এখানে ডিফেন্ড করতে না পারেন আপনার সাংবাদিকতা, আপনার সাংবাদিকতার ক্যারিয়ার আমি নাজিহা শেষ করে দিব।"
এধরণের অসৌজন্যমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সাংবাদিকদের অভিযোগ করেন, ধারাবাহিক এসব ঘটনার মাধ্যমে ক্যাম্পাসে মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে।
দৈনিক যুগান্তরের প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের কার্যকরী সদস্য রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রক্টর অফিসে বহিরাগত আটকের খবর পেয়ে সংবাদ সংগ্রহের জন্য সেখানে উপস্থিত হই। কিছুক্ষণ পর প্রক্টর আসেন, তারও কিছুক্ষণ পর ভিসি আসেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা প্রক্টরের দিকে মারমুখীভাবে তেড়ে আসেন। পরে প্রক্টর ভিসির গাড়িতে করে স্থান ত্যাগ করেন। সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমাদের উদ্দেশ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে- যে ভাষা প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা শুরু থেকেই তাদের সঙ্গে ছিলাম। আমরাও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ তাদের কাছ থেকে আশা করিনি।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) জাবি প্রতিনিধি মাহ্ আলম বলেন, ‘প্রক্টর অফিসের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কতিপয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে অকথ্য ও অবমাননাকর ভাষায় গালিগালাজ করেন। এমন আচরণের তীব্র নিন্দা জানানোসহ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। এমন ঘটনায় আমি হতবাক। তাদের কাছে এরকম আচরণ অনাকাঙ্ক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিতে প্রশাসনকে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
আজকের পত্রিকার জাবি প্রতিনিধি মুশফিক রিজওয়ান বলেন, ‘প্রক্টর অফিসের সামনে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমরাও সেখানে উপস্থিত হই। এরপর একটি দোকান কর্মচারীর ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে পুরো দায় সাংবাদিকদের ওপর চাপিয়ে অকথ্য ও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করে আসছি। সারাদিন কষ্ট করে কাজ করার পর যদি এমন গালি শুনতে হয়, তখন কাজ করার স্পৃহা থাকে না।’
এদিকে, একই দিন দুপুরে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার আরেকটি ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে এনটিভি অনলাইনের জাবি প্রতিনিধি আকিব সুলতান অর্নব বলেন, ‘জরুরি কাজে রেজিস্ট্রারের একটি নির্দিষ্ট বিভাগে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। বিভাগের নামও স্পষ্ট করে বলেছিলাম। রেজিস্ট্রারে প্রবেশের সময় ক্যাম্পাসের ফর্মাল পরিচয় এবং আমার পেশাগত পরিচয় দিয়েছি। গেইটের ভিতর ঢোকার পর আবার বের হয়ে আসতে বলা হয়েছে। আমি বললাম, ‘নিউজের জন্যই যাওয়া প্রয়োজন।’ তারপরও আমাকে বের হয়ে আসতে বাধ্য করা হলো। এটা তো স্পষ্ট অসহযোগিতা।’
সন্ধ্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে মৌখিক অভিযোগ জানান উপস্থিত সাংবাদিকেরা।
এঘটনয়ায় উপাচার্য বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসলে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।’