পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) ছাত্রদলের রাজনীতির যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানানোতে সিনিয়র শিক্ষার্থীরা জুনিয়র শিক্ষার্থীদের মারধর করেছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে শুরু হওয়া এই ঘটনা ভোররাত পর্যন্ত চলে।

অভিযুক্ত সিনিয়র শিক্ষার্থীরা হলেন ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের (১৫ ব্যাচ) শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন, রাইসুল ইসলাম সিজান, শুভজিৎ কর্মকার এবং সিয়াম সরকার। এরা সবাই ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি মুজাহিদ হোসেনের অনুসারী।

অন্যদিকে মারধরের শিকার জুনিয়র শিক্ষার্থীরা হলেন ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের (১৬ ব্যাচ) রিমন, আশিক এবং রবিনসহ আরো কয়েকজন। এরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন সিনিয়র দীর্ঘদিন থেকেই ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের জুনিয়রদের ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। তারা ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদেরওকে রাজনীতি যুক্ত করতে চাচ্ছিলেন। সে জন্য সিনিয়ররা ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সাথে বসতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এতে রাজি না হওয়াতে সিনিয়ররা তাদের উপর ক্ষিপ্ত হন। এ নিয়ে গতকাল ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের সিনিয়ররা ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পিকনিকের নাম করে ক্যাম্পাসে ডাকেন। কিন্তু সেই পিকনিকে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের জুনিয়ররা আসেননি। পরে সিনিয়ররা ঐ ব্যাচের ৭-৮ জন জুনিয়রকে ক্যাম্পাসে ডাকেন। তখন জুনিয়ররা কেন পিকনিকে আসেননি এ নিয়ে প্রথমে সিনিয়ররা তাদের সাথে উচ্চবাচ্য করেন এবং এক পর্যায়ে গিয়ে তারা ঐ জুনিয়রদের মারধর করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, 'সিনিয়ররা আমাদের বলতেছেন ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জুনিয়রদের কে কোথায় যাচ্ছে, কে কোথায় পলিটিক্স করতেছে তোরা তো জানিস না। ঐ জুনিয়রদের ৭ জন রাজনীতি করে। তোরা ওদেরকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দে। ওরা হয়তো অন্য দিকে পলিটিক্স করতেছে অন্য কেউ ওদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাবে। তোরা যেহেতু ওদের ইমিডিয়েট সিনিয়র তোরা ওদেরকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দে।'

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের আরেক এক শিক্ষার্থী বলেন, 'আমরা রাজনীত করি না কিন্তু উনারা রাজনীতি করেন। আমরা তো ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতেই আসিনি, এখানে আসছি পড়াশোনা করতে। যারা রাজনীতি করেন ওনারা চাচ্ছেন আমাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে। আমরা ভাই দূর থেকে এখানে পড়তে এসেছি। ওনারা কিছু হলেই হুমকি ধামকি দেয়, রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেন।'

এ বিষয়ে কোন ২০২৩-২৪ আহত শিক্ষার্থী রিমন বলেন, 'সিনিয়ররা আমাদের ডেকে নিয়ে অন্যায়ভাবে গায়ে হাত তুলেছেন। আমি এই অন্যায়ের বিচার আশা করছি। প্রশাসন যাতে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন।'

এই বিষয়ে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের অভিযুক্ত শিক্ষার্থী রাইসুল ইসলাম সিজান বলেন, 'ডিপার্টমেন্টের চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী ইমিডিয়েট সিনিয়র ব্যাচ জুনিয়র ব্যাচকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। কিন্তু প্রায় ১০ মাস হয়ে গেলেও ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের জুনিয়ররা আমাদেরকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের জুনিয়রদেরকে আমাদের সাথে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। তাই আমরা দুই ব্যাচকেই ক্যাম্পাসে পিকনিকের জন্য ডাকছিলাম। কিন্তু ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ওরা আসেনি। ওরা ওদের মেসেঞ্জার গ্রুপে ভোটিং সিস্টেম করেছে যে, বড় ভাইয়েরা ডেকেছে তোরা যাবি কি না। সেখানে মেয়েরা সবাই আসতে চাইলেও ছেলেরা আসতে চায়নি। ব্যাচের যে মেয়েরা আসতে চেয়েছিল তাদেরকে ওই ব্যাচের ছেলেরা আজে বাজে ভাষায় কথা বলেছে। আমাদের কাছে এর স্ক্রিনশট সহ প্রমাণ আছে। এজন্য আমরা আজকে হল ও এর আশেপাশে যেসব ছেলেরা থাকে তাদেরকে ডাকছিলাম বিষয়টি মিনিমাইজ করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ওরা এসে শুরু থেকেই এগ্রেসিভ মুডে ছিল। এক পর্যায়ে এগ্রেসিভ হয়ে চলে গেল। আমরা সবাই এলিভেটরের উপরেই রয়েছি। কিন্তু ওরা বাঁশ ভেঙে নিয়ে এসে আমাদের উপর আক্রমণ করতে এসেছে। ওরা ২০ জনের মতো ছিল এবং আমরা ৭ জনের মতো ছিলাম। ওরা আমাকে মেরেছে।'

ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান অভি বলেন, 'আমি ক্যাম্পাসে নেই। কাল রাতে ঘটনা শুনার পর আমরা উভয় পক্ষকে শান্ত হয়ে চলে যেতে বলি। আমি ক্যাম্পাসে ফিরে উভয় পক্ষ নিয়ে বসবো। আমাদের এন্টি র‍্যাগিং কমিটি আছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রসাশনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান খান বলেন, 'গতরাতে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সিনিয়র জুনিয়র ব্যাচের মারামারির বিষয়টি আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। বিষয়টি জানার পর ওই বিভাগের চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করেছি। তিনি ১৩ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সাথে পিকনিকে গেছেন। আজকেই চলে আসবে বলে আশা করছি। চেয়ারম্যান আসলে তার সাথে আমি বিষয়টি নিয়ে বসবো। আর রাইসুল ও ইমরানের বিষয়ে আগেই আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ আছে। দুই পক্ষের সাথেই বসে অভিযোগ প্রমাণিতত হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিব।'