খুলনা ব্যুরো

সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় পা রাখলেই নি¤œ ও মধ্যম আয়ের মানুষের মনে একটা অদৃশ্য স্বস্তি কাজ করে। ১০ টাকার একটি টিকিটÑমাত্র এইটুকু বিনিয়োগেই মিলবে ডাক্তার দেখানোর সুযোগ, সঙ্গে হয়তো মিলবে কিছু রকমারি সরকারি ওষুধও। যে মানুষগুলো প্রতিদিনের বাজার খরচ সামলাতে হিমশিম খান, কিংবা যাঁদের কাছে একমুঠো ভাতের জোগাড় করাই কঠিন সংগ্রাম, তাঁদের কাছে সরকারি হাসপাতাল মানেই বেঁচে থাকার শেষ ঠিকানা। কিন্তু এই আশার বেলুন যখন এক নিমিষেই চূর্ণ হয়ে যায়, তখন সেই অসহায় মানুষগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীদের বর্তমান অবস্থা যেন সেই বেদনারই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সামান্য ১০ টাকার টিকিটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা নিতে এসে রোগীদের থলিতে ধরা দিচ্ছে হাজার হাজার টাকার টেস্টের লম্বা ফর্দ। প্রেসক্রিপশনে ওষুধের নাম উধাও, পরিবর্তে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে ব্যয়বহুল সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার বোঝা। এই চিত্র শুধু একটি হাসপাতালের বিশৃঙ্খলা নয়, এটি এক অমানবিক বাণিজ্য ও কাঠামোগত অবক্ষয়ের বাস্তব দলিল, যা স্বাস্থ্যখাতের মূল লক্ষ্যকেই আজ মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের ডি-কার্ডের ১০৬ নম্বর কক্ষের সামনে দাঁড়ালেই ভেসে ওঠে এক করুণ দৃশ্য। দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন একটু চিকিৎসকের ছোঁয়া পাওয়ার আশায়। কিন্তু সেই প্রত্যাশার পারদ যখন চিকিৎসকের চেম্বারে ঢোকার পর ধূলিসাৎ হয়, তখন ভুক্তভোগী রোগীদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে চরম হতাশা ও আতঙ্ক। সম্প্রতি এই কক্ষে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিজ্ঞতা শুনলে যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের বুক কেঁপে উঠবে। ডুমুরিয়া থেকে তীব্র শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে ছুটে আসা আশিকুর রহমান ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অবশেষে প্রবেশ করেছিলেন ১০৬ নম্বর কক্ষে। ভেবেছিলেন, ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে দেবেন, খেয়ে একটু সুস্থ হবেন। কিন্তু তাঁর কপালে জুটল ঠিক উল্টোটা। প্রেসক্রিপশনজুড়ে লেখা হয়েছে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার বিভিন্ন রোগ নির্ণয় বা পরীক্ষার ফর্দ। অথচ প্রেসক্রিপশনে একটিও খাওয়ার ওষুধ লেখা হয়নি। হতবাক আশিকুর যখন হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হিসাব মেলাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর কানের কাছে ফিসফিস করে হাজির হন কক্ষের সামনে থাকা এক অজ্ঞাত অ্যাটেন্ডেন্ট। তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম ও ঠিকানা। বলা হয়, পরীক্ষাগুলো যেন সেখানেই করানো হয়। মোটে সাড়ে ছয় হাজার টাকা বেতনে একটি ছোট চাকরি করা আশিকুর রহমানের পক্ষে এক লাফে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার টেস্ট করানো মানে আকাশ কুসুম কল্পনা। তাঁর এই আর্তনাদ আজ কেবল তাঁর একার নয়, এটি হাজারো দরিদ্র মানুষের সম্মিলিত কান্নার প্রতিধ্বনি।

একই চিত্র বটিয়াঘাটা উপজেলার বারোয়ারী এলাকা থেকে আসা আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রেও। দিনমজুর কিংবা খেটে খাওয়া মানুষের পকেটে যে সবসময় নগদ টাকা থাকে না, তা যেন বুঝতে নারাজ এই চক্র। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার বুকভরা আশা নিয়ে আসা আব্দুল্লাহর কপালে জুটেছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার পরীক্ষার বোঝা। আর জিরোপয়েন্ট এলাকার বাসিন্দা রোকেয়ার প্রেসক্রিপশনে তো রীতিমতো রেকর্ড গড়ে প্রায় ৮ হাজার টাকার পরীক্ষা লিখে দেওয়া হয়েছে। রোগীরা যখন অসহায় হয়ে জানতে চান, "আমাদের প্রেসক্রিপশনে ওষুধ নেই কেন, এত টাকা আমরা কোথায় পাব?" তখন চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মেলে না কোনো সন্তোষজনক উত্তর। বাধ্য হয়ে এই গরিব মানুষগুলোকে এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়, নয়তো গ্রামের কোনো মহাজনের কাছে হাত পাততে হয়। গহনা বন্ধক বা ঘরের শেষ সম্বল বিক্রি করে যখন তারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিলে সেই টাকা পরিশোধ করেন, তখন চিকিৎসার নামে চলা এই নির্মম তামাশার আসল রূপটি উন্মোচিত হয়। প্রশ্ন জাগে, সরকারি হাসপাতালে কি তবে গরিবের চিকিৎসার কোনো মৌলিক অধিকার নেই? নাকি এটি এখন কিছু অসাধুচক্রের পকেট ভারী করার এক লাভজনক কারখানায় পরিণত হয়েছে?

