সাধারণত চাকরিপ্রার্থীরা চাকরিদাতাদের কাছে যাবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চাকরির জন্য পায়ের জুতার তলা খসাবে সেটা চির চারিত। কিন্তু ঘটলো উল্টোটা। চাকরিদাতারা এলো চাকরি প্রার্থীদেরদের কাছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এমনি ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু। সেখানে সারাদিন চাকরি প্রার্থীরা ঘুরে ঘুরে চাকরিদাতাদের সঙ্গে আলাপ করে সিভি দেয়। এর মধ্যে অনেকে চাকুরীর অফার নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। অনেকে নিয়েছেন অভিজ্ঞতা। আয়োজনের নাম ‘সিনো-বাংলা ডে ২০২৬’।
দিনব্যাপী আয়োজনে অংশ নেয় ৩০ থেকে ৪০টি চীনা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল ৪৩০টি চাকরির সুযোগ। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) প্রাঙ্গণে এ আয়োজন চলে। বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে ‘সিনো-বাংলা ডে’ আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এর আয়োজক।
এদিন আগ্রহী চাকরিপ্রার্থীরা অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে সরাসরি এবং অনলাইনে জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) জমা দেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পদে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, কাজের ধরন ও নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন। গাজীপুর থেকে আসা স্মৃতি ইসলাম দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে জানান, তিনি গাজীপুরে চীনা কোম্পানীতে এসিস্টেন্ট একাউন্স পদে চাকুরীর অফার পেয়েছেন।
আয়োজকেরা আগেই জানিয়েছিলেন, জমা দেওয়া সিভির ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী বাছাইও করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এ চাকরির মেলায় অংশ নিতে পারবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ইয়ান হুয়ি বলেন, ‘এই আয়োজন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন দাঁড় উন্মোচন করবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীন-বাংলাদেশের সম্পর্কে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশে শুধু বিনিয়োগ না, তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করতে কাজ করছে চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো।’
চাকরি মেলায় আগত ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক সৌরভ বলেন, ‘চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আমাদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে ভাষা একটি বড় বাধা মনে হয়। তাই আগ্রহের জায়গা থেকেই এসেছি, চীনের প্রতিষ্ঠান এবং সুযোগ সম্পর্কে জানতে। এখান থেকে হয়তো চাকরি হবে না, তবে নতুন কিছু জানতে পারব, যা পরবর্তী সময়ে কাজে লাগবে।’ অনুষ্ঠানটির সহ-আয়োজক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ চায়নিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশে ওভারসিজ চায়নিজ অ্যাসোসিয়েশন এবং আপন ফ্রেন্ডশিপ এক্সচেঞ্জ সেন্টার।
মেলায় চীনের শীর্ষস্থানীয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি স্বনামধন্য শিল্প গ্রুপ ও এন্টারপ্রাইজ অংশগ্রহণ করে। ছিল স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য ৪৩০টিরও বেশি খালি পদের বিপরীতে আবেদনের সুযোগ। প্রধান খাতগুলোর মধ্যে ছিল তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, উৎপাদন, বিপণন এবং বহুজাতিক বাণিজ্যিক খাত।
আয়োজন নিয়ে ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, দেশের তরুণদের কর্মসংস্থান প্রদানে সরকার ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার জায়গা থেকেই ডাকসু নিজের দায়িত্ববোধ থেকে এই জব ফেয়ারের আয়োজন করেছে। সম্প্রতি ডাকসু নেতাদের চীন সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেখানে আমরা শুধু আনন্দ-ফুর্তি করিনি, বরং চীনের বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র সংসদ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক (পিপল-টু-পিপল কানেক্ট) কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করেছি।’ তিনি আরও জানান, চীন থেকে ফিরে আসার পর চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই জব ফেয়ারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই আয়োজন সফলভাবে রূপ নিয়েছে।
উদ্বোধনকালে বক্তারা বলেন, এই উদ্যোগ বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে। দক্ষ শিক্ষার্থীদের সরাসরি কর্পোরেট সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত করতে এই মেলা একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। ডাকসুর প্রতিনিধিরা জানান, শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনে আগামীতেও এ ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চলমান থাকবে।
মেলা শেষে অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ও সিএমসি ( CMC )-এর যৌথ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘সিনো-বাংলা ফ্রেন্ডশিপ’ স্কলারশিপ ও বার্সারি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। একই অনুষ্ঠানে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ও হুয়াওয়ে টেকনোলজিস লিমিটেডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (গড়ট) স্বাক্ষর এবং ‘হুয়াওয়ে এআই ট্রেনিং প্রোগ্রাম’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এ ছাড়া ২০২৬ সালের চাইনিজ গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ অর্জনকারীদের জন্য প্রাক-যাত্রা দিকনির্দেশনামূলক ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইকবাল হায়দার, কার্যনির্বাহী সদস্য রাইসুল ইসলাম, ডাকসু ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দ, চীনের বিভিন্ন কোম্পানির উদ্যোক্তা ও প্রতিনিধিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।