দেশের শিল্প খাতে চলমান গ্যাস সংকট সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিল্প খাতে গ্যাস সংকটসহ বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভাকক্ষে টেক্সটাইল শিল্পের সমস্যা সমাধানে গঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রথম সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

আলোচনার এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সভায় যোগ দেন এবং সবার বক্তব্য শোনেন। প্রধানমন্ত্রী সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেন। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরবর্তী সভা আয়োজনের নির্দেশনা দেন।

সভায় কমিটির সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে, গত ২২ জুলাই বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতির নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করে টেক্সটাইল শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে। ওই বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী সমস্যাগুলো সমাধানের প্রস্তাব প্রণয়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গঠিত কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভার শুরুতেই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী টেক্সটাইল খাতের সমস্যার ব্যাপারে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল এবং সমস্যা সমাধানে বেশ আন্তরিক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কারণেই তিনি তাৎক্ষণিক বিরাজমান সমস্যা সমূহের সমাধানের প্রস্তাব প্রণয়নে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এই আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছেন।

বিটিএমএর প্রেসিডেন্ট শওকাত আজিজ রাসেল টেক্সটাইল খাতের মূল সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো সভায় উপস্থাপন করেন। সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কমিটির সদস্য ও বিটিএমএ প্রতিনিধিদলের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় বিটিএমএর প্রতিনিধিদলে ছিলেন- পরিচালক মো. বাদশা মিয়া, সাবেক সহ-সভাপতি হোসেন মেহমুদ, সাবেক পরিচালক মো. মোশারফ হোসেন, সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব হায়দার প্রমুখ।

ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুত করা হচ্ছে ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবী

ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি সাড়া কার্যক্রম জোরদারে ঢাকা ও আশপাশের এলাকার জন্য ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুত করছে সরকার। এ লক্ষ্যে তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গতকাল বুধবার বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভূমিকম্প প্রস্তুতি বিষয়ক সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

সভায় জানানো হয়, ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন এবং ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুতের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হয়েছে। দ্রুত বাকি ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকেও এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।

বৈঠকে ভূমিকম্প মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়েও মতবিনিময় হয়। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভূমিকম্প প্রস্তুতি বিষয়ক একটি বিশেষ সেল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ ছাড়া সম্ভাব্য দুর্যোগের সময় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করার উপায় এবং ঢাকা শহরে হিউম্যানিটারিয়ান স্টেজিং এরিয়া (এইচএসএ) স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়।

সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম. ইকবাল হোসেইন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম. এ. মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভুবন ভোলানো হাসিতে

মন জয় করা তাহসিনের সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে সেই তাহসিন, যে কিনা বড় বোন হারিয়ে হাসতে ভুলে গিয়েছিল।

গতকাল বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাবা নাজমুল হককে নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে সে।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব গাজী শাহরিয়ার পামির এ কথা জানান।

রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে গত ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’-এর সমাপনী আয়োজনে একটি ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হাজারো শিশুর ভিড়ে স্কুলড্রেস পরা এক কিশোরের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া দু’হাত আর চোখেমুখে উচ্ছ্বসিত হাসি স্পর্শ করে অসংখ্য মানুষের হৃদয়। সেই কিশোরের নাম তাহসিন আব্দুল্লাহ। কিন্তু ছবির হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর বেদনার গল্প।

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় তাহসিন হারিয়েছিল তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, বড় বোন তাসনিয়াকে। একই স্কুলে পড়লেও সেদিন তারা ছিল আলাদা ভবনে। তাহসিন তখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, আর তাসনিয়া পড়ত অষ্টম শ্রেণিতে। যুদ্ধবিমানটি আছড়ে পড়ে তাসনিয়াদের স্কুল ভবনে।

বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ছোট্ট তাহসিন দৌড়ে যায় বড় বোনকে খুঁজতে। কারও কাছ থেকে শুনেছিল স্যালাইন ও পানির প্রয়োজন। বড় বোনের জন্য ছোট্ট দুই হাতে স্যালাইন ও পানির বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তাহসিন। কিন্তু সেই অপেক্ষার আর অবসান হয়নি।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই দুর্ঘটনার পর বদলে যায় তাহসিন। এক হিলিং সেশনে সে কাগজে লিখেছিল, ‘আমার কষ্ট অনেক। আমি আমার প্রিয় বোনকে হারিয়ে ফেলেছি। সে মারা গেছে। ওকে আমি অনেক অনেক মিস করি, ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।’

বোনকে হারানোর পর থেকে তাহসিনের মুখে আগের মতো প্রাণখোলা হাসি আর দেখা যেতো না। বর্তমানে সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারে তার নার্সারিতে পড়–য়া আরও একটি ছোট বোন রয়েছে।

গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে যেনো দেখা মিলল অন্য এক তাহসিনের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন মাঠ প্রদক্ষিণ করছিলেন, তখন তাঁর কাছাকাছি আসার মুহূর্তে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে শিশুটি। সেই নির্মল হাসি আর উচ্ছ্বাস ক্যামেরাবন্দি হয়। পরে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষ তাহসিনের হাসির সঙ্গে নিজেদের অনুভূতি মিলিয়ে নেন।

পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানতে পারেন, ছবির সেই হাসিমাখা মুখটির পেছনে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক পারিবারিক ইতিহাস। বিষয়টি জানার পর তিনি তাঁর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে তাহসিন ও তার পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেন।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব জানান, সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাহসিনের সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাহসিনের পড়াশোনার খোঁজখবর নেন এবং বড় হয়ে কী হতে চায়, তা জানতে চান। তাহসিন জানায়, সে বড় হয়ে একজন সফল ব্যবসায়ী হতে চায়। এছাড়া এমন কিছু করতে চায়, যার মাধ্যমে মানুষের উপকার এবং যার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হবে।

প্রধানমন্ত্রী তাহসিনের এই স্বপ্নের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি ছোট্ট তাহসিনকে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া, নিয়মিত খেলাধুলা এবং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

আলাপচারিতায় তাহসিন জানায়, তার শখ ফুটবল খেলা। প্রধানমন্ত্রী নিজের স্বাক্ষর করা একটি বাস্কেটবল এবং ড্রোনসেট উপহার হিসেবে তুলে দেন তাহসিনের হাতে।

সাক্ষাৎ শেষে উচ্ছ্বসিত তাহসিন জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আবারও দেখা করতে পেরে সে খুবই আনন্দিত। এমন একটি সুযোগ পাবে, তা সে কল্পনাও করেনি। পুরো বিষয়টিই তার কাছে ছিল একেবারে সারপ্রাইজ। সে বলে, স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প শোনানোর জন্য সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

মাইলস্টোনের যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো তাহসিনের বাবার প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত সহযোগী অধ্যাপক (অর্থোপেডিক) ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব-১ জাহিদুল ইসলাম রনি এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্য সচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন উপস্থিত ছিলেন।