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১০৬ নম্বর কক্ষ থেকে বের হওয়া রোগীদের প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকের সিল ও স্বাক্ষরের বিপরীতে যে পরীক্ষাগুলোর তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার দীর্ঘ এক ফিরিস্তি রয়েছে। সিবিসি এন্ড পিবিএফ, ইউরিনারি পরীক্ষা, ইসিজি, ইকো ডপলার, ট্রোপোনিন-আই এন্টিজেন, আল্ট্রাসনোগ্রাম থেকে শুরু করে সিরাম ক্রিয়েটিনিনÑকী নেই সেই তালিকায়! একজন সাধারণ রোগীর শরীরে একসঙ্গে এতগুলো পরীক্ষা আসলেই চিকিৎসাগতভাবে কতটা জরুরি, নাকি এটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে কোনো পূর্বনির্ধারিত কমিশনের চুক্তির অংশÑসেই প্রশ্ন আজ তীব্রভাবে সামনে চলে এসেছে। রোগীদের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার নেপথ্যে কারা সক্রিয়, তা এখন উন্মোচন করা সময়ের দাবি। কারণ, এসব পরীক্ষার আর্থিক চাপ শুধু একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে না, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদী পুষ্টিহীনতা ও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রে থাকা ডা. মো. রাকিবুল হাসানের ভূমিকা নিয়ে এখন হাসপাতালজুড়ে চলছে নানা গুঞ্জন ও রহস্য। তাঁর পরিচয় এবং কার্যপ্রণালী নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ধোঁয়াশা। যখন তাঁর এই অনিয়ম ও বাণিজ্যসুলভ প্রেসক্রিপশন নিয়ে কথা বলতে চাওয়া হয়, তখন তিনি সংবাদকর্মীদের এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সামনাসামনি কথা বলবেন জানিয়ে মুঠোফোনে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন তিনি। তবে তাঁর এই লুকোচুরি ও এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। একজন চিকিৎসক যদি তাঁর কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে নিশ্চিত থাকেন, তবে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে তাঁর এত সংশয় কেন থাকবে?

পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন এ বিষয়ে কথা বলেন খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল। তাঁর বক্তব্যে বেরিয়ে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য। অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ডা. রাকিব হাসান কোনো মেডিকেল অফিসার নন এবং কার্ডিওলজি বিভাগের সঙ্গে তাঁর দূরতম কোনো সম্পর্ক বা বৈধ সংযোগও নেই। একজন অননুমোদিত বা বহিরাগত ব্যক্তি কীভাবে নিয়মিত কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসাসেবা প্রদান করছেন এবং রোগীদের প্রেসক্রিপশনে দেদারছে বড় বড় পরীক্ষা লিখে দিচ্ছেনÑতা অত্যন্ত বিস্ময়কর ও উদ্বেগের বিষয়। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, এই অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে শুধু আর্থিকভাবেই পঙ্গু করা হচ্ছে না, বরং সরকারি হাসপাতালের সুনামও মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায় তদন্ত কমিটি গঠন করে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

অন্যদিকে, হাসপাতালের প্রশাসনিক উদাসীনতা বা নজরদারির ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল। হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মোহাম্মদ আইনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান যে, বিষয়টি তাঁর সুনির্দিষ্টভাবে জানা ছিল না। তবে অভিযোগ যেহেতু প্রকাশ্যে এসেছে, তাই এটি নিয়ে লিখিত বা মৌখিক তদন্ত সাপেক্ষে সত্যতা প্রমাণিত হলে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। পরিচালকের এই বক্তব্যের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাÑতদন্ত যেন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কারণ অতীতেও বহুবার এমন অনেক অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়ে ফাইলের নিচে চাপা পড়ে গেছে, যার ফলে অপরাধীরা আরও বেশি বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের এই নৈরাজ্য কেবল খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল দর্শনই হলো মানবতার সেবা। একজন গরিব মানুষ যখন সর্বস্বান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসেন, তখন তাঁর প্রথম ও প্রধান সান্ত¡না পাওয়ার জায়গাটি হলো চিকিৎসকের মিষ্টি কথা ও সঠিক পরামর্শ। কিন্তু সেখানে যদি তাঁকে পদে পদে শোষণের শিকার হতে হয়, তবে রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

হাসপাতাল কোনো ব্যবসার আখড়া নয়; এটি আর্তমানবতার সেবায়েতদের পবিত্র স্থান। ১০ টাকার টিকিটে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষগুলোর চোখের জলের মূল্য দিতে হবে এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে। চিকিৎসকদের সাদা এ্যাপ্রনের পবিত্রতা রক্ষা করতে হলে বহির্বিভাগের এই অনিয়মের জাল অবিলম্বে ছিন্ন করতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের মুখোশ উন্মোচন করে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তবেই সাধারণ মানুষ আবার ফিরে পাবে তাদের হারানো ভরসা। অন্যথায়, চিকিৎসার নামে চলা এই নীরব শোষণ চলতে থাকলে সরকারি হাসপাতালের শেষ আশ্রয়টুকুও একদিন ধসে পড়বে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